কোটাময় জীবন
১১ মার্চ, ২০১৮ ইং
কোটাময় জীবন
তারেকুর রহমান

 

কুয়াশামাখা এক ভোরে বদরুলের জন্ম। ফুটফুটে বদরুলকে দেখে বাবা হেকমতের আনন্দের সীমা রইল না। কয়েকদিন যেতেই বদরুলের ঠাণ্ডা লাগে। হুক্কুর হুক্কুর কাশি দিতে দিতে ছোট্ট বদরুলের প্রাণ যায় অবস্থা। হেকমত সাহেব বদরুলকে হসপিটাল ভর্তি করালো। বদরুল হেকমত সাহেবের একমাত্র ছেলে, তাকে তো আর সাধারণ জায়গায় রাখা যাবে না। তাই কেবিন নিতে চাইল। কিন্তু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কেবিন দিতে চাইল না। হেকমত সাহেব বেশ রাগ হয়ে বললেন, ‘টেকা দিমু তারপর ও কেবিন ভাড়া দিবা না কেন?’

‘এই মিয়া এত কথা কও কেন? তোমার কোটা আছে?’

‘কিসের কোট্টার কথা কও? এই দেহ জর্দার কোট্টা আছে।’

‘আরে এই কোটা সেই কোটা না। কেবিন হইল ভিআইপিদের জন্য। তোমাগো মতো সাধারণের জন্য সাধারণ কেবিন। তবে কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তি কিংবা মামু-খালু থাকলে একটা ব্যবস্থা করতাম। ওদের জন্য বিশেষ কোটা আছে।’

 

বদরুল আস্তে আস্তে বড় হতে লাগল। বদরুল স্কুলে ভর্তি হওয়ার জন্য ভর্তি পরীক্ষা দেয়। সে মেধাবী ছাত্র তাই ভর্তি পরীক্ষায় সেরা দশের একজন হলো। ভর্তির আগে হেডমাস্টার জানাল—কোটা না থাকায় বদরুল ভর্তি হতে পারবে না।

‘কীসের এত কোটা যে বদরুল মেধা তালিকায় থেকেও ভর্তি হতে পারল না। অথচ একানব্বইতম আবুল ঠিকই ভর্তি হতে পারল?’

হেডমাস্টার দাঁত কেলিয়ে বলল, ‘শোনো হেকমত মিয়া, এইখানে নানারকম কোটা আছে। এই ধরো কর্মচারী কোটা, বড় বড় স্যারদের কোটা আরো নানারকম কোটা আছে। ওদের পোলাপানকে ভর্তি করাতেই আমরা হিমশিম খাচ্ছি। তোমাদের পোলাপানের ভর্তির কথা তো ভাবতেই পারছি না।’

‘আচ্ছা বুঝলাম, কিন্তু আবুল একানব্বইতম হয়েও কীভাবে ভর্তি হলো?’

‘আরে... ও আমাদের পিয়ন মফিজের পোলা। সে কর্মচারীর সন্তান কোটায় ভর্তি হলো।’

 

বদরুল স্কুল শেষ করে কলেজে উঠল। একদিন লোকাল বাসে করে যাচ্ছে। সিট খালি দেখেই বদরুল বসে পড়ল। গাড়ির হেল্পার এসে বলল, ‘ওই মিয়া এইখানে বইছ কেন? দেহনা এহানে লেহা আছে এইডা মেয়েদের জন্য বরাদ্দ।’

‘বরাদ্দ হইলে কী হইছে! এখন তো মেয়েরা কেউ নাই। ওরা আসলে তখন উঠে যাব।’

‘বেশি কতা কওন লাগব না। পরে ধাক্কা দিয়ে বাইর কইরা দিমু।’

বদরুল লজ্জায় সিট থেকে উঠে দাঁড়াল। কিছুক্ষণ পর একজোড়া প্রেমিক-প্রেমিকা এসে সিটে বসল। বদরুল ছেলেটাকে উঠে যেতে বলল। আর মনে করিয়ে দিল এটা মেয়েদের জন্য বরাদ্দকৃত সিট।

ছেলেটা চোখ লাল করে বলল, ‘আমার কোটা আছে তাই বসছি, তুমি বলার কে?’

‘কী কোটা আপনার, শুনি একটু?’

‘প্রেমিক কোটা। হুম, আমি ওর প্রেমিক, সেই কোটায় ওর পাশের সিটে বসেছি।’

 

ক্লাসমেট লিপির সঙ্গে এরমধ্যে মন দেওয়া-নেওয়া হয়ে গেছে বদরুলের। একজন আরেকজনের হূদয়ের হার্টবিট। হঠাত্ করে বদরুলের সঙ্গে লিপির সম্পর্ক অবনতির দিকে যেতে লাগল। বদরুলের অবস্থা খুব খারাপ হলেও লিপি বেশ ফুরফুরে মেজাজে আছে। অবশ্য লিপি একই ক্লাসের সবচেয়ে অঘা ছাত্র হাবলুর প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে। বদরুল এটা কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না। সে লিপিকে জিজ্ঞাসা করল, ‘আচ্ছা তুমি আমাকে ছেড়ে হাবলুরে ধরলা কেন?’

‘ওর কোটা আছে তাই ধরেছি।’

‘কী এমন কোটা আছে তা জানতে চাই। তাছাড়া ও তো ভালো ছাত্র না।’

‘ছাত্র যেমনি হোক সে বড়লোকের ছেলে। যার টাকা আছে এই লিপি বেগম তার লগেই প্রেম করবে।’

‘কোটাটা তো বললে না?’

‘ওই যে বললাম, ধনী কোটা।’

 

বদরুল অনার্স মাস্টার্স শেষ করল। দিনরাত শুধু পড়াশোনা করেই যাচ্ছে। কিন্তু ভাইভা দিলেও কোথাও জব হচ্ছে না। ভালো ভাইভা দেওয়ার পরও জব হচ্ছে না। এখানেও নাকি কোটা না থাকায় তার জব হচ্ছে না।

বদরুল একটা বিশাল বট গাছের নিচে দাঁড়িয়ে আছে। হঠাত্ করে টপ করে কি যেন মাথার উপর পড়ল। মাথায় হাত দিয়ে দেখে পাখি তার মাথার উপর প্রাকৃতিক কর্ম সম্পাদন করে দিয়েছে। উপরের দিকে তাকিয়ে দেখে একটা ময়না পাখি বসে আছে। সে বলছে, ‘কোটা, কোটা, কোটা।’

বদরুল বুঝছে না এখানে কোটা বলতে কী বুঝাচ্ছে। পাশ দিয়ে এক মাঝবয়সী লোক যাচ্ছিল। সে বলল, ‘এ বট গাছের নিচে কিছু নির্দিষ্ট ব্যক্তি ছাড়া অন্য কেউ দাঁড়ালে পাখি তার মাথার উপর হাগু করে দেয়।’

বদরুল এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে চলে এলো। আর ভাবল—তার সারাজীবন কি এই কোটার গ্যাঁড়াকলেই যাবে?

 

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
১১ মার্চ, ২০১৮ ইং
ফজর৪:৫৬
যোহর১২:০৯
আসর৪:২৭
মাগরিব৬:০৯
এশা৭:২১
সূর্যোদয় - ৬:১১সূর্যাস্ত - ০৬:০৪
পড়ুন