অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০১৫
নতুন প্রাণের নগরসংস্কৃতির অভিযাত্রা
২৭ ফেব্রুয়ারী, ২০১৫ ইং
সাইমন জাকারিয়া

এ বছর বাংলা একাডেমির অমর একুশে গ্রন্থমেলা বা বইমেলার দিকে একটু অন্যচোখে তাকালাম। দেখলাম—দেশে চলমান হরতাল, অবরোধ, পেট্রোলবোমার আতঙ্ক আর বিশ্বকাপ ক্রিকেটের উন্মাদনাকে পাশ কাটিয়ে অসম্ভব স্বতঃস্ফূর্ততায়, প্রতিটি দিন অসংখ্য মানুষের পদচারণায় প্রাণবন্ত হয়ে আছে বাংলা একাডেমি ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের বিস্তৃত পরিসরের বইমেলা। অন্যান্য বছরের মতো পাল্লা দিয়ে অসংখ্য বইও প্রকাশিত হয়েছে, যার মধ্যে গল্প, কবিতা, উপন্যাস, প্রবন্ধ, অনুবাদ, নাটক এবং শিশুসাহিত্যের বইয়ের দারুণ সহাবস্থান দেখা যাচ্ছে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হলো, মোটা আকৃতি নিয়ে বেশ কিছু ছোটকাগজ প্রকাশিত হয়েছে; এছাড়া, বেশ কিছু সংস্থা থেকে বইমেলার প্রতিদিনের সংবাদ নিয়ে সংবাদপত্রের মতো বিশেষ বুলেটিন প্রকাশ করেছে। পাশাপাশি বাংলা একাডেমি প্রতিবারের মতো আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান চলমান রেখেছে। তবে, বাংলা একাডেমি এবার নিজের প্রকাশিত বই প্রদর্শন এবং বিক্রির জন্য ব্যতিক্রমী উদ্যোগ প্রদর্শন করেছে, চারটি আলাদা স্থানে বাংলা একাডেমির নিজস্ব প্রকাশনা প্রদর্শন ও বিক্রি চলছে।

এ পর্যায়ে বাংলা একাডেমির বইমেলায় বইয়ের প্রচারণা, প্রকাশনা এবং পাঠক-ক্রেতার সুবিধা-অসুবিধা সম্পর্কে কিছু কথা বলা যাক। আমরা জানি, সংবাদপত্র ও বিভিন্ন টিভি চ্যানেলের প্রচারণার বাইরেও পাঠক নিজের চাহিদা ও অভিরুচি অনুযায়ী বইমেলা থেকে বেছে বেছে বই কিনে থাকেন। কিন্তু দুঃখের বিষয়, বইমেলাতে এসে কারো পক্ষে চট জলদি কোনো ভালো বই কেনা বেশ দুরূহ। কারণ, ভালো প্রকাশনার কোনো নির্ভরযোগ্য সমালোচনা ও প্রচারকেন্দ্র বইমেলাতে দেখা যায় না। এক্ষেত্রে আমাদের বক্তব্য হলো—বইমেলার পরিসর আগের চেয়ে যেভাবে বেড়েছে, সেভাবেই বইমেলায় প্রকাশিত শ্রেষ্ঠ বই নির্বাচনের জন্যে পাঠক-ক্রেতাদের সহায়ক একটি নির্বাচক দল গঠন করা যায়, যারা প্রতিদিন গুণগত দিক দিয়ে উন্নতমানের বইয়ের একটি তালিকা এবং তালিকাবদ্ধ বইয়ের বিষয়বস্তু সম্পর্কে পাঠককে অবহিত করবেন। এই প্রক্রিয়া কয়েকভাবে হতে পারে—১. বইমেলার প্রাঙ্গণের বড় প্রজেক্টরে, ২. ইন্টানেটে, ৩. প্রকাশিত প্রচারপত্রে, ৪. বইমেলার প্রাঙ্গণে স্থাপিত কোনো স্থায়ী বিলবোর্ডে।

