কাছ থেকে দেখা গল্পে ...
২৭ ফেব্রুয়ারী, ২০১৫ ইং
কাছ থেকে দেখা গল্পে ...
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আর ওপার বাংলার নেত্রী মমতা ব্যানার্জী। গত ২০ ফেব্রুয়ারি এপার-ওপার দুই বাংলার দুই নেত্রী এবং দুই বাংলার সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের নিয়ে রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত হয় অনুষ্ঠান ‘বৈঠকি বাংলা’। এই অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন গণসঙ্গীত শিল্পী ফকির আলমগীর, চিত্রনায়ক ফেরদৌস, সঙ্গীতশিল্পী সামিনা চৌধুরী, রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী এবং সঙ্গীত শিক্ষক সাদী মুহম্মদসহ একাধিক শিল্পীবৃন্দ।  

 

যখন সেখানে পৌঁছাই তখন অনুষ্ঠান প্রায় শেষ

সামিনা চৌধুরী

 

‘বৈঠকি বাংলা’ অনুষ্ঠানের আমন্ত্রণ অনেক আগে পেলেও অনুষ্ঠানে পৌঁছাতে আমার বেশ দেরি হয়ে যায়। সেদিন শুক্রবার ছিল। এখন তো কেবল শুক্রবার আর শনিবারেই হরতাল থাকে না। এই দুই দিন স্কুল-কলেজ খোলা থাকায় ট্র্যাফিক জ্যামটাও কিন্তু অনেক থাকে। প্রচণ্ড ট্র্যাফিক জ্যাম পার করে আমি যখন সেখানে পৌঁছাই তখন অনুষ্ঠান প্রায় শেষ। মমতা ব্যানার্জী তার বক্তব্য শেষ করলেন। আমি সেখানে গিয়ে জাতীয় সঙ্গীতে অংশগ্রহণ করি।

আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে আমার আগে সাক্ষাত্ হলেও মমতা ব্যানার্জীর সাথে আমার এবারই প্রথম সাক্ষাত্। আমার সাথে ওনার খুব বেশি কথা হয়নি। শুধুমাত্র সৌজন্য মূলক কথাবার্তাই হয়েছে। তাকে যতটুকু দেখেছি মনে হয়েছে তিনি খুব দ্রুত কাজ করেন। তার হাঁটা-চলা দেখেও আমার মনে হয়েছে একজন যোগ্য নেত্রী তিনি। দেশপ্রেমই তার কাছে মূখ্য বিষয়। আসলেও তাই হওয়া উচিত। নিজ দেশের স্বার্থ সবার আগে দেখতে হবে।

কেন জানি সবার সাথে আমার যোগাযোগটা খুব কম হয়।

দুই বাংলার দুই নেত্রী বলেন, সুরকার, গীতিকার বা অন্যান্য শিল্পী কারো সাথেই আমার খুব বেশি যোগাযোগ নেই।

এরপর ছিল মধ্যাহ্নভোজনের আয়োজন। দুই বাংলার দুই নেত্রীর সাথে আমরা দুই বাংলার শিল্পীরা অংশগ্রহণ করি। ওপার বাংলার প্রসেনজিত্, দেব, ইন্দ্রনীল, নচিকেতা, গৌতম ঘোষ, কল্যাণ কাজী, মুনমুন সেনসহ আরও অনেকে উপস্থিত ছিলেন। আমাদের দেশের পক্ষ থেকে আমি ছাড়াও ছিলেন সাবিনা ইয়াসমীন, রুনা লায়লা, ফকির আলমগীর, ফরিদা পারভীন, শিবলী মুহম্মদ, শামীম আরা নীপা, ফেরদৌসি মজুমদার, রামেন্দু মজুমদার, সাদী মুহাম্মদ, কুমার বিশ্বজিত্, রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা, সারা যাকের, আলী যাকের, চন্দনা মজুমদার, আসাদুজ্জামান নূরসহ আরও অনেকে। আসলে অনুষ্ঠানটা ছিল আমাদের দুই বাংলার মানুষদের মিলন মেলা।

 

‘আমি সাথে সাথেই এর প্রতিবাদ করতে চাইলাম’

সাদী মুহাম্মদ

 

‘বৈঠকি বাংলা’ অনুষ্ঠানটির পরিকল্পনা খুব ভালো ছিল। আমাদের অনেক কথা ছিল কিন্তু সময় স্বল্পতার জন্য কথা আর শেষ করা যায়নি। তারপরেও যতটুকু আলোচনা হয়েছে ভালো লাগবে তা যদি পরিপূর্ণতা পায়।

অনুষ্ঠানে ইন্দ্রনীল আমাদের জাতীয় সঙ্গীত শুরু করে ‘ও মোর ফাগুনে তোর আমের বনের ঘ্রাণে’ লাইনটি থেকে। আমি সাথে সাথেই এর প্রতিবাদ করতে চাইলাম। বাচ্চু ভাই আমাকে উত্সাহ দিলেন। বললেন তুমি প্রতিবাদ করো। আমি তোমার সাথে আছি। আমি এগিয়ে গিয়ে ইন্দ্রনীলের মাইক্রোফোন কেড়ে নিই।

