বিত্তের পাহাড়ের নিচে চাপা পড়ছে মূল্যবোধ
২২ মে, ২০১৭ ইং
বিত্তের পাহাড়ের নিচে চাপা পড়ছে মূল্যবোধ
অনভিপ্রেত ঘটনা এড়াতে নৈতিক সমাজ গঠন করতে হবে

— রেহান আহমেদ

ক্যাম্পাস সুপারিন্টেন্ডেন্ট, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় সাভার ক্যাম্পাস

সাম্প্রতিক কিছু ঘটনায় এ প্রজন্মের নীতি-নৈতিকতার চরম অবক্ষয়ের প্রমাণ পাওয়া গেছে, যা খুবই দুঃখজনক। এসব ঘটনার জন্য দায়ী এ প্রজন্মের মধ্যে নৈতিক শিক্ষার অনুপস্থিতি। শহুরে সংস্কৃতি ও বিশ্বায়নের যে প্রভাব আমাদের উপরে পড়েছে, তাতে নৈতিক শিক্ষার উপস্থিতি আগের মতো নেই। বিভিন্ন ধরনের সংস্কৃতি আমাদের দেশে প্রবেশ করেছে ও মূল্যবোধের জায়গাগুলোতে বিকৃতি ঘটাচ্ছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোও এই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে পরিপূর্ণ নৈতিক শিক্ষা দিতে পারছে না। অতীতে আমরা নৈতিক শিক্ষা পেয়েছি পরিবারের বড়দের কাছ থেকে। এমনকি স্কুলেও শিক্ষকরা নৈতিকতার গুরুত্ব বোঝাতেন।এখন স্কুল-কলেজপড়ুয়া ছেলেমেয়েদেরকে দিকে তাকালে দেখি, সবার হাতে মোবাইল ফোন ও নানারকম গ্যাজেট। ইন্টারনেট এখন খুব সহজলভ্য। ছেলেমেয়েরা মোবাইল ফোনে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচুর সময় ব্যয় করছে। এমনকি ইন্টারনেটের সহজলভ্যতা কখনো কখনো তাদের নিষিদ্ধ দিকেও নিয়ে যাচ্ছে, কেউ কেউ আকৃষ্ট হচ্ছে পর্নোগ্রাফিসহ অপসংস্কৃতির নানারকম বিষয়ে। সবমিলিয়ে তারা হয়ে উঠছে অস্থিরচেতা। অবচেতন মনে তৈরি হওয়া এই অস্থিরতা তাদের নিয়ে যাচ্ছে নেতিবাচক দিকে। কারো কারো কাছে দামি মোবাইল ফোন, দামি মোটরসাইকেল ব্যবহার করাটা এখন ‘স্মার্টনেস’, অথচ আমাদের সময়ে আমরা এমনটা কল্পনাও করিনি। এই বিবেচনাহীন বেড়ে ওঠাকে আমলে নিচ্ছে না এখনকার পারিবারগুলো।

ছোটবেলায় আমরা বিকেলে মাঠে খেলতে যেতাম। সন্ধ্যার আজানের সঙ্গে সঙ্গে ঘরে ফিরতে হতো। এখন এমন বিধিনিষেধ নেই বললেই চলে। পারিবারিকভাবে নিয়মকানুন মেনে চলার যে অভ্যাসটা ছিল, এখনকার শহুরে তরুণেরা সেটা মানছে না। পারিবারিক অনুশাসন ভেঙে যাওয়ায় এবং প্রযুক্তির সহজলভ্যতার কারণে নেতিবাচক দিকে যাওয়াটাই বেশি সহজ। এখন খেলার মাঠে কেউ খেলতে যায় না, সংস্কৃতিচর্চা করে না, ভালো বই পড়ে না। আর বাইরে সময় কাটানোর ফলে পরিবারের সঙ্গে যে দূরত্ব তৈরি হয়, তাতে করেও নৈতিক শিক্ষার ঘাটতি তৈরি হয় এবং সহজেই ভুল পথে যাওয়া যায়।

