অবিশ্বাস্য সৌন্দর্যের জাদিপাই ঝরনা!
০৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৫ ইং
অবিশ্বাস্য সৌন্দর্যের জাদিপাই ঝরনা!
l মো. জাভেদ বিন-এ -হাকিম l

 

পরিকল্পনা ছিল, এবার ভারতের চেরাপুঞ্জি যাব। পাসপোর্ট ডেলিভারির দিন রাতের বাসেই চলে যাব। এই চিন্তা থেকেই বাড়ি থেকে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে বের হই। ভিসা না পাওয়ার কারণে, শেষ মুহূর্তে সব ভেস্তে যায়। কিঞ্চিত মনোকষ্ট নিয়ে সোজা সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালে চলে যাই। হায় খোদা বাসের টিকেটও নেই! অতঃপর টার্মিনাল এলাকার এক বন্ধুর দ্বারস্থ হই। টিকেট পেলাম মাত্র দুটি। কী আর করা, ভ্রমণে আমার সাথে সবচেয়ে বেশি যার খুনসুটি হয়, সেই বন্ধু নাসিরুদ্দিন আহম্মেদ কচিকে সঙ্গে করে যাত্রা শুরু হলো। ভোর ৪টা ২৫ মিনিটে বান্দরবান পৌঁছাই। গন্তব্য জাদিপাই ঝরনা। চান্দের গাড়িতে সোজা ক্যাইক্ষংছড়ি। তারপর ট্রলারে চেপে সাঙ্গু নদের হিমেল হাওয়া গায়ে মেখে রুমা বাজারে এসে পৌঁছাই।

দক্ষ গাইড মো. নূরুল ইসলামকে আমাদের সাথে নিই। হাতে সময় থাকায় সেদিনই আর্মি ক্যাম্পে নাম-ঠিকানা এন্ট্রি করে চান্দের গাড়িতে রওনা হই। পাহাড়ি সর্পিল পথে গাড়ি হেলেদুলে প্রায় দুই ঘণ্টা পর পর্যটকদের নামিয়ে দেয় কমলা বাজার। এবার শুরু হলো বাঁশের লাঠি হাতে নিয়ে ছোট-বড় পাহাড় ডিঙিয়ে বগালেকের দিকে এগিয়ে চলা। কখনো গভীর গিরিখাতে, কখনো বিস্তৃত নীলিমার দিকে, কখনোবা ঢেউ তোলা পাহাড়ের সবুজ গালিচায় চোখ বুলাতে বুলাতে ঘণ্টাখানেক হাঁটার পরেই পৌঁছে যাই প্রকৃতির অপার দান বগালেকে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে এর উচ্চতা দুই হাজার সাতশ ফিট। আর্মি ক্যাম্প থেকেই এর সৌন্দর্য দেখে মনের ক্লান্তি দূর হয়ে যায়। আর দেহের ক্লান্তি এর স্বচ্ছ টলটলে জলে ডুব দিতেই এক নিমিষে দূর। এ লেকে দীর্ঘক্ষণ সাঁতার কাটলেও মন ভরবে না! বম যুবক কিমের কাছে থেকে জানা গেল বগালেক নিয়ে যে পৌরাণিক কাহিনি প্রচলিত আছে তার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। সুতরাং মন ভরে ডুব সাঁতারে মাতিয়ে রাখুন নিজেকে। আদিবাসীদের রেস্টুরেন্টে দুপুরের খাবার সেরে আবারও হাঁটা শুরু হলো কেওক্রাডং পাহাড়ের উদ্দেশে। জাদিপাই ঝরনায় যেতে হলে কেওক্রাডং গেস্ট হাউজে রাত্রিযাপন করতে হবে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে কেওক্রাডংয়ের উচ্চতা তিন হাজার একশ বাহাত্তর ফিট। যা এটিকে দিয়েছে সর্বোচ্চ পাহাড়ের তালিকায় দ্বিতীয় স্থানের মর্যাদা। গরমে যখন অস্বস্তি লাগছিল, তখন শুভ্র মেঘমালা শরীরে আছড়ে পড়ে প্রশান্তি এনে দিচ্ছিল। দিনের শেষে রাত হলো। ভরা জোত্স্নার আলো সম্বল করে বন-জঙ্গলের ভেতর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি বীরদর্েপ। মাঝেমধ্যে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা পর্যটকদের সাথে ‘হায়-হ্যালো’ হচ্ছে। সময় সন্ধ্যা ৭টা ৪০ মিনিট। দার্জিলিং পাড়ায় এসে হাজির হলাম। লাল জাইয়ের হোটেলে সাময়িক বিরতি নিয়ে চা-নাস্তার পর্ব হলো। এরপর আবারও হাটা শুরু।

