পানি, জলবায়ু এবং একজন আইনুন নিশাত
০১ ফেব্রুয়ারী, ২০১৭ ইং
পানি, জলবায়ু এবং একজন আইনুন নিশাত
পানির সঙ্গে প্রাণের যোগসূত্র। এদেশের প্রাণভোমরা নদী আর মিঠাপানি। জালের মতো ঘিরে রাখা এই জলময় দেশে পানি নিয়ে যে হাহাকার, নদী নিয়ে যে শঙ্কা, তার বিপরীতে দাঁড়ানোর মতো, বিশেষ জ্ঞান নিয়ে উপস্থিত হওয়ার মতো মানুষ নেই বললেই চলে। সেই নেই-এর ভেতরেও আছেন আইনুন নিশাত, যিনি পড়েছেন প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে, পড়িয়েছেনও সেখানে। আর সারাজীবন কাজ করেছেন পানি, জলরায়ু নিয়ে। আমাদের এবারের পথিকৃত্ এই বিশেষজ্ঞ মানুষটিকে নিয়ে

ফারুক আহমেদ

কৈশোর-বেড়ে ওঠা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি আমাদের যে গল্প শোনান, তাতে খুব স্পষ্টভাবেই ধরা দেয় তাঁর বেড়ে ওঠার সময়টা। মনে হয়, সে গল্পটা পাঠককে তাঁর মুখ দিয়ে শোনানোটাই অধিক প্রাণবন্ত হবে—আমার পিতা মরহুম গাজী শামসুর রহমান বিচার বিভাগের কর্মকর্তা ছিলেন। ডিস্ট্রিক জাজ পরিচয় দিতেই তিনি সবথেকে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। যদিও পরবর্তীকালে বাংলাদেশ সরকারের যুগ্মসচিব পদমর্যাদার মানে চিফ ড্রাফটসম্যান ছিলেন। এর মানে হলো, যে সমস্ত আইন প্রণয়ন করা হতো তার খসড়া প্রণয়নকারী দলের প্রধান ছিলেন তিনি। তিনি যখন চাকরি শুরু করেন, সেটা ১৯৪৬ সালের কথা, তখন ওই পদের নাম ছিল ‘মুনসেফ’ এখন যা সহকারি জর্জ। আমার জন্মের সময় বাবা ছিলেন বাজিতপুরে। সেখান থেকে বদলি হয়ে জামালপুর, সেখান থেকে মুন্সিগঞ্জ। তখনো স্কুলে যাইনি, স্কুল অনেক দূরে ছিল বলে হয়তো পাঠানো হয়নি, বাসাতেই পড়াশোনা হতো। এরপর আব্বা বদলি হলেন পঞ্চগড়ে। তখন ওটা একটি থানা। সেখানে ‘মুনসেফ’ কোর্ট ছিল। সেখানেই পঞ্চগড় ফ্রি প্রাইমারি স্কুলে ভর্তি হই একবারে ক্লাস থ্রিতে। পরবর্তী সময়ে দেখেছি অতি সুন্দর পাকা ভবন হয়েছে সেখানে। তবে আমার যে স্মৃতি আছে সেটি ছিল টিনে ছাওয়া স্কুল, দেওয়ালটা টিনের, তলা দিয়ে ফাঁকা। তলা দিয়ে ইচ্ছে করলে পালিয়ে যাওয়া যেত। সামনে বড় মাঠ ছিল। আমরা সেই পঞ্চাশের দশকের সময়ে হাফপ্যান্ট পরে স্কুলে যেতাম। তখনকার প্রাইমারি স্কুলে অতি যত্নসহকারে পড়ানো হতো। ওখান থেকে