সংলাপ নিয়ে কথা
২৭ ফেব্রুয়ারী, ২০১৫ ইং
রাজনীতি g মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম

মাঝখানে অল্প কিছুদিন বিরতি বাদ দিলে গত কয়েক বছরে বাংলাদেশে বা বাংলা ভাষায় প্রধান উচ্চারিত বিষয় সংলাপ। শুনতে শুনতে, ব্যবহার করতে করতে, দিন গুনতে গুনতে এ বিষয়ে একটা মোটামুটি ধারণা লাভ করলেও সংলাপের অর্থ কি, উদ্দেশ্য কি, পরিণতি কি এই সকল বিষয়ে ধারণা কতোখানি সুস্পষ্ট তা বুকে হাত দিয়ে বলা যাবে না। এমনকি কেউ দাবি করতে পারে বলেও মনে হয় না। অল্পবিদ্যা ভয়ঙ্কর-প্রেক্ষাপটে কেউ দাবি করার দুঃসাহস প্রদর্শন করতে পারেন।

প্রসঙ্গত বলা যায় যে, প্রায় প্রতিটি শব্দেরই অন্ততপক্ষে দুটি অর্থ থাকতে পারে। এক শাব্দিক বা শারীরিক অর্থ আর অপরটি হলো প্রচলিত বা গৃহীত বা প্রসবিত অর্থ বা পারিভাষিক অর্থ। শাব্দিক অর্থ সন্ধানে শব্দটির শরীরে অস্ত্র চালনা করলে দুটি অর্থবহ জীবন্ত টুকরো পাওয়া যায়-প্রথমটি সঙ অপরটি লাপ। সঙ শব্দটি অকারণে সং এ রূপান্তরিত হয়েছে। বলা যায় সঙ যেমন বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন হাস্যকর রূপধারণে সক্ষম তেমনি শব্দটি রূপ বদল করে সং হয়েছে, আবার সঙ এর বহুবিচিত্র রূপ দেখে কোন লোক লাফ বা লম্ফ দিয়ে দৌড় দিয়েছিল বা কোন মুখ থেকে শব্দ বের হয়েছে কিনা তা বলা না গেলেও কালক্রমে উচ্চারণ হতে হতে লাফ শব্দটি ‘লাপ’-এ রূপান্তর হয়েছে এ রকম ধারণা অবাস্তব নয়। কারণ ভাষাকে স্রোতের সাথে তুলনা করা হয়েছে যেখানে পাড় ভাঙা, গতি পরিবর্তন ইচ্ছেমত বাঁক গ্রহণ অনিবার্য।

কিন্তু ইদানীং সংলাপ কথাটা শুনে কেউ লাফ দিবেন বলে মনে হয় না। বর্তমান সময়ে সংলাপ শব্দটা অশিক্ষিত লোকেরাও উচ্চারণ করেছেন এবং সংলাপের এতো বেশি উচ্চারণ হচ্ছে যে, এটা এখন আলাপের বদলে প্রলাপের পর্যায়ে উপনীত হয়েছে। অবশ্য সংলাপের টিভি সংস্করণকে গভীর রাতের প্রলাপ বলে নামাঙ্কিত করলে একেবারে ভুল হয় না। গরজ বা প্রয়োজন নাকি বুদ্ধিমানকেও আহম্মকে পরিণত করে। সংলাপের ক্ষেত্রেও দেখছি তাই। অনেকেই বলছেন দু’জনের মধ্যে সংলাপের ব্যবস্থা করা গেলে সমঝোতা একটা হতোই। এরা অনেকেই আহাম্মকই তাহলে। এদের জ্ঞানের ঝুলিতে বিরাটাকার অশ্বডিম্ব থাকতে পারে। এদের জ্ঞানে গভীরতা নেই, কানের যন্ত্রপাতি সবটা কাজ করছে না। দু’জন ভদ্রমহিলা আলাপ করতে করতে এক সময় ঝগড়া শুরু করে সমঝোতার পরিবর্তে জুতা হাতে নিতে দেরি করা অকল্পনীয়, শেষ পর্যন্ত কোলাকুলির পরিবর্তে চুলোচুলিতে সমাপ্তির সম্ভাবনা শত ভাগ। এমতাবস্থায় সংলাপের বিষয়ে যারা অতিমাত্রায় আশাবাদী তাদের বাস্তবতার শক্ত জমিনে অবস্থানের পরামর্শ দিচ্ছি কল্পলোকের ‘নীল’ আকাশে ভ্রমণের পরিবর্তে।