রাত ৮টা ১৫ মিনিটে হাজির হলাম কেওক্রাডং পাহাড় চূড়ায়। কটেজের প্রতিষ্ঠাতা লাল বম উষ্ণ অভ্যর্থনা জানিয়ে রুম দেখিয়ে দিলেন। রাতের খাবার শেষে পরের দিনের জন্য চটজলদি ঘুুুুমিয়ে পড়ি। খুব সকালে পাহাড়ি মোরগের ডাকে ঘুম ভাঙে। গাইড রেডি,

আমরাও রেডি। জাদিপাই ঝরনার উদ্দেশে হাঁটা শুরু করতে সন্ধ্যা ৭টা ১০ বেজে যায়। এবারের পথ যেন আরও রোমাঞ্চকর! এরমধ্যে পাহাড়ি জোঁকেরা শরীর থেকে কয়েক দফা রক্ত চুষে নিয়েছে। দেখা পেলাম পাহাড়ি সবুজ রঙের গাল চোকা সাপের, হিংস্র বন্য শুকর আর বিষাক্ত চেলা। এসবই তুচ্ছ মনে হয়, পথ চলতে চলতে যখন কানে ভেসে আসে পাহাড়ি ছড়া, ঝিরি আর ছোট-বড় ঝরনার রিমঝিম শব্দ, তখন এক অন্য রকম অনুভূতি ভিন্ন কোনো শিহরণ মনে জাগে। জাদিপাই পাড়ায় এসে এবার খানিকটা বিশ্রাম। এখানে সদ্য গাছ থেকে পাড়া সুস্বাদু ফল আর ভুট্টা ভাজা খাওয়ার স্বাদ মনে থাকবে বহুদিন। এরপর আবারও সর্পিল পথে চলা শুরু। এবার শুধু নিচের দিকেই নামছি, ঘণ্টা দেড়েক গিরিখাতে নামতেই চোখ ছানাবড়া! এত সুন্দর আর এত বড় ঝরনা আগে কখনো দেখিনি। এতদিন রংধনু আকাশেই দেখতে পেতাম, কিন্তু জাদিপাই এসে দেখি অনবদ্য ঝরনার পানিতে রংধনুর সাত রং। বম সম্প্রদায়ের যুবক লেমনের কাছ থেকে জানতে পারি ‘জাদিপাই’ মারমা শব্দ। আশ্চর্য রকম অদ্ভুত সুন্দর জাদিপাই ঝরনায় সত্যিই জাদু আছে। বিশাল এই ঝরনার আকার, আকৃতি, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য যেকোনো পর্যটককেই কোনো এক মায়ার জাদুতে জড়িয়ে ফেলবে। দীর্ঘক্ষণ ঝরনার জলে ভিজে মন জুড়ালাম। এরপর আবার ইট, কাঠ আর উত্তপ্ত পিচ করা রাজপথের শহর ঢাকায় ফিরতে হলো। তবে মন পড়ে থাকল জাদিপাই ঝরনার কাছে।

যোগাযোগ

গাবতলী ও সায়েদাবাদ থেকে দিনে রাতে বিভিন্ন পরিবহনের বাস সার্ভিস বান্দরবানের পথে ছেড়ে যায়। সেখান থেকে বাসে কিংবা চান্দের গাড়িতে চড়ে যেতে হবে রুমা বাজার। বেলা ৪টার মধ্যে পৌঁছতে পারলে সেদিনই জিপে করে বগালেক বা কেওক্রাডং। ঝুম বৃষ্টির দিনে গাড়ি যাবে না, তখন পায়ে হেঁটে যেতে হবে। রাতে কেওক্রাডং কটেজে থেকে পরের দিন খুব সকালে হাইকিং-ট্র্যাকিং করে যেতে হবে জাদিপাই ঝরনার কাছে। খরচ পড়বে জনপ্রতি তিন দিনের জন্য পাঁচ হাজার টাকা।

 

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
৮ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ইং
ফজর৪:২৬
যোহর১১:৫৭
আসর৪:২৫
মাগরিব৬:১৩
এশা৭:২৭
সূর্যোদয় - ৫:৪৩সূর্যাস্ত - ০৬:০৮
পড়ুন