বইমেলা উপলক্ষে প্রকাশিত বই বিক্রি ও প্রদর্শনের ব্যাপারে এখন প্রকাশক ও বাংলা একাডেমির মধ্যে একটি নিয়ন্ত্রণকারী ব্যবস্থা থাকা দরকার। কারণ, এখন বাংলা একাডেমির বইমেলা বহু পথ পাড়ি দিয়ে অনেকটাই পূর্ণতার দিকে ধাবিত হয়েছে। প্রতি বছর নতুন নতুন প্রকাশনা সংস্থাকে মেলাপ্রাঙ্গণে স্থান দেবার ব্যাপারে যেভাবে কিছু নীতিমালা অনুসৃত হয়, মেলায় স্থান পাওয়া বইয়ের গুণগতমান নিয়ন্ত্রণের জন্যে নীতিমালা প্রণয়নের সাথে সাথে তা বাস্তবায়নের ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।

একথা বলতে দ্বিধা নেই যে, বাংলা একাডেমি বইমেলা এবারে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনেক সম্প্রসারিত পরিসরে আয়োজন করা হয়েছে, এ কারণে পাঠক-ক্রেতার চলাচলের জন্য যেমন সুবিধা হয়েছে, তেমনি প্রকাশকরা বই প্রদর্শনের সুবিধা পেয়েছে। কিন্তু এই সুবিধার মধ্যে একটি তীব্র অসুবিধাও পাঠক-ক্রেতারা অনুভব করেছেন, আর তা হলো—বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে একটি খাবার ক্যান্টিন থাকলেও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে কোনো খাবার ক্যান্টিনের ব্যবস্থা করা হয়নি, অধিকাংশ পাঠক-ক্রেতারা এক্ষেত্রে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের মেলাপ্রাঙ্গণে বেশ কয়েকটি খাবার ক্যান্টিন ও ফাঁকে ফাঁকে বসা এবং বসে আড্ডা দেবার স্থানের অভাব বোধ করেছেন। উল্লেখ্য, দু-একটি পত্রিকায় এরই মধ্যে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মোহীত উল আলম ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য অধ্যাপক আবদুল খালেক সে-কথা তাঁদের মন্তব্যে জানিয়েছেন। আশা রাখি, আগামী বছর বাংলা একাডেমির অমর একুশে গ্রন্থমেলায় দারুণ সুন্দর ব্যবস্থাপনায় এ সকল অভাব পূর্ণতা পাবে।

বাংলাদেশের, সৃজনশীল হোক আর মননশীল হোক বা হোক অনুবাদ সাহিত্য, সকল কিছু প্রকাশনার অবলম্বন হয়ে উঠেছে বাংলা একাডেমির অমর একুশের বইমেলা। লেখক, প্রকাশক, পাঠক-ক্রেতা সকলের প্রতীক্ষা ও ব্যস্ততা তাই এই বইমেলাকে নিয়ে। এবছর মেলার বইয়ের মধ্যে অনুপম থেকে প্রকাশিত অধ্যাপক মোহীত উল আলমের ‘শেক্সপিয়ার : রোমান ট্র্যাডেজি’, পাঠক সমাবেশ থেকে মাসরুর আরেফিনের ‘হোমার : ইলিয়াড’; সময় থেকে কামাল চৌধুরীর ‘উড়ে যাওয়া বাতাসের ভাষা’, অ্যাডর্ন থেকে প্রকাশিত শেলী নাজের ‘পুরুষসমগ্র’, মাওলা থেকে অধ্যাপক আবদুল খালেকের ‘প্রাচীন ও মধ্যযুগের বাংলাসাহিত্যে লোকজীবনের স্বরূপ’, তাম্রলিপি প্রকাশিত মুহম্মদ জাফর ইকবালের উপন্যাস ‘গ্রামের নাম কাঁকনডুবি’, প্রথমা থেকে প্রকাশিত সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের ‘তালপাতার সেপাই ও অন্যান্য গল্প’ পাঠকের দৃষ্টি কেড়েছে।

