সর্ববৃহত্ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নাম পরিবার
এস এম ইমরান হোসেন২২ মে, ২০১৭ ইং
সর্ববৃহত্ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নাম পরিবার
একের পর এক নৈতিক অবক্ষয়ের ঘটনা গাঢ় নিঃশ্বাস ফেলছে আমাদের সমাজের ঘাড়ে। আমরা কী তা টের পাচ্ছি নাকি এগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে দায় এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছি? কয়েকদিন আগে বনানীর রেইনট্রি হোটেলে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই তরুণী ধর্ষণের শিকার হলেন। এই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই চার সন্তানের জননী সন্তানদের জন্য খাবার কিনতে গিয়ে ধর্ষিত হলেন। ধর্ষণের পর তাকে প্রাণে হত্যা করা হলো। আমরা ভুলে যাইনি, শিশুকন্যার ধর্ষণের বিচার না পেয়ে বাবা হযরত আলী কন্যাসহ ট্রেনের নিচে ঝাঁপিয়ে পড়লেন।

তবে কি আমাদের সমাজ ভুল পথে হাঁটছে? আমার পর্যবেক্ষণ বলছে, আমরা ভুল পথে হাঁটছি। এতগুলো ঘটনা কোনোমতেই বিছিন্ন ঘটনা নয়। বিচারহীনতার সংস্কৃতি যতদিন থাকবে, ততদিন সামাজে অনাচারকারীরা পার পেয়ে যাবে। শত শত বছরের সামাজিক মূল্যবোধসম্পন্ন আমাদের সমাজ কেন হঠাত্ করেই অস্থির হয়ে উঠছে? প্রশ্নের উত্তর খুঁজি।

