প্র থ ম যি নি
নোবেল বিজয়ী নারী মেরি কুরি
ফারজানা ওয়াজেদ২২ মে, ২০১৭ ইং
নোবেল বিজয়ী নারী মেরি কুরি
পৃথিবীর বুকে একমাত্র নারী তিনি একাধিকবার নোবেল পুরস্কার জিতেছেন, তাও আবার দুটি ভিন্ন বিষয়ে! ১৮৬৭ সালে পোল্যান্ডে জন্ম নেওয়া মেরি কুরি ছোটবেলা থেকেই অসম্ভব প্রতিভার পরিচয় দিয়ে এসেছেন। স্কুলে বরাবর প্রথম হওয়া এই মেয়েটি প্রথম ধাক্কা খায় বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে গিয়ে, যখন জানতে পারে তাঁর এলাকার বিশ্ববিদ্যালয়টি কেবল ‘পুরুষদের’ জন্য উন্মুক্ত এবং সেখানে তাঁর কোনো প্রবেশাধিকার নেই! একথা শুনে ভীষণ জেদ চেপে গেল কুরির, ছেলেবেলায় মা হারানো মেয়েটি সিদ্ধান্ত নিল বিজ্ঞান চর্চার অভিযান চলবেই! যেই ভাবা সেই কাজ, শহরের এক কোণে ‘ভাসমান বিদ্যালয়’ নামে একটি জায়গা ছিল, যেখানে গোপনে কুরির মতো অনেক জ্ঞানপিপাসু মেয়ে পড়ালেখার সুযোগ পেত। কিন্তু এ সুযোগও বেশিদিন টিকল না। অর্থের অভাবে বন্ধ হয়ে গেল বিদ্যালয়টি, কুরিও পড়লেন জীবনযুদ্ধের নানা বিড়ম্বনায়। বহু বছর শিক্ষকতা আর গভর্নেনসের কাজ করে সংসারের খরচ যোগাতেন তিনি। অবসর সময়ে পদার্থ, রসায়ন ইত্যাদি বিষয় নিয়ে বুভুক্ষের মতো পড়াশোনা করতেন। কিন্তু এভাবে আর কতদিন? অবশেষে বহু বছরের যা কিছু সম্বল সব নিয়ে পাড়ি জমালেন তিনি প্যারিসে, ভর্তি হলেন বিখ্যাত সরবোন বিশ্ববিদ্যালয়ে।

বিজ্ঞানের বিচিত্র সব বিষয় নিয়ে নাওয়া-খাওয়া ভুলে গবেষণা করতে লাগলেন কুরি, কিন্তু রোজগার? রোজগার করতে গেলে গবেষণার সময় কমে যাবে, তাই জ্ঞানপিপাসু কুরি কোনোমতে আধবেলা একবেলা খেয়ে সারাদিন পড়ে থাকতেন গবেষণাগারে। স্বাস্থ্যের প্রতি নিদারুণ অযত্নের ছাপ পড়তে শুরু করল শরীরে, চোখমুখ বসে গেল মানুষটার, তারুণ্যের উচ্ছ্বল সৌন্দর্যে ভর করল ক্লান্তির ছাপ, কিন্তু কুরির চোখের দিকে তাকালে তা বুঝবার উপায় নেই!

তার চোখে রাজ্যের আগ্রহ আর কৌতূহল জ্বলজ্বল করছে, নিত্যনতুন সব অজানা বিষয়ে গবেষণায় তার দিনরাত কেটে যাচ্ছে মনের আনন্দে! এই গবেষণাগারেই পরিচয় হলো তার এক ফরাসী পদার্থ বিজ্ঞানীর সঙ্গে, নাম তার পিয়েরে কুরি।  বিজ্ঞান সাধনায় দুজনেরই অসীম আগ্রহ, পরিচয় তাই পরিণয়ে রূপ নিতে বেশিদিন লাগল না। দুজন মিলে পদার্থ, রসায়ন, গণিতসহ বিজ্ঞানের নানান শাখায় গবেষণায় কাটাতে লাগলেন দিনরাত।

বিজ্ঞানী যুগলের এই গবেষণা বিফলে গেল না, বিয়ের মাত্র আট বছরের মাথায় পদার্থ বিজ্ঞানে নোবেল জিতলেন দুজন একসঙ্গে! পুরস্কারের অর্থ প্রায় পুরোটাই খরচ করলেন গবেষণার কাজে, সংসার আলো করে এলো কুরি দম্পতির প্রথম সন্তান, কিন্তু এমন সময় একটি বিপর্যয় এলোমেলো করে দিল মেরি কুরির জগত্। সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেলেন প্রিয়তম স্বামী, বিজ্ঞান চর্চায় সহকর্মী পিয়েরে কুরি। চোখের জলে ভাসলেন শোকে বিহ্বল কুরি, কিন্তু দাঁতে দাঁত চেপে সিদ্ধান্ত নিলেন স্বামীর গবেষণাকে এগিয়ে নিয়ে যাবেন। খরচ যোগাতে সরবোনে যোগ দিলেন শিক্ষক হিসেবে, বিশ্ববিদ্যালয়টির ইতিহাসে প্রথম নারী প্রফেসর হলেন তিনি। ১৯১১ সালে রসায়নে অনন্য অবদান রাখার জন্য আবার নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হলেন মেরি কুরি, সবার চোখের সামনে পুরস্কার বিতরণী মঞ্চে কুরি একাই উঠলেন, কিন্তু তাঁর মনের জগতে যে বিদেহী স্বামীর অবস্থান সবসময় হূদয়ের মাঝে।

সারাজীবনের এত ধকল আর স্বামীর মৃত্যুর শোক কোনোদিনই কাটিয়ে উঠতে পারেননি কুরি, দুঃখ ভুলতে রাত-দিন গবেষণাগারেই পড়ে থাকতেন, এই অস্বাভাবিক খাটুনির ধকল পড়তে শুরু করল তার শরীরে, বিষাক্ত তেজস্ক্রিয়তায় আক্রান্ত হলো পুরো দেহ, অবশেষে বিশ্বজুড়ে লাখো ভক্তকে চোখের জলে ভাসিয়ে নশ্বর পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেন মেরি কুরি, সমাহিত হলেন প্রিয়তম স্বামীর পাশেই। বিজ্ঞানের জগতে তার অসামান্য অবদান বিশ্ববাসী শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করবে চিরদিন।

 

 

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
২২ মে, ২০২০ ইং
ফজর৩:৪৮
যোহর১১:৫৫
আসর৪:৩৪
মাগরিব৬:৪০
এশা৮:০১
সূর্যোদয় - ৫:১২সূর্যাস্ত - ০৬:৩৫
পড়ুন