বইয়ের বিচিত্র সম্ভার থেকে এবার বইমেলা কেন্দ্রিক সংস্কৃতির প্রাণবন্ত ভিন্ন একটি রূপের কথা বলা যাক। আসলে, বইমেলায় আগতদের আরেক আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল টিএসসি থেকে দোয়েল চত্ত্বর পর্যন্ত ফুটপাতে নানা ধরনের দেশ-বিদেশি বইয়ের পসরা, নারীদের বিচিত্র প্রসাধন, শিশু-কিশোরদের জন্য উড়ন্ত পাখি, চলন্ত সাপ, চিনামাটির পাখির ডাক এবং হরেক রকমের খেলনা, আইসক্রিম, মিঠাইয়ের আহ্বান; সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে তো চটপটি, পিঠা ও রঙের খাবারের দোকানও বসে গেছে।

বইমেলা কেন্দ্রিক এই বহুমাত্রিক আয়োজনের কারণেই হোক, আর লোকসমাগামের সুযোগেই হোক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা যে পসার বিছিয়ে নিয়েছে—এই দৃশ্য তো মিথ্যে নয়; তাহলে তো বলাই চলে বইমেলা কেন্দ্রিক একটি দীর্ঘস্থায়ী নগরসংস্কৃতির উন্মেষ ঘটেছে ঢাকাতে। এই সংস্কৃতিতে কেউ কেউ বই না কিনলেও বা বইয়ের দিকে ফিরে তাকানোর প্রয়োজন না হলেও বইমেলার প্রবেশ পথে ও বইমেলা প্রাঙ্গণের আশে-পাশে দাঁড়ানো বা বসা ভ্রাম্যমাণ বিক্রেতার কাছ থেকে পায়ের নূপুর কিনছেন বা ফুলের রিং কিনে মাথায় দিয়ে স্বয়ম্বরা কন্যার মতো ঘুরে বেড়াচ্ছেন।

জার্মানের হাইডেলবার্গ ইউনিভার্সিটির পিএইচ.ডি. ফেলো মাক্স স্টিলে সেদিন আমাদের সাথে বইমেলায় ঢুকে অনেক নারীর মাথায় ফুলের রিং আর পরিপাটি সাজের নারী আর তাদের বাহুতে বদ্ধ সঙ্গীকে দেখে হঠাত্ বললেন—‘আচ্ছা, এটা কি বইমেলা? না বউমেলা! ওরা সবাই এভাবে সেজেগুজে, মাথায় ফুল দিয়ে ঘুরছে, ওদের দেখে মনে হচ্ছে আমি বউমেলায় এসেছি! কী আশ্চর্য! ওদের কারো হাতে বই দেখছি না, একে অপরের হাত ধরে ঘোরাঘুরি করছে!’

আরেকটি ব্যাপার এবারের বইমেলাতে খুব বেশি চোখে পড়েছে—সেলফি তোলার হিড়িক! বিশেষ করে পঞ্চাশ টাকা দামের একটি ফুলের রিং মাথায় দিলে তো সেলফি তুলতে হয়, বইমেলা থেকে ফেসবুক তখন প্রাণ। এরমধ্যে আরেক দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী বাউলশিল্পী সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ফুটপাতে বসে দোতরায় টুংটাং সুর তুলে গান গেয়ে চলেন—‘আমার ঘর খানায় কে বিরাজ করে...?’ কেউ কেউ বাউলের কণ্ঠ আর দোতরার সুর শুনে একটুখানি থমকে দাঁড়ান, তারপর দু-পাঁচ টাকা দিয়ে মেলায় মিশে যান। এভাবেই নানাবিধ চরিত্র ভিড় করেছে বাংলা একাডেমির অমর একুশের বইমেলা কেন্দ্রিক নগরসংস্কৃতিতে। নতুন দিনের আগমনে সেই সংস্কৃতির বিস্তার এতই প্রগাঢ় হবে যে, সত্যিকার ভাষাশহীদ, ভাষাসৈনিকের আত্মনিবেদনের বাংলা ভাষা শুধু নয়, বাংলার মানুষের সংস্কৃতির নবরূপায়ণ ঘটবে। এবারের অমর একুশের বইমেলা থেকে সেই ইঙ্গিত যে কেউ খুঁজে নিতে পারেন বৈকি।

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
২৭ ফেব্রুয়ারী, ২০২০ ইং
ফজর৫:০৭
যোহর১২:১২
আসর৪:২৩
মাগরিব৬:০৪
এশা৭:১৬
সূর্যোদয় - ৬:২২সূর্যাস্ত - ০৫:৫৯
পড়ুন