‘পুরুষতান্ত্রিকতা ধর্ষক সৃষ্টি করে’
২২ মে, ২০১৭ ইং
‘পুরুষতান্ত্রিকতা ধর্ষক সৃষ্টি করে’
পুরুষতান্ত্রিকতা ধর্ষক সৃষ্টি করে

পুরুষতান্ত্রিকতা সমাজে ধর্ষক সৃষ্টি করছে বলে মনে করেন উপমহাদেশের এই নারী অধিকারকর্মী । তিনি বলেন, কেউ ধর্ষক হয়ে জন্ম নেয় না, তুমি-আমি-আমরা ওদের ধর্ষক বানিয়েছি। দেশে সম্প্রতি আলোচিত ধর্ষণের ঘটনায় উল্লেখ করে তিনি বলেন, তিনটি রেপ হয়েছে, তার মধ্যে একটি আলোচিত হচ্ছে। এর মধ্যে একজন নারী পুলিশ কনস্টেবল তার পুরুষ সহকর্মী দ্বারা ধর্ষিত হয়েছে তাও আলোচনায় আসছে না। একজন বাবা তার আট বছরের মেয়েকে নিয়ে আত্মহত্যা করেছে, বনানীর রেইনট্রি হোটেলে ধর্ষণের ঘটনার বিচার নিয়ে এত কথা হচ্ছে, অন্য দুই ধর্ষকের বিচার নিয়ে কারও মাথাব্যথা নেই কেন?

 

n মেয়েদের খোলামেলা চলাফেরা কি পুরুষদের

ধর্ষণে প্ররোচিত করে

এটা সমাজে প্রচলিত এক ধরনের মনোভাব। এর সমালোচনা করে তিনি বলেন, ৩৫ বছর ধরে নারী-পুরুষের সমতা ও ওরা বলে আমরা দেহ আবৃত রাখি না বলেই ধর্ষিত হই, অথচ নিজেরা সব জায়গায়, সব সময় মূত্রত্যাগ করে। আমরা (নারীরা) ধর্ষক হলে দক্ষিণ এশিয়ার সব পুরুষ ধর্ষিত হতো। মেয়েদের পরিবারের সদস্যদের পুরুষতন্ত্রের পুতুল হিসেবে অভিহিত করে কমলা বলেন, চলন্ত বাসে নারী দেহে হাত দেওয়া ছেলেদের পরিবার জানতে চায় না তার সন্তান ঘরের বাইরে কী করছে; কিন্তু মেয়ে কী পোশাক পরলো, তা নিয়ে আমাদের চিন্তার শেষ নেই!

 

n ক্রাইম অব পাওয়ার

যৌনতা-আকাঙ্ক্ষা নয়, ধর্ষণের মূলে রয়েছে ক্ষমতা, এটি ‘ক্রাইম অব পাওয়ার’। পুরুষতন্ত্রকে ‘কুসংস্কার’ হিসেবে অভিহিত করে নারীর চুল থেকে পা পর্যন্ত পুরুষের নিয়ন্ত্রণে এমন মন্তব্য করে কমলা বলেন, তারা বলে ঈশ্বর আমাদের অধীনস্থ করে সৃষ্টি করেছে, অথচ প্রজনন ছাড়া নারী-পুরুষে কোনো পার্থক্য নেই। অথচ প্রতিনিয়ত পুরুষরা আমাদের শ্রম, যৌনতা, প্রজনন ও মগজকে শোষণ করে লাভবান হচ্ছে। পুরুষ নারীকে স্বাধীনতা দিতে চায় না, কারণ স্বাধীন হলে তারা শোষণ করতে পারবে না। তাই চার দেয়ালে আটকে রাখতে চায়, ঘর থেকে বের হতে দিতে চায় না। আমরা যত বাইরে বের হব তত আমাদের উপর সহিংসতা কমবে। এই ঘরে যে নারীদের জন্ম হয়েছে তারা উচ্চ শ্রেণির ও শিক্ষিত। কিন্তু এটাই আসল চিত্র না। ৫০ শতাংশ জনসংখ্যা নারী হলেও স্বাস্থ্য, সম্পদ, স্বাধীনতা, শিক্ষা সকল বিষয় লাভবান হয় পুরুষ। নীতিনির্ধারণের জন্য যে সংসদ তাও ৯০ শতাংশ পুরুষের নিয়ন্ত্রণে। এই অবস্থা পরিবর্তনে পুরুষের পাশাপাশি নারীদের মানসিকতারও পরিবর্তন প্রয়োজন।

 

n নারীমুক্তির উপায়

বলতে হবে আমি বাইরে যাব। দিন-রাত যখন খুশি বাইরে যাব। একা-দোকা যার সাথে ইচ্ছা বাইরে যাব। আমি বাইরে যাব, যাব, যাব। আমরা এখন পোস্ট ফেমিনিজমে আছি। একে শত্তিশালী করতে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে যেতে হবে বলে মনে করেন সমাজ বিজ্ঞানী, উদ্যমে উত্তরণে শতকোটি (ওয়ান বিলিয়ন রাইজিং)-এর দক্ষিণ এশিয়ার সমন্বয়ক ও নারীবাদী আন্দোলনমঞ্চ সাংগাত-এর প্রতিষ্ঠাতা কমলা ভাসিন। তিনি বলেন, ‘হি ফর সি নয়, হি ফর হি’ নারীর সমতা প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হবে। পুরুষ পুরুষকে সচেতন করলে নারীবাদের স্বপ্ন এগিয়ে যাবে আর এতে পুরুষ লাভবান হবে। যখন রান্না, ধোয়া, ঘরগোছানো অর্থের বিষয় জড়িত হয় তখনই বিষয়টি পুরুষের হয়ে যায়। পুরুষ লন্ড্রিতে পরনারীর কাপর ধুতে পারে বাড়িতে নিজের স্ত্রীর না। বর্তমান সময়ের ধর্ষণের ঘটনা সম্পর্কিত এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, কেউ কেউ বলেন ধর্ষণ বেশি হচ্ছে না কি এই বিষয়ে রিপোর্টিং বেশি। আমি বলবো দুটোই। আর এ জন্য অবাধ পর্নোগ্রাফির বিচরণকে তিনি দায়ী করেন। এর কারণে কিছু কিছু জায়গায় ছেলেরাও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়। এই অবস্থারও পরিবর্তন দরকার।

 

n প্রতিবন্ধী নারী-পুরুষের যৌন-অধিকার

ভারত বাংলাদেশে কোথাও প্রতিবন্ধী ব্যক্তির বিয়ে, যৌন সম্পর্ককে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। এই বিষয়ে বেশি বেশি কথা বলার আহ্বান করেন তিনি। আমরা সুস্থ স্বাভাবিক নারীর যৌন অধিকারকে মেনে নিতে পারি না। সেখানে প্রতিবন্ধীদের বিষয় অনেক পরের। তবে কিছু উন্নয়ন সংস্থা কাজ করছে। সব সময় সব বিষয় সমাধানে শিক্ষার প্রয়োজন। আমি নারী আমি শিক্ষা চাই। আমি নিজেকে এগিয়ে নিতে শিক্ষা চাই। আমি উড়ে যেতে শিক্ষা চাই। আমি ক্ষমতায়নের জন্য শিক্ষা চাই।

 

n নারীবাদের মূল ধারণা

খুব সহজ অর্থে ফেমিনিজম বা নারীবাদ হলো নারীর চোখে পৃথিবীকে দেখা। আমাদের মূলধারার মিডিয়া, বিজ্ঞাপন, সিনেমা, সাহিত্য, ধর্মীয় কুসংস্কার সর্বোপরি পিতৃতান্ত্রিক-পুঁজিবাদী সমাজ ব্যবস্থা বছরের পর বছর ধরে এটাই বুঝিয়ে আসছে। তাই নারীবাদ মানে তাদের জন্য একটি ভয়ঙ্কর ব্যাপার। কারণ এটি অপসংস্কারের পাশবদ্ধ এ সমাজব্যবস্থায় বহুযুগ ধরে চলে আসা রীতিনীতিকে চ্যালেঞ্জ করে, যেটি এই পিতৃতান্ত্রিক সমাজকর্তাদের অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। পিতৃতান্ত্রিকতা দ্বারা তারাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়, কিভাবে কমলা-জোর দিয়ে বলি, পুরুষদেরও বোঝা উচিত যে এই পুরুষতন্ত্রের দ্বারা নারীর চেয়ে তারাও কম ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন না।

সামগ্রিকভাবে সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে মেয়েরা এখন অনেকটা এগিয়েছে কিন্তু পিতৃতান্ত্রিক সমাজে আজো একজন পুরুষকে তার পরিবারের ভরণপোষণ ও রক্ষকের ভূমিকা পালন করতে হয়। কোন কারণে তিনি তা করতে ব্যর্থ হলে সে সমাজ তাকে চোখে আঙ্গুল তুলে দেখায় তুমি পুরুষ নও। একজন নারীবাদী হিসেবে আমি মনে করি আমরা সেদিন সত্যিকারের সমতা অর্জন করতে পারবো যেদিন প্রত্যেকটি নারী বা পুরুষ স্বাধীনভাবে তার কাজ এবং পরিবারে তার ভূমিকা বেছে নিতে পারবেন।

 

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
২২ মে, ২০২০ ইং
ফজর৩:৪৮
যোহর১১:৫৫
আসর৪:৩৪
মাগরিব৬:৪০
এশা৮:০১
সূর্যোদয় - ৫:১২সূর্যাস্ত - ০৬:৩৫
পড়ুন