আপনাদের সামনে এবার কিছু তথ্য হাজির করি। আপনারা নিশ্চয়ই বাবা-মায়ের হত্যাকারী ঐশীর কথা ভুলে যাননি। সংবাদমাধ্যমে জানা গিয়েছিল ঐশীর বাবা তাকে হাতখরচ হিসেবে প্রতিমাসে দিতেন একলক্ষ টাকা। সেই টাকা দিয়ে ইয়াবাসহ নানা রকমের নেশায় জড়িয়েছিল ঐশী। লোপ পেয়েছিল তার ন্যায়-অন্যায়ের বোধ। ফলাফল তো দেশবাসী সবাই জানেন। বনানীর ধর্ষণকাণ্ডে অভিযুক্ত সাফাত পুলিশকে জানিয়েছে তার বাবা স্বর্ণ ব্যবসায়ী দিলদার হোসেন তাকে প্রতিদিন দুই লক্ষ টাকা দিতেন হাত খরচের জন্য। এই টাকা দিয়ে সাফাত তার বন্ধুদের সঙ্গে উচ্ছৃঙ্খল জীবনযাপন করতে। বিত্তের প্রাচুর্যেই যেসব ঘটনা ঘটছে, তা কিন্তু না। শত শত বছর ধরে আমাদের যে সমাজব্যবস্থা সেটি কিন্তু আমাদের অগোচরে একটু একটু করে বদলাচ্ছে। মূলত শহর ভিত্তিক পরিবারগুলোতে আমরা দেখছি যৌথ পরিবার ক্রমাগত ভেঙে যাচ্ছে। আগেকার দিনে যৌথ বা একান্নবর্তী পরিবারে দাদা-দাদি এবং মুরুব্বিরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতেন। নানা সময়ে ত্রুটি-বিচ্যুতি দেখলে তারা নাতি-নাতনিদের শাসন করতেন। পরিবারের কনিষ্ঠ সদস্যরা একধরনের পারিবারিক অনুশাসনের মধ্যে বেড়ে উঠত। কিন্তু শহুরে সংস্কৃতিতে সেসবের বালাই নেই। সামাজিক মূল্যবোধের শিক্ষা যে পরিবার থেকেই আসতে হবে, সেটি কিন্তু ভুলে যাচ্ছেন আমাদের অভিভাবকেরা। ইংরেজিতে একটি কথা আছে, ‘চ্যারিটি বিগিনস অ্যাট হোম’। অবশ্য এই প্রবাদ বাক্য বর্তমান সময়ে খুব একটা মানছি না আমরা। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় বাবা-মা দুজনেই অর্থ উপার্জনের পিছনে ছুটছেন। কিন্তু সন্তানের মানসিক বিকাশ কতটুকু হচ্ছে সেদিকে লক্ষ্য করবার সময়টুকু মিলছে না। আরেকটি আশঙ্কার কথা হচ্ছে, আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো শিক্ষার্থীদের নীতিনৈতিকতা আর মূল্যবোধের শিক্ষা কতটা দিতে পারছে? নাকি একবারেই ব্যর্থ হচ্ছে? শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর লক্ষ্য যদি হয় বাংলাদেশের জন্য ভবিষ্যতের সুনাগরিক গড়ে তোলা, তবে অবশ্যই তাদের এই বিষয়ে নজর দিতে হবে। প্রতি বছর আমরা লক্ষ লক্ষ জিপিএ-৫ পাচ্ছি, সার্টিফিকেটধারী গ্র্যাজুয়েট পাচ্ছি। কিন্তু সোনার বাংলা গড়ার সেই সুনাগরিক কয়জন পাচ্ছি সেটি ভাবার সময় এখনই। প্রত্যেক পরিবারের বাবা-মায়েরই দায়িত্ব জানা যে, সন্তান কার সঙ্গে মিশছে? আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ‘কালচারাল আইডেন্টিটি’। জাতি হিসেবে আমাদের এক ধরনের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য আছে। আকাশ সংস্কৃতির আগ্রাসনে সেটি নিঃসন্দেহে হুমকির মুখে। আমাদের তরুণেরা আকাশ সংস্কৃতির প্রভাবে এমন এক ধরনের লাইফস্টাইলে অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছেন, যেটি কোনোভাবেই বাঙালি সংস্কৃতির সঙ্গে যায় না। এর প্রভাব আমরা ধীরে ধীরে একটু-আধটু টের পেতে শুরু করেছি। বনানীর ধর্ষণের ঘটনার সঙ্গে নাকি বলিউডের সিনেমা ‘পিঙ্ক’-এর হুবহু মিল আছে বলে কিছু সংবাদমাধ্যমে খবর বেরিয়েছে। হতে পারে অবচেতনে এসব সিনেমা এক ধরনের সুদূরপ্রসারী প্রভাব রেখে যায় দর্শকের মনে। কয়েকমাস আগে উত্তরায় অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোরদের ‘গ্যাং’ কালচারের বলি হয়ে আরেক কিশোরের নির্মম হত্যাকাণ্ডের ঘটনাও আমাদের স্মৃতিপট থেকে বিস্মৃত নয়। এ থেকে উত্তরণের পথ কি তবে আমাদের নেই? আমি মনে করি, অবশ্যই আছে। আমাদের বাঙালি সংস্কৃতিকে আরও বেশি করে লালন করতে হবে। পারিবারিক মূল্যবোধ এবং অনুশাসনের জায়গাগুলো আরও শক্ত করতে হবে। আর বিচ্ছিন্ন কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে সেটির বিচার করতে হবে দ্রুততার সঙ্গে যাতে করে ভবিষ্যতে কেউ অপরাধ সংঘটনের কথা কল্পনা ও চিন্তা না করে। আমরা কোনোভাবেই আমাদের সমাজকে ধ্বংস হয়ে যেতে দিতে পারি না। দরকার প্রতিবাদ, দরকার প্রতিরোধ।

লেখক : শিক্ষক, টেলিভিশন, ফিল্ম অ্যান্ড ফটোগ্রাফি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
২২ মে, ২০২০ ইং
ফজর৩:৪৮
যোহর১১:৫৫
আসর৪:৩৪
মাগরিব৬:৪০
এশা৮:০১
সূর্যোদয় - ৫:১২সূর্যাস্ত - ০৬:৩৫
পড়ুন