যা-ই শিখেছি আমি মনে করি, পড়াশোনার মূল ভিত্তি সেখানেই তৈরি হয়েছে। বাড়িতে সহায়তা পেতাম। আম্মা বিজ্ঞানের ছাত্রী ছিলেন। আমার মা পড়াশোনা করেন কলকাতার লেডি ব্রাবোর্ন কলেজে। তিনি বরিশাল গার্ল কলেজ থেকে মেট্রিকুলেশনে অংকে পেয়েছিলেন লেটার মার্ক। এর জন্য তিনি দুটো মেডেল পেয়েছিলেন। মূলকথা হলো আমার শিক্ষায় পরিবারের যেমন ভূমিকা আছে, স্কুলের তেমন ভূমিকা রয়েছে। ওই স্কুলে ক্লাস থ্রি-ফোর পড়ার পর আব্বা বদলি হন বগুড়াতে। বগুড়া জেলা স্কুলে মাস তিন-চারেক পড়েছি। তারপর আব্বা বদলি হয়ে যান নোয়াখালীতে। সেই হিসেবে নোয়াখালী জেলা স্কুলে ক্লাস ফাইভ কমপ্লিট করেছি। তারপর আব্বা আবার বদলি হয়ে যান সিলেটে। সিলেটে পড়াকালীন আমি দেখেছি সেখানকার স্যাররা যেমন যত্নসহকারে পড়াতেন, তেমনি সিলেটে যে বেত পাওয়া যায় তার যথাযোগ্য ব্যবহার করতেন। এরপর আব্বা আসেন ঢাকায়। ছ’মাস ছিলেন। ওই ছ’মাস পড়েছি ওয়েস্ট অ্যান্ড হাই স্কুলে। সেখান থেকে বদলি হয়ে যান দিনাজপুর। দিনাজপুর দু’বছর ছিলাম। সেখানে দিনাজপুর জিলা স্কুলে ছিল আমার দু’বছরের শিক্ষাজীবন। এরপর আবার ঢাকায় চলে আসেন। ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলে নাইন এবং টেনে পড়েছি। এটা ১৯৬৩ সালের কথা বলছি, ঢাকা কলেজিয়েট স্কুল সেসময়ে ঢাকা শহরের অন্যতম প্রধান স্কুল ছিল। ঢাকা ছিল তখন এখনকার পুরনো ঢাকাকেন্দ্রিক। সরকারি অফিসাররা থাকতেন আজিমপুর। মতিঝিলে কেবল কলোনি হয়েছে। ফলে ভালো স্কুলগুলোর অবস্থান সব পুরনো ঢাকাতেই ছিল। আমি যখন ক্লাস নাইনে ভর্তি হই, তখন শুনেছিলাম যে ঢাকা কলেজিয়েট স্কুলকে ঢাকা কলেজের পাশে ট্রান্সফার করে নিয়ে আসা হবে । আজকের যে গভর্নমেন্ট ল্যাবরেটরি হাইস্কুল সেখানে কিন্তু ঢাকা কলেজিয়েট স্কুল করার জন্যই সব আসবাবপত্র আনা হয়েছিল। পরবর্তীকালে সেটি আর হয়নি। কলেজিয়েট স্কুলে বিভিন্ন এক্সট্রা কারিকুলার অ্যাক্টিভিটিস হতো। দিনাজপুর জেলা স্কুলে পড়াকালীন সময়ে বিতর্ক প্রতিযোগিতায় আমি অংশগ্রহণ শুরু করি। এবং সেখানেই আমি বিতর্ক করতে শিখি। পরবর্তী সময়ে আমি যখন বুয়েটে ঢুকি, আমি প্রচুর বিতর্ক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করেছি এবং প্রচুর পুরস্কার পেয়েছি।