আমরা দেখতে পাচ্ছি, হঠাত্ করেই অনেক মানুষ প্রচুর বিত্তের মালিক হচ্ছেন। হাতে অঢেল টাকা আসায় আগেকার মতো পারিবারিক ও সামাজিক অনুশাসন নেই। শিক্ষা ও সচেতনতার অভাব আছে। এমন পরিবারের বাবা-মায়েরা নিজেদের সচেতনতার অভাবে সন্তানদেরকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছেন না, সন্তান বিপথগামী হচ্ছে। এরই একটি উদাহরণ ঢাকার বনানীর রেইন-ট্রি হোটেলের ঘটনাটি, যেটি দেশজুড়ে বর্তমানে আলোচিত।

এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার পথে হাঁটতে হলে সচেতন হতে হবে বাবা-মাকে। অল্প বয়সী ছেলেমেয়েদের হাতে স্মার্টফোনের মতো ডিভাইস তুলে দিলেও তার উপর মনিটরিং করতে হবে। প্রযুক্তির অপব্যবহার ঠেকাতে হবে। ছেলেমেয়ে কাদের সঙ্গে মেলামেশা করছে, কোথায় যাচ্ছে; তা নজর রাখতে হবে।

সবাই সচেতন হয়ে নৈতিক সমাজ গড়ার জন্য কাজ করলে আমরা ফিরিয়ে আনতে পারব আমাদের সোনালি সময়।

০০০

অতি আদর আর সঠিক শাসনের অভাব

নৈতিক বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ

—সারা চৌধুরী

সহকারী অধ্যাপক, স্কুল অব বিজনেস, আহসানউল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

 

একটি পরিবারের শক্তি সম্পূর্ণ নির্ভর করে পরিবারের সদস্যদের বন্ধনের উপর। আমরা এখন এতটাই যান্ত্রিক হয়ে গিয়েছি যে, পরিবারের সদস্যদের সময় দিতেই ভুলে যাই বা অনীহা কাজ করে। দিন দিন সামাজিকতা থেকে দূরে সরে যাচ্ছি, অথচ আমাদের দৈনন্দিন জীবনে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম ফেসবুকটা অবিরাম চলছে।

সন্তান বাইরে থেকে এসে হয় মোবাইল নাহলে ল্যাপটপ নিয়ে নিজ রুমে ঢুকে দরজা লক করে রাখে। ফলে বাসায় থাকলেও দেখা হয় না বাবা-মায়ের সঙ্গে। এতে দেখা যায়, সন্তানের সঙ্গে বাবা-মায়ের এক বিশাল দূরত্ব তৈরি হয়। পারিবারিক মূল্যবোধগুলো এভাবেই বিনষ্ট হওয়ার পথে চলে যাচ্ছে। অন্যদিকে অতি আদর ও ভালোবাসা আর সঠিক শাসনের অভাবও নৈতিক বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ বলে আমার মনে হয়।

শিক্ষকরা সবসময়ই চেষ্টা করেন ছাত্র-ছাত্রীদের নৈতিক ও তাত্ত্বিক শিক্ষায় সুশিক্ষিত করে তোলার জন্য। কিন্তু সে যদি বাসায় গিয়ে বাবা-মা কিংবা গুরুজনদের দেখে বিপরীত কাজ করতে, তখন সে কীভাবে সঠিক কাজ করতে উত্সাহী হবে? তাই নৈতিক শিক্ষা শুরু হতে হবে পরিবার থেকেই।

আমার খুবই খারাপ লেগেছে যখন দেখলাম বিভিন্ন পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে, আর মা-বাবার পাশে দাঁড়িয়ে সন্তানেরা সেই প্রশ্নের উত্তর মিলিয়ে পরীক্ষার হলে ঢুকছে! সেই ছেলে কিংবা মেয়ে ওই পরীক্ষায় হয়তো ভালো মার্ক পাবে কিন্তু জীবনের পরীক্ষায় সে নিশ্চিত ফেল করবে, কারণ তার মধ্য থেকে নীতি-নৈতিকতা সব হারিয়ে গেছে।

তাই আমাদের শুধু একাডেমিক জ্ঞান বা প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। জীবনমুখী শিক্ষাব্যবস্থা আর সৃজনশীল কাজে ছেলেমেয়েদের বেশি বেশি উত্সাহী করতে হবে। ওরা যদি নিজেদের গঠনমূলক আর সৃজনশীল কাজে নিয়োজিত রাখতে পারে তবে মানবিকতা বা নৈতিকতা বিপর্যয় হবে না বলে আমার বিশ্বাস। সর্বোপরি সন্তান কে বেশি বেশি সময় দিতে হবে, কারণ আমাদের ছেলেমেয়েরাই আমাদের দেশের ভবিষ্যত্। আর এক্ষেত্রে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি পরিবারের দায়িত্বটাও বেশ বলে আমি মনে করি।

০০০

দিনে অন্তত একবার হলেও সন্তানদের সঙ্গে বসতে হবে

 

—খন্দকার ইফতেখারুল ইসলাম

গ্র্যাজুয়েট অ্যাসিস্টেন্ট, নিউ মেক্সিকো স্টেট ইউনিভার্সিটি

সহকারী অধ্যাপক, আইইউবিএটি

 

ক্লাস টেস্ট আর কুইজ নেওয়ার সময় খেয়াল করলাম, ছাত্র-ছাত্রীরা অনেকেই অন্যের খাতা দেখে লেখার চেষ্টা করছে বা নকল করে লেখার চেষ্টা করছে। এ বিষয়টি আমাকে অবাক করে। নিজেকেই প্রশ্ন করি, আমি কি তাহলে ভালোভাবে বোঝাতে পারিনি? বিষয়টি মাথায় রেখে পরবর্তীতে আরও উদ্যম নিয়ে পড়ানোর চেষ্টা করি, কিন্তু টেস্টের সময় গিয়ে সেই একই অবস্থা—শিক্ষার্থীরা দেখাদেখি করছে!

তখন কারণ খুঁজতে গিয়ে দেখি, অনেকে এটা সাধারণভাবেই নেয়, যেন দেখাদেখি বা চিটিং করা খুব সাধারণ এক ব্যাপার। সব থেকে কষ্ট পেলাম, যখন দেখলাম, এই দেখে লেখা বা চিটিং করার জন্য তাদের মধ্যে নেই কোনো অনুতাপ।

আসলে তখন থেকেই বিষয়টি আমাকে বেশ ভাবাতে শুরু করে। শিক্ষক হয়ে তাদেরকে যদি নৈতিকতা ও মূল্যবোধই শেখাতে না পারি, তাহলে আমার বিবেকের সামনে কীভাবে দাঁড়াব?

সেই ভাবনা থেকে শুরু। সময় পেলেই গল্পের ছলে কিংবা পড়ার ফাঁকে ফাঁকে শিক্ষার্থীদেরকে বোঝানোর চেষ্টা করি নীতিবান হওয়ার জন্য। পড়ালেখা মানেই শুধু ভালো গ্রেড পাওয়া না, জীবনের পরীক্ষায় সত্ থেকে নিজের বিবেকের কাছে বলতে পারা—আমি চিটিং করি না, এটাই বড় প্রাপ্তি। কারণ যে জিনিস নিজের না, সেটাকে নিজের বলে দাবি করাই তো আত্ম-অবমাননা।

পরবর্তীতে আমি কিছু পরিবর্তন লক্ষ্য করি। ক্লাস টেস্টের খাতাতেও এ পরিবর্তন দেখতে পাই। অনেক খাতাই ফাঁকা থাকে, যেখানে শূন্য দেওয়া ছাড়া কিছু করার থাকে না। কিন্তু এসব খাতা দেখেই আমি বেশি খুশি হই, কারণ না পারলেও সে চিটিং করেনি, সাদা খাতা জমা দিয়েছে। ক্লাস টেস্টে সে ভালো না করলেও জীবনের পরীক্ষায় ঠিকই ‘এ+’ পাবে। এটাই শিক্ষক হিসেবে আমার বড় প্রাপ্তি।

নীতি-নৈতিকতার শিক্ষা শিক্ষকরাই দেন, কিন্তু এই শিক্ষার সবচেয়ে বড় বিদ্যালয় কিন্তু নিজের পরিবার। আমি মনে করি, সন্তানরা সবচেয়ে ভালো শিক্ষা পায় বাবা-মায়ের কাছে। তাই দিনে একবার অন্তত খাবার সময় হলেও সন্তানদের সঙ্গে বসুন। তাদের পড়ালেখার খোঁজ নিন এবং তার সঙ্গে বিভিন্ন আলোচনা করুন। তাকে বোঝান—জীবন মানেই গ্রেড না। চিটিং করে করে প্রথম হওয়া গেলেও জীবনের পরীক্ষায় ফেইল কিন্তু অনিবার্য। তবেই দেখবেন সে ধীরে ধীরে নীতিবান হওয়ার দিকেই যাবে।

০০০

বিত্তবৈভবের প্রাচুর্য মানুষকে বিপথে পরিচালিত করে

—জেমস বকুল সরকার

সহকারী অধ্যাপক, স্কুল অব বিজনেস

ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি

 

বর্তমানে আমাদের সমাজের দিকে তাকালে নৈতিকতা বিবর্জিত বা নৈতিকভাবে ক্ষয়িষ্ণু সামাজিক ছবি প্রতিফলিত হয়। যেমন কিশোরী ঐশীর খুন করল তার বাবা-মাকে। সম্প্রতি বনানীতে ধর্ষণের ঘটনা ঘটল বিত্তবানের সন্তানের দ্বারা।

বিত্তবৈভরের প্রাচুর্য অনেক সময় মানুষকে বিপথে পরিচালিত করে। বিত্তবৈভবের পাহাড় যেমন একদিকে নৈতিক অবক্ষয়ের জন্ম দেয়, অন্যদিকে চরম দারিদ্র্যের নির্মম কষাঘাতে নৈতিক শিক্ষার মৃত্যু ঘটায়। আবার দারিদ্র্যের সঙ্গে নিরলস সংগ্রাম করে অনেকেই নৈতিকতা বজায় রেখে জীবনযুদ্ধে সফল হয়েছে এমন উদাহরণ সমাজ প্রচুর আছে। নৈতিকতার অবক্ষয় রোধে আমাদের কিছু করণীয় আছে। প্রথমত, পারিবারিক মূল্যবোধ ও শিক্ষা একজন মানুষের নৈতিক মানদণ্ড তৈরি করে দেয়, যা তার পরবর্তী জীবনেও ছাপ ফেলে। বাবা-মা সন্তানের সবচেয়ে বড় বন্ধু। মা-বাবা ও সন্তানের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠলে দেখা যাবে, সন্তান যদি ভুলও করে তা সে অপকটে বাবা-মায়ের কাছে স্বীকার করবে এবং এ নিয়ে খোলাখুলি আলাপ করবে; যা থেকে সে ভালো-খারাপের পার্থক্য বুঝতে পারবে। ছেলেমেয়েদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করা, পারিবারিক মূল্যবোধে উদ্বুদ্ধ করা, বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রচনা করা, প্রয়োজনে তাদেরকে শাসন করা এবং সঠিকভাবে লালন করা অভিভাবকের অবশ্য করণীয়। শৈশব থেকেই ছেলেমেয়েদের ভালো-মন্দের তফাত্ বুঝাতে হবে। মনে রাখতে হবে, অতিরিক্ত শাসন যেমন ভালো নয়, তেমনি অতিরিক্ত আদরেও হিতে বিপরীতে হতে পারে। অনেক সময় দেখা যায়, বাবা-মায়ের একজন শাসন করতে চাইলেও অন্যজনের অতিরিক্ত প্রশ্রয়ের কারণে সন্তান নৈতিকতা অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষাটা পায় না। আমাদের বর্তমান সামাজিক পটভূমিতে ছেলেমেয়ে কোথায় যায়, কী করে, কার সঙ্গে মেশে ইত্যাদি দেখভাল করা এখন খুব প্রয়োজন। পরিবারের মধ্যে মায়ের ভূমিকা, আমার কেন জানি মনে হয়, সন্তানের নৈতিক চরিত্র গঠনে সবচেয়ে বেশি।

দ্বিতীয়ত, একজন মানুষের জীবনে শিক্ষকের ভূমিকাও অপরিসীম। শিক্ষক যেভাবে একজন ছাত্রকে প্রভাবিত করতে পারে, অন্যরা পারে না। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি নৈতিক শিক্ষা ও ধর্মীয় শিক্ষার প্রয়োজন আছে। তৃতীয়ত, প্রযুক্তির অপব্যবহার ও আকাশ সংস্কৃতির আগ্রাসনও নৈতিক অবক্ষয়ের পিছনে অনেকাংশে দায়ী। বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপট বা সমাজব্যবস্থাও নৈতিক শিক্ষার দুর্গতির জন্য কমবেশি দায়ী। নৈরাশ্য, ব্রোকেন ফ্যামিলি, বেকারত্ব, ড্রাগ অ্যাডিকশন ইত্যাদি সমাজের দেহে অনৈতিকতার বীজ বপন করে। সুতরাং, আমাদেরকে সচেতন হতে হবে।

০০০

পারিবারিক মিথস্ক্রিয়াই পারে নৈতিক শিক্ষার শূন্যস্থান পূরণ করতে

 

—সাহস মোস্তাফিজ

প্রভাষক,  জার্নালিজম, কমিউনিকেশন অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগ, স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ

 

আমাদের চারজনের পরিবার। বাবা, মা, ছোট বোন আর আমি। বাবা আর আমি অফিসে, বোনটা সারাদিন থাকে কলেজে। সপ্তাহে কোনো একটা দিন আমি যদি দুপুরে বাসায় ফিরি, মা লাঞ্চের সময় ৩-৪টা আইটেম রান্না করেন। আর যেদিন আমরা কেউ দুপুরে বাসায় খাই না, সেদিন মা হয়তো রান্নাই করেন না। খেয়ে, না খেয়ে থাকেন। নিজের জন্য নয়, মায়ের সব সুখ যেন সন্তানের মুখের হাসিতেই লুকিয়ে থাকে। এটাই মায়ের ভালোবাসা।

বাবারা মাঝে মাঝে মিথ্যে বলেন। বাইরে এত গরম, এত অভাব, এত টানাপোড়েন; সব কিছু সন্তানের কাছ থেকে দূরে রেখে সুখে থাকার অভিনয় করেন।

তবু আমরা তাদের কষ্ট দিই। একটু কিছু চেয়ে না পেলেই তাদের কষ্ট দিই। আজকাল আবার আমাদের সময় কেড়ে নিয়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো। মায়ের পাশে বসে তাদের গল্প শোনার সময়টাও আমাদের হাতে থাকে না। চুলোর গরমে ঘেমে দুই ঘণ্টা ধরে রান্না করা মায়ের হাতের খাবার আমাদের ভালো লাগে না। আমরা মজে গেছি ফাস্ট ফুডে।

আজকাল যান্ত্রিক হয়ে গেছি আমরা, এই অভিযোগটা বড্ড বেশি শুনছি। তার একটা বড় কারণ বোধহয় পরিবারকে সময় না দেওয়া। শুধু সন্তানকেই একা দোষ দিলে ভুল হবে। বাবা-মায়েরাও এত বেশি কর্মব্যস্ত হয়ে পড়েছে যে, তাদের সন্তানেরা যথেষ্ট সময় পাচ্ছে না। ফলে এই সমাজ, এই প্রজন্ম হয়ে উঠছে অস্থির।

নৈতিক শিক্ষার শুরুটা হয় পরিবারেই। আজকাল সেই সুতোয় ঢিল পড়েছে। কেউ কারও জন্য সময় বের করতে পারছি না। বিয়ে, ঈদ বা পূজার মতো পারিবারিক উপলক্ষের আনন্দেও আজকাল ভাটা পড়তে দেখছি। ডিজিটালাইজেশনকে অনেকে এর জন্য দায়ী করেন। তবে এটা মেনে নিয়েই বড় রকমের একটা পরিবর্তন দরকার আমাদের সমাজে।

আমি আমার ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে অনেক সম্ভাবনা দেখতে পাই। এরা আমাদের চাইতে অনেক বেশি সুযোগ পাচ্ছে। অনেক বেশি জানছে। অভাব একটাই—পারিবারিক নৈতিক শিক্ষা। পারিবারিক মিথস্ক্রিয়াই পারে এই সামান্য শূন্যস্থানটা পূরণ করে দিতে। পারিবারিক সম্পর্কের প্রতি শ্রদ্ধাটা ভীষণ প্রয়োজন। তাই আপনার পরিবারে একে অপরকে জানুন, সময় দিন। জীবন পালটে যাবে।

 

 

 

 

 

 

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
২২ মে, ২০২০ ইং
ফজর৩:৪৮
যোহর১১:৫৫
আসর৪:৩৪
মাগরিব৬:৪০
এশা৮:০১
সূর্যোদয় - ৫:১২সূর্যাস্ত - ০৬:৩৫
পড়ুন