যারা দীর্ঘদিন ধরে মানুষকে মুখ দেখায় সেজেগুজে, একে অন্যের সুখ ও মুখ সহ্য করতে চায় না। গোপনে এরা নিজ কক্ষে টেলিভিশনে দেখলেও কেউ যেন না জানে এমন ভাব বজায় রাখেন। তাদের মধ্যে সামান্য আলাপের সম্ভাবনা দেখা দিলেও সংলাপের মত আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বময় বিষয়ে ঐকমত্য হবে তা কেমন করে আন্দাজ করা যায়। এর আসল কারণ সম্ভবত এই যে, যারা রাজনীতি করেন রাজনীতি বিশ্লেষণ করেন, পাঠদান করেন, তাদের বুঝি আশা-আকাঙ্ক্ষার শেষ নেই।

এই সীমাহীন আশা-আকাঙ্ক্ষা কিন্তু আকাশ-কুসুম কল্পনা নয়। রাজনীতির মাধ্যমে সাধারণ ছাত্রনেতা অকালে কোটিপতি হওয়ার প্রকল্প বাস্তবায়নে সাফল্য লাভ করতে দেখা যায়। কাজেই তারা সংলাপের বিষয়ে আশাবাদী হতেই পারেন। অবশ্য পত্র-পত্রিকায় প্রত্যহ আমরা সংলাপ দেখছি। সব পক্ষই আলাপ করছেন, সংলাপ ছুঁড়ে মারছেন, রামায়ণ মহাভারতের কাহিনীর ছবিতে যেমন দেখা যায়, একপক্ষের মারণাস্ত্র অপর পক্ষকে ঘায়েল করছে, আবার কখনো কখনো মহাশূন্যেই প্রতিরোধ করছে। কিন্তু এভাবে কাজ হচ্ছে না। এক পক্ষ সংলাপে বসার জন্য অনুরোধ-উপদেশ-আদেশ-হুমকি-ধামকি দিচ্ছে। অপর পক্ষ সংলাপের বিপক্ষে যুক্তিবাণ নিক্ষেপ করছেন। এসব বায়বীয় অস্ত্রে কাজ না হওয়ায় বাস্তবতার আশ্রয় নিচ্ছেন। ইতিপূর্বে আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারী কয়েকবার ব্যর্থ হওয়ায় এখন বোধকরি কাউকে পাওয়াও যাচ্ছে না, যারা বাংলাদেশের রাজনীতির উপর প্রত্যহ সুনজর রাখছেন তারাও সাহস করছেন না। সাফল্য লাভের সম্ভাবনা শূন্য বিবেচনা করে তাই এখন দেশীয়ভাবে প্রস্তুত পেট্রোল বোমা জাতীয় বস্তু আবিষ্কার করে সফল পরীক্ষা চালানো হচ্ছে। সব ক্ষেত্রে স্বনির্ভর হওয়া যেরূপ জাতীয় কর্তব্য সেভাবেই এগুবেন। প্রযুক্তি ব্যবহারের দিক থেকে আমরা যে পিছিয়ে পড়তে নারাজ তারই প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। আশার কথা এক্ষেত্রে এ পর্যন্ত ভেজালের কোন অভিযোগ পাওয়া যায়নি।

গত একমাসে প্রচুর পেট্রোল বোমা সফলভাবে ব্যবহূত হয়েছে, প্রচুর পরিমাণে ধরা পড়েছে। ইতিমধ্যে প্রায় একশ আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা শিশু দগ্ধ হয়েছে, শতাধিক বিভিন্ন হাসপাতালে ছটফট করছে, সরকারি হাসপাতাল প্রয়োজনীয় চিকিত্সা দিতে হিমশিম খাচ্ছে দেখে বেসরকারি হাসপাতালে বার্ন ইউনিট খুলছে। ০৪/০১/২০১৫ হতে ১১/০২/১৫ পর্যন্ত ৩৯ দিনের সহিংসতায় ও ৩৭ দিনের অবরোধে মৃত্যু ৯০ জন, (৫০ জন পেট্রোল বোমায়) আহত ১০০০ এর বেশি দগ্ধ বা ভাংচুর হয়েছে ১০৩৫ যানবাহন—এমতাবস্থায় বলা যায় সংলাপের পরিবর্তে আমরা যা দেখতে শুনতে পারছি তাকে বলা যায় বিলাপ। এ বিলাপ কারো সারা জীবনেও থামবে না।

 এ ক্ষেত্রে আউটসোর্সিং পদ্ধতিতে উন্মুক্ত টেন্ডার বা দরপত্র আহ্বানের মাধ্যমে প্রতিযোগিতামূলক দরে আরবিট্রেটর বা মধ্যস্থতাকারী নিয়োগের কথা কারো মাথায় আসেনি। কারণ মাথা বাঁচিয়ে দ্রুত বাসায় ফিরতে সবাই ব্যস্ত।

n লেখক :প্রবন্ধকার

 

 

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
২৭ ফেব্রুয়ারী, ২০২০ ইং
ফজর৫:০৭
যোহর১২:১২
আসর৪:২৩
মাগরিব৬:০৪
এশা৭:১৬
সূর্যোদয় - ৬:২২সূর্যাস্ত - ০৫:৫৯
পড়ুন