এসএসসিতে ভালোই রেজাল্ট করি। এরপর ভর্তি হই নটর ডেম কলেজে। তখন নটর ডেম কলেজে নম্বরের ভিত্তিতে ভর্তি করা হতো। কাজেই যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ভর্তি হওয়া গেল। এখানে বলে রাখি, আমি হলাম একমাত্র ব্যাচ যারা ক্লাস নাইন টেন ইলেভেন টুয়েল্ভ এই চার বার বোর্ডে পরীক্ষা দিয়েছে। ক্লাস নাইনে পরীক্ষামূলকভাবে পরীক্ষা হয়। ক্লাস ইলেভেনেও পরীক্ষামূলকভাবেই পরীক্ষা নেওয়া হলো, নটর ডেম কলেজে ক্লাস ইলেভেনে যারা পরীক্ষা দিয়েছিল তাদের মধ্যে আমি প্রথম এক-দুই জনের মধ্যেই ছিলাম। অর্থাত্ বোর্ডের মাপে একবারে শীর্ষেই ছিলাম। এর মধ্যে আব্বা বদলি হয়ে যান ফরিদপুর। নটর ডেমে হোস্টেলের অবস্থা খুব একটা সুবিধার ছিল না। যেটা ছিল সেটা নাম কা ওয়াস্তে। তো যে কারণে সিদ্ধান্ত হয়, আমি আব্বার সঙ্গে ফরিদপুর চলে যাব। সে কারণে আমি রাজেন্দ্র কলেজ থেকে ১৯৬৫ সালে এইচএসসি পাস করি। রেজাল্ট ভালোই ছিল, বুয়েটে ভর্তি হতে কোনো অসুবিধা হয়নি। কাজেই পরবর্তী চার বছর বুয়েটে কাটিয়েছি, আহসানুল্লাহ হলের ছাত্র ছিলাম, আমরা তিন জন রুমমেট ছিলাম। চার বছর ওই তিন জন একই রুমে কাটিয়েছি। তাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব এখনো অটুট আছে। আর আমাদের কলেজিয়েট স্কুলের বন্ধুদের মধ্য থেকে বিচারপতি হয়েছেন শামসুদ্দিন চৌধুরী। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হয়েছেন সালেহ উদ্দিন আহমেদ, আমেরিকাতে ইউনিভার্সিটির ডিন হয়েছেন মাসুদ, আবার সাংবাদিক হয়েছেন জালালুদ্দিন (ক্রীড়া বিশ্লেষক), রুশো সাংবাদিক ছিলেন। প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী আছেন, আবার খুব সামান্য চাকরি করে জীবন কাটিয়েছেন এমনও অনেকে আছেন।  

পেশাজীবন

বুয়েট থেকে পাস করে এক বছর একটি প্রাইভেট ফার্মে কাজ করেন। এরপর বছর দুই পানি উন্নয়ন বোর্ডের সহকারি প্রকৌশলীর চাকরি, শেষে বুয়েটে জয়েন করেন প্রভাষক হিসেবে ১৯৭২ সালে।  এরপর বাহাত্তরে বুয়েটে শিক্ষকতায় যোগদান করেন। ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত বুয়েটেই ছিলেন। তারপর বেরিয়ে এসে আইইউ সিয়েন নামক একটি প্রতিষ্ঠানে প্রকৃতি সংরক্ষণের কাজ হাতে নেন।