চিত্কার করে বলি, বন্ধ করো, এটা আমাদের জাতীয় সঙ্গীত না! কিন্তু আমার কথা কেউ শুনলোই না। এভাবেই জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া হলো। আমি গাইলাম না। চুপ করে দাঁড়িয়ে ছিলাম। গানটি শেষে ভারতের জাতীয় সঙ্গীত ‘জন গণ মন’ গাওয়া হলো। আমরা একসাথে ভারতের জাতীয় সঙ্গীত গাইলাম। ভারতের জাতীয় সঙ্গীত শেষে আমি বললাম যে আমাদের জাতীয় সঙ্গীত সঠিকভাবে গাওয়া হয়নি। ইন্দ্রনীল ক্ষমা চাইলো। কিন্তু আমি বললাম, ক্ষমা চাইতে হবে না আমরা আমাদের জাতীয় সঙ্গীত আবার গাইবো। এরপর আমরা দুই বাংলার সবাই মিলে বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত গাইলাম।

আমরা আমাদের যার যার দাবি জানালাম। মমতা ব্যানার্জী আমাদের কথা নোট করলেন। বাংলাদেশ থেকে আমরা যে শিল্পীরা ভারতে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যাই তাদের জন্য কলকাতায় ‘বাংলাদেশ ভবন’ নির্মাণের দাবি জানালাম। বাংলাদেশের শিল্পীরা যেন সেখানে বিভিন্ন সফরকালে অবস্থান করতে পারেন। মমতা ব্যানার্জী আমাদের আশ্বাস দিলেন।

মমতা ব্যানার্জীকে আমার মনে হয়েছে তিনি খুব দ্রুত এবং ঝড়ের বেগে কাজ করেন। তবে তার মধ্যে কোনোরকমের অহঙ্কার ছিল না। তিনি খুবই আন্তরিক একজন মানুষ।

অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী ভারতীয় শিল্পীদের অনেকেই আমার পূর্ব পরিচিত। প্রসেনজিতের সাথে কথা হলো। মুনমুন সেন হুইল চেয়ারে এসেছিল। অনেকদিন ধরে ওর হাঁটুতে ব্যথা। আমি ওকে মনে করিয়ে দিই যে সুচিত্রা সেন একবার রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনতে চাইলে আমি আমার কিছু গানের সিডি পাঠিয়েছিলাম। এবং সিডির সাথে আমার অনেক কথা লিখে পাঠাই। মুনমুনের এখনো সেসব কথা মনে আছে। দেব আমার ভাগ্নে শাওনের বন্ধু। তার সাথেও অনেক কথা হয়েছে। আমরা দু’জনে অনেক মজা করি। একটা গোপনীয় বিষয় নিয়েও আমরা বেশ মজা করি। তবে এই গোপনীয় বিষয়টা নিয়ে আমি কিছুই বলবো না। দেবকে কথা দিয়েছি বলে কথা!

 

খুব সাদাসিদে মানুষ

ফকির আলমগীর

 

ভারতীয় হাইকমিশন থেকে আমি যখন ‘বৈঠকি বাংলা’র আমন্ত্রণ পাই তখন থেকেই আমি খুব উচ্ছ্বসিত ছিলাম। অনুষ্ঠানে আমাদের দুই বাংলার দুই নেত্রীকে খুব কাছ থেকে দেখার সৌভাগ্য হয় আমার। মমতা ব্যানার্জী খুব সাদাসিদে মানুষ। তিনি এত বড় একজন নেত্রী কিন্তু তারপরেও তার মধ্যে এতটুকু অহঙ্কার নেই। তিনি আমার গানের বড় ভক্ত। তিনি নিজে থেকেই আমাকে সে কথা জানান। অনুষ্ঠানে আমাদের দুই বাংলার শিল্প-সাহিত্যের সাথে জড়িত ব্যক্তিরা অংশগ্রহণ করেন। বাংলাদেশ থেকে আমি ছাড়াও ছিলেন রুনা লায়লা, সাবিনা ইয়াসমীন, ফরিদা পারভীন, সামিনা চৌধুরী, ফেরদৌস, আসাদুজ্জামান নূর, কুমার বিশ্বজিত্, মৌসুমী, রামেন্দু মজুমদার, সাদী মুহাম্মদ, রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যাসহ আরও অনেকে। অনুষ্ঠানে ওপার বাংলার শিল্পীরাও উপস্থিত ছিলেন। উপস্থিত ছিলেন ইন্দ্রনীল, নচিকেতা, প্রসেনজিত্, দেব, মুনমুন সেনসহ আরও অনেকে।

মুনমুন সেনের সাথে আমার পরিচয় অনেক আগের। কিন্তু অনেকদিন ধরে কোনো যোগাযোগ নেই।

আমাকে তিনি বললেন, তার দুই মেয়ে রিয়া ও রাইমা ছোটবেলায় আমার সাথে যে ছবি তুলেছি তা যেন ওনাকে দেই। প্রসেনজিত্ আমার গান খুব পছন্দ করে। ওর সাথেও অনেক কথা হয়েছে। আমি ওকে মজা করে বললাম, তুমি তো লালন ফকির আর আমি ফকির আলমগীর। আমার কথা শুনে ও খুব মজা পায়।

মমতা ব্যানার্জীকে দেখে আমার মনে হয়েছে দেশ, মাটি এবং মানুষই তার রাজনৈতিক দর্শন। আর এই দর্শনেই তিনি মানুষের সেবা করে যেতে চান। সত্যি কথা বলতে তাকে আমার গণ মানুষের জন্য একজন ব্যক্তিত্ব বলে মনে হয়েছে। মমতা ব্যানার্জীর বক্তব্যতেও কিন্তু সে কথাই উঠে এসেছে। তিনি বলেন, ভালোবাসা কখনো কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে আটকে রাখা যায় না। মমতা ব্যানার্জী কিন্তু খুব ভালো আবৃতিও করেন। অনুষ্ঠানে আমি দুই বাংলার কীর্তিমানদের নিয়ে গান গাই। এছাড়া লোকসুরের গান করি। অন্যান্য শিল্পীরাও গান করেন। মমতা ব্যানার্জীই বলে দিচ্ছিলেন কার পরে কে গান গাইবেন। আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও আমার গান খুব ভালোবাসেন। আমাকে উনি ছোট ভাইয়ের মতো দেখেন। আর ওনার সাথে আমার পরিচয়টাও কিন্তু অনেক দিনের। এরই ধারাবাহিকতায় গত দুই ঈদে আমি ওনাকে সালাম জানাতে গেছি।

দুপুরে ছিল মধ্যাহ্নভোজনের আয়োজন। দুই বাংলার দুই নেত্রীর সাথে আমরা যারা দুই বাংলার সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আছি তারা অংশগ্রহণ করি। অনুষ্ঠানে ইন্দ্রনীল আমাদের জাতীয় সঙ্গীত গাইলেন মাঝখান থেকে। আমি এবং সাদী মুহাম্মদ সাথে সাথে প্রতিবাদ করলে মমতা ব্যানার্জী সবাইকে ভুল না বুঝতে অনুরোধ করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত পশ্চিমবঙ্গেও খুব প্রিয়। এরপর আমরা সবাই একত্রে গাই ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’।

 

ফেরদৌস

অন্তত ১৫ দিন আগে ‘বৈঠকি বাংলা’ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের জন্য আমন্ত্রণ পত্র পাই। দুই বাংলার দুই নেত্রীর সাথে আগেও আমার একাধিকবার সাক্ষাত্ হয়েছে। এমনকি ওপার বাংলাতেও মমতা ব্যানার্জীর সাথে আমার সাক্ষাত্ হয়েছে। এবার দুই বাংলার দুই নেত্রীতে একসাথে দেখার সুযোগ হলো। সব মিলিয়ে বলবো খুব গোছানো একটা অনুষ্ঠান ছিল ‘বৈঠকি বাংলা’। মমতা ব্যানার্জী কিন্তু খুবই আন্তরিক একজন মানুষ। গণ মানুষের নেত্রী তিনি। খুব সাদাসিদে এই মানুষটি কিন্তু অত্যন্ত সংস্কৃতিমনা একজন ব্যক্তিত্ব। অনুষ্ঠানে তিনি আবৃত্তিও করেন। দুই বাংলার শিল্পীদেরই তিনি গান গাওয়ার অনুরোধ করছিলেন। তার এবারের সফরে ওপার বাংলার সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বরাও অংশগ্রহণ করেন। তাদের এবারের সফরের একটা উদ্দেশ্য ছিল কিন্তু শহীদ দিবসে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো।

দুই বাংলার চলচ্চিত্রসহ সংস্কৃতি নিয়ে মমতা ব্যানার্জী কথা বলেন। আমরাও আমাদের দাবি জানাই। দুই বাংলার চলচ্চিত্র আদান-প্রদান নিয়ে আমরা আমাদের বক্তব্য উপস্থাপন করি। মমতা ব্যানার্জী আমাদের আশ্বাস দেন যে দুই বাংলার ছবি বিনিময়ের জন্য একটি বোর্ড গঠন করা হবে। এবং সব কিছুই একটা যথাযথ প্রক্রিয়ার আওতায় নিয়ে আসা হবে। মধ্যাহ্নভোজনের সময় সবার কাছে গিয়ে তিনি কথা বলে তারপর তার জন্য নির্ধারিত চেয়ারে বসেন।

এবার মমতা ব্যানার্জীর সফর সঙ্গী ছিলেন প্রসেনজিত্, দেