সিগারেট
 বিশ্বজিত্ দাস ৩১ মে, ২০১৫ ইং
সিগারেট
এক.

অর্করা সবে দশম শ্রেণিতে উঠেছে। সেদিন টিফিন পিরিয়ডে স্কুলের মাঠে বসে গল্প করছিল ওরা ছয়জন—রাশেদ, দেবব্রত, জিয়া, বাবলু, মলয় আর অর্ক।

‘আমরা তাহলে সত্যি সত্যি বড় হয়ে গেলাম!’ দেব বলল।

‘বড় এখনো হতে পারিসনি। সিগারেট খেতে জানিস? খেয়েছিস কখনো?’ বাবলু জানতে চাইল।

সবাই মাথা নাড়ল।

‘তাহলে কচু তোরা বড় হয়েছিস। এই দেখ কীভাবে খেতে হয়।’

প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট আর ম্যাচ বের করল ও। অনেক কসরত করে ধীরে ধীরে সিগারেট ধরিয়ে টান দিল আর আকাশের দিকে ধোঁয়া ছাড়ল। বাকি সবাই হা করে তাকিয়ে থাকল।

‘নে একটান দিয়ে দ্যাখ,’ বলে সিগারেটটা এগিয়ে দিল বাবলু।

সবাই দু’এক টান দিয়ে খকখক করে কাশতে লাগল।

বাবলু হেসে বলল, ‘অভ্যাস নেই তো তাই অমন হচ্ছে। আমি তো এখন বাড়িতেও প্রতিদিন একটা করে সিগারেট খাই।’

সবাই চোখ বড় বড় করে তাকাল।

‘আমি সকালে পেট পরিষ্কার করার সময় সিগারেট আর ম্যাচ বাক্স নিয়ে পায়খানায় ঢুকি। আরাম করে সিগারেট ধরিয়ে ধোঁয়াগুলো সব পাঠিয়ে দিই নিচের দিকে।’

‘নিচের দিকে? কেন?’

‘মশা তাড়ানোর জন্য।’

‘মশা!’ সবাই আরও অবাক হলো।

‘আর বলিস না, আমাদের পায়খানার ভেতরে খুব মশা। সকালবেলা শুধু পিছনে মশা কামড়ায়। তাই বুদ্ধি বের করেছি। সিগারেটের ধোঁয়া দিয়ে মশা তাড়াই। মশাও দূর হলো, সিগারেটও খাওয়া হলো।’

দুই.

সেদিনই বিকেলে দুরু দুরু বুকে দেবব্রত পানবিড়ির দোকান থেকে একটা সিগারেট কিনল। সাথে অর্ক। দোকানদার আড়চোখে একবার ওদেরকে দেখল।

‘কার জন্য নিচ্ছেন? কে খাবে?’

‘আমরা দু’জন মিলে খাব। আমরা কি বড় হইনি?’ পাল্টা উত্তর দিল অর্ক।

‘বড় হইছেন তবে গোঁফটাই এখনো গজায় নাই,’ বলল দোকানদার গম্ভীর মুখে।

‘আপনি ভেবেছেন আমরা সিগারেট কখনো খাইনি। প্রথম খাচ্ছি। এই দেখেন আমরা সিগারেট খেয়ে দেখিয়ে দিচ্ছি।’

সিগারেট মুখে নিয়ে অর্ক রজনীকান্তের স্টাইলে সেটাকে ধরাল। আয়েশ করে টান দিল। অমনি তার চোখ বিস্ফোরিত হয়ে গেল। অনেক কষ্টে ধোঁয়ার ঢোক গিলল। সাথে সাথে কাশতে শুরু করল অর্ক।

‘দে বেটা, খেতে পারিস না তো টানিস কেন?’ ওর হাত থেকে সিগারেটটা কেড়ে নিল দেব। জোরে জোরে দু’টান দিয়ে নাক দিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে দেব বলল, ‘দেখলি, কেমন করে টানতে হয়।’

অর্কর কাশি থামেনি। কাশতে কাশতে হাত ইশারা করে দূরে কী যেন দেখাল ও।

দেব তাকাল। তারপর ভূত দেখার মতো চমকে উঠল। বেশ একটু দূরে ওদের দিকে কটমট করে তাকিয়ে আছেন স্বয়ং বাঘ—বাবু স্যার! ওদের স্কুলের বাংলা টিচার!!

 

তিন.

বাবলুর বুদ্ধিমতো অর্কও পরদিন সকালে সিগারেট আর ম্যাচ নিয়ে টয়লেটে ঢুকল। সিগারেট ধরিয়ে মাত্র টান দিয়েছে অমনি কাশির দমক শুরু হলো। মা রান্না ঘর থেকে চেঁচিয়ে জানতে চাইলেন, ‘কী রে, আজ এত কাশছিস কেন?’

বিরক্ত হয়ে জ্বলন্ত সিগারেটটা বাইরে ফেলে দিল অর্ক। কিছুক্ষণ পরেই ‘আগুন আগুন’ বলে চিত্কার শুরু করলেন ওর মা। সিগারেটের টুকরা গিয়ে পড়েছে শুকনো পাতার ঝোঁপের উপর। অমনি আগুনের লেলিহান শিখা ছড়িয়ে পড়েছে। পায়খানা করবে কী, পড়িমড়ি করে টয়লেট থেকে বের হলো অর্ক। সবার মিলিত চেষ্টায় আগুন নেভান হলো।

‘কিন্তু আগুন লাগল কীভাবে?’ চিন্তিত স্বরে বললেন অর্কের বাবা।

‘বোধহয় সিগারেটের টুকরা থেকে,’ গোবেচারা ভঙ্গিতে বলল অর্ক।

অর্কর মা ঝট করে ওর বড় বোন নীলিমার দিকে তাকালেন।

‘বা-রে আমি কী করে জানব? তাছাড়া আমার কোনো ছেলে বন্ধু সিগারেট খায় না। বাড়ির পিছন দিয়ে এসে দেখাও করে না,’ হড়বড় করে বলল নীলিমা।

 

চার.

‘স্যার ওখানে আমি ছিলাম না,’ হড়বড় করে বলল অর্ক।

বাবু স্যারের কাছে প্রাইভেট পড়তে এসেছে ও। দেব ভয়ে আসেনি।

‘তবে কি ওখানে তোর বাবা ছিল,’ ধমক দিয়ে জানতে চাইলেন তিনি। ‘বল কী টেনেছিলি? বিড়ি না সিগারেট?’

‘বিড়ি স্যার।’

‘তাই তো করবি। নজর ছোট যে!’

‘মানে?’

‘টানবিই যদি বিদেশি সিগারেট টানবি, বুঝলি। নিজের একটা স্ট্যাটাস আছে না।’

‘স্যার, বিদেশি সিগারেট তো আমাদের ওখানে পাওয়া যায় না।’

‘না পেলে খাবি না। কিন্তু নিজের গুরুত্ব কমাবি না, বুঝলি।’

‘তাহলে কি বিদেশি সিগারেট না পেলে দেশি সিগারেট টানব স্যার,’ সাহস করে জানতে চাইল অর্ক।

‘তা কেন করবি। বিদেশি সিগারেট না পেলে ডাইল খাবি, হেরোইন খাবি,’ হেসে বললেন স্যার।

‘ক... ক... কী বললেন স্যার! ফেন্সিডিল খাব?’

‘খাবি।’

‘এসব আপনি কী বলছেন স্যার!’

‘আমি যা বলছি তা পরিষ্কার। মরার যতি অতই শখ থাকে তবে যা এক পুরিয়া বিষ খেয়ে বিছানায় শুয়ে থাক।’

‘মানে?’

‘মানে ফের যদি ওসবের ধারের কাছে দেখেছি তো পা ভেঙে হাতে ধরিয়ে দেব বুঝেছিস।’

বুঝবে কী, তার আগেই বাবু স্যারের হাত গালে উঠে এল। চটাস্ করে থাপ্পড় খেয়ে চোখে অন্য কিছু দেখতে শুরু করল।

চারদিকে শুধু ধোঁয়া আর ধোঁয়া!

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
৩১ মে, ২০২০ ইং
ফজর৩:৪৪
যোহর১১:৫৬
আসর৪:৩৬
মাগরিব৬:৪৪
এশা৮:০৭
সূর্যোদয় - ৫:১১সূর্যাস্ত - ০৬:৩৯
পড়ুন