পড়াশোনা করেছেন সিভিল ইঞ্জিয়ারিং নিয়ে। এমএসসি এবং পিএইচডিও এই সাবজেক্টে। কিন্তু বেশি কাজ করেছেন পানি নিয়ে। এই পানিটা কীভাবে তাঁর সঙ্গে যুক্ত হলো, শোনা যাক তাঁর বয়ানেই—‘আসলে আমার হিসেবে প্রকৌশলের ভেতরে ছয়টি কাজ আছে এগুলো হচ্ছে—স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিং, জিওট্যাকনিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং, ট্রান্সপোরটেনিং ইঞ্জিনিয়ারিং, এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিং, ওয়াটার রিসার্স ইঞ্জিনিয়ারিং, নির্মাণকৌশল। এই নির্মাণকৌশল হলো, যেমন আমি একটি স্লুইচ গেট বানাব, তাহলে এই স্লুইচ গেটটি নির্মাণ করতে গেলে পানিবিজ্ঞানের তথ্য লাগবে। এটা ওয়াটার রিসার্সিং-এর একটি বিভাগ। আমি দীর্ঘকাল এটি পড়িয়েছি। সেচবিজ্ঞান পড়িয়েছি, বন্যাব্যবস্থাপনা পড়িয়েছি, এবং পানিসম্পদ প্রণয়নের পদ্ধতি প্রকল্প পড়িয়েছি। তো আমি যখন স্লুইচটা ডিজাইন করছি তখন কাঠামোগত জ্ঞান লাগবে, স্লুইচটা ফাউন্ডেশনের জন্য জিওট্যাকনিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং-এর জ্ঞান লাগবে। স্লুইচের আশেপাশে রোড নেটওয়ার্ক তৈরি হবে এর জন্য লাগবে ট্রান্সপোরটেনিং ইঞ্জিনিয়ারিং-এর কিছুটা সাহায্য। এরপর স্লুইচটা এমনভাবে আমাকে ডিজাইন করতে হবে যাতে পরিবেশটা ব্যাহত না হয়।  এর জন্য এনভায়রনমেন্টাল ইঞ্জিনিয়ারিংটা লাগবে। আর পুরো বিষয়টাই তো ওয়াটার ইঞ্জিনিয়ারিং-এর ব্যাপার। তো আমি আমার পেশাজীবন শুরু করেছিলাম স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিং-এর মাধ্যমে। পানি উন্নয়ন বোর্ডে গিয়ে যেহেতু ওয়াটার রিসোর্সিং ইঞ্জিনিয়ারিং-এ কাজ শুরু করলাম, বুয়েটে যখন যোগদান করলাম তখন আমি ওয়াটার-টিকেই বেছে নিলাম। এটা নিয়ে কাজ করতে যাওয়ার পেছনে একটি কারণ আমার মনে হয়, সেটা হচ্ছে, স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিয়ারিং-এ যখন একটি ভবন ডিজাইন করা হয় তার আউটলাইন দিয়ে দেয় আর্কিটেক্ট এবং ওই ডিজাইনের ওপর তিন জন যদি তিনটা ভবন নির্মাণ করেন তাহলে এই ভবনগুলো কাছাকাছি হবে। কিন্তু এক্ষেত্রে ওয়াটার রিসোর্সের ব্যাপার হলো এটার প্রত্যেকটি প্রকল্পই নতুন ধরনের। এটি রিপিটেটিভ না। আরেকটি হচ্ছে, এটির মাধ্যমে মানুষের সঙ্গে অতি ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রয়েছে। এতে কন্টিনিউয়াসলি সাবজেক্ট চেঞ্জ হয়। যেমন জিকে প্রজেক্ট, পঞ্চাশের দশকে যখন ডিজাইন করা হয়েছিল, তখন আমন ধানের জন্য বৃষ্টি ব্যতিত অতিরিক্ত যতটুকু পানি প্রয়োজন ততটুকু পানি দেওয়া ছিল মূল লক্ষ্য। এখন বোরো ধান চলে এসেছে, সুতরাং চ্যালেঞ্জটি অন্যধরনের। আমি একটি কথা বলতে চাই, আমি যে বিষয়েই স্পেশালাইজড হই না কেন, আমাকে সিভিল ইঞ্জিয়ারিং পুরোটা জানতে হবে। তো যদিও আমি পিএইচ ডি করেছি পানিপ্রবাহের ওপরে ও নদীবিজ্ঞানের ওপরে। নদীবিজ্ঞানের এই বিষয়টা বুয়েটে মাস্টার্স লেভেলে পড়ানো হয়। হাইড্রোলজি আন্ডার গ্রাজুয়েট লেভেলে আমি পড়িয়েছি। পানিবিজ্ঞান, সেচবিজ্ঞান, সেচ-প্রকৌশল, পানি নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি। কিন্তু আমি পরবর্তী সময়ে পিওর প্রকৌশল থেকে নিজেকে প্রস্তুত করেছি প্রকৌশলের সঙ্গে প্রকৃতির সম্পর্ক বিষয়েও। যেমন জলাভূমি ব্যবস্থাপনা, নদীব্যবস্থাপনা, নদী ভাঙ্গন রোধ, যমুনা সেতু কিংবা পদ্মা সেতুতে নদী শাসন নিয়ে কাজ করি। এবং এখানে পরিবেশের বিষয়টি আমার জন্য চ্যালেঞ্জিং হয়ে দাঁড়াচ্ছে। কারণ পঞ্চাশের দশকের পরিবেশ আর এখনকার পরিবেশ টোটালি আলাদা। সময়ে সময়ে যে কারণে এর সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত সকল বিষয় পরিবর্তনশীল। মূলকথা হচ্ছে আমরা যে যে বিষয়েই পড়াশোনা করি না কেন, আমি মনে করি, (আমলাদের কথা আলদা)  পেশায় যেকোনো একটি বিষয়ে স্পেশালাইজড হওয়া বাঞ্ছনীয়। তবে সবথেকে বড় বিষয় হলো যে কাজটি করছি সেটি যেন আমি উপভোগ করি। আমি শিক্ষকতা করেছি আগে, এখনো করি, যদিও এখন আন্ডার গ্রাজুয়েট লেভেলে পড়াই না, কিন্তু মাস্টার্স লেভেল থেকে ওপরের দিকে এখনো পড়াই। ট্রেনিং করাই। পেশাজীবীদেরকে বিভিন্ন বিষয়ে যেমন—জলবায়ু পরিবর্তন, নদীশাসন, আন্তর্জাতিক নদীব্যবস্থাপনা নিয়ে কথা বলে আমি অত্যন্ত আনন্দ পাই।

কিন্তু আমাদের দেশে এই স্পেশালাইজেশনের বড় অভাব। কারণ প্রশাসন ব্যবস্থা এমন হয়ে গেছে যে এখানেই সব সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে, যদিও এটাই হওয়া উচিত। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থাপনাটাও এমন হওয়া উচিত যে প্রশাসক তিনি মন্ত্রী হন আর সচিব হন তিনি উপযুক্ত বিশেষজ্ঞের মতামত গ্রহণ করবেন। এখন আমরা দেখতে পারছি বিভিন্ন বিষয়ে স্লোগানধর্মী কথা যাঁরা বলতে পারেন তাঁদেরই মূল্যায়নে আনা হয়। ভাষা ভাষা জ্ঞান নিয়ে যাঁরা জোরালো বক্তব্য দিতে পারেন তাঁদের কদর করা হয়। গবেষণা পর্যায়ে আমাদের যে শিক্ষাব্যবস্থাটা, এখানে ছাত্রছাত্রীরা ভর্তি হয় যতদিন না বাইরে পড়ার সুযোগ পায়, এবং যে পরিমাণ ছাত্র ভর্তি হয় তার দশভাগের একভাগ টিকে থাকে কি-না সন্দেহ। শিক্ষকরা আন্ডারগ্রাজুয়েট টিচিং নিয়ে ব্যস্ত। ব্যবহারিক জীবনে যাঁরা কাজ করেন তাঁদের সঙ্গে গবেষণা নিয়ে যাঁরা ব্যস্ত তাঁদের যোগ নেই বললেই চলে। বাইরের দেশে গবেষকদের যেমন সম্মান দেওয়া হয় আমাদের দেশে সে-রকম ব্যবস্থা নেই। নিজেদের তাগিদ থেকে যদি আমাদের গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে উঠত তাহলে হয়তো আমরা নতুন কিছু করতে পারতাম। আমাদের অনেক যন্ত্রপাতি আছে, কিন্তু সদ্ব্যহারের লোক নেই, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বুয়েটে গেলে দেখা যাবে প্রত্যেকটি বিভাগে অনেক নতুন যন্ত্রপাতি কিংবা দামি যন্ত্রপাতি অব্যবহূত অবস্থায় পড়ে আছে। একজন শিক্ষক বিদেশ থেকে পিএইচডি করে আসলেন, এরপর তিনি যে বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করতে চান সেগুলোর চাহিদা দেন, সেগুলো চলে আসে। তিনি এক-দুই বছর হয়তো কাজ করলেন তারপর হয়তো ইন্টারেস্ট হারিয়ে অন্য ফিল্ডে চলে গেলেন কিংবা দেশ ছেড়ে চলে গেলেন। অর্থাত্ দেশে যদি এইসব বিষয়ে একটি সুপরিকল্পিত অগ্রসরের পথ বের করা হতো তাহলে আমরা ভালো করতে পারতাম। আমাদের মেধা আছে কিন্তু প্রচেষ্টা নেই।

 

অর্জন

তাঁর দীর্ঘ বর্ণাঢ্য কর্মজীবনে তিনি শিক্ষকতার পাশাপাশি বিভিন্ন দেশি-বিদেশি সংস্থায় বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করেছেন। এরমধ্যে বিশ্বব্যাংক, এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক ইত্যাদি। এছাড়াও তিনি বাংলাদেশের দীর্ঘতম সেতু যমুনা সেতুর বিশেষজ্ঞ প্যানেল-এর একজন সদস্য ছিলেন। ওয়ার্ল্ড ব্যাংক, বাংলাদেশ এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক, মালয়েশিয়া এবং ফিলিপাইন-এর মতো বিভিন্ন প্রকল্পে কাজ করা ছাড়াও তিনি বাংলাদেশের দীর্ঘতম সেতু বিশেষজ্ঞ প্যানেল-এর একজন সদস্য ছিলেন, যাঁরা যমুনা সেতু নির্মাণ-এ পরামর্শ দেন। তিনি বাংলাদেশ ন্যাশনাল ওয়াটার কাউন্সিল, ইন্দো-বাংলা যৌথ নদী কমিশন এবং বাংলাদেশ জাতীয় কৃষি কমিশন এবং ন্যাশনাল কাউন্সিল ফর সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি-এর সদস্য। তিনি গত আঠার বছর ধরে আন্তঃসীমান্ত যৌথ নদী কমিশনের সদস্য এবং ১৯৯৬ সালে ঐতিহাসিক গঙ্গা চুক্তিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। এছাড়া জলবায়ু নিয়ে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সেমিনারে বাংলাদেশের বিশেষজ্ঞ দলের প্রতিনিধিত্ব করে যাচ্ছেন। বর্তমানে পদ্মা সেতুর বিশেষজ্ঞ প্যানেলের অন্যতম সদস্য। যমুনা সেতু নির্মাণকালেও একই দায়িত্বে ছিলেন।

ড. আইনুন নিশাত বাংলাদেশের জলসম্পদ ব্যবস্থাপনা এবং জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত বিভিন্ন গবেষণায় কাজ করেছেন এবং তাঁর লেখা বই দেশে-বিদেশে সমাদৃত হয়েছে। এছাড়া তিনি বিভিন্ন সম্মেলনে তাঁর লেখা বিভিন্ন গবেষণাপত্র পাঠ করেছেন। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি-র দায়িত্বে ছিলেন ২০১০-২০১৪ সাল পর্যন্ত। সম্মানিত অ্যামেরিটাস অধ্যাপক হিসেবে এখনো যুক্ত আছেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে। বিশ্ববিদ্যালয়টির সেন্টার ফর ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল-এর পূর্ণকালীন গবেষণায় রত।

 

পরিবার

স্ত্রী সামিনা সুলতানা ইতিহাসের অধ্যাপিকা ছিলেন। জগন্নাথ ইউনিভার্সিটি থেকে রিটায়ার করেছেন বেশ আগেই। রিটায়ার করার পর তিনি পিএইচডি শুরু করেন। বেশ কিছু দিন আগে সেটা শেষ করেছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। এখন তিনি ইতিহাস একাডেমি নামে একটি প্রতিষ্ঠান চালান যেটি ইতিহাস বিষয়ে গবেষণায় উত্সাহিত করে। এই দম্পতির তিন কন্যা—বুশরা নিশাত, সাজিয়া নিশাত ও উজমা নিশাত। তিন জনই প্রকৌশলী। বড়জন ঢাকাতেই থাকেন, তিনিও পানিবিজ্ঞান বিশেষজ্ঞ। কাজ করছেন একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে।  দ্বিতীয় মেয়ে কানাডায় থাকেন। তিনি পানি এবং পরিবেশ দুটোর মাঝামাঝি বিষয় নিয়ে কাজ করেন। তৃতীয় কন্যা কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার। কম্পিউটার হার্ডওয়্যার নিয়ে কাজ করছেন আমেরিকায়, একটি মার্কিন কোম্পানিতে। 

 

গ্রন্থনা :অহ নওরোজ

 

 

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
১ ফেব্রুয়ারী, ২০২০ ইং
ফজর৫:২১
যোহর১২:১৩
আসর৪:০৯
মাগরিব৫:৪৮
এশা৭:০৩
সূর্যোদয় - ৬:৩৯সূর্যাস্ত - ০৫:৪৩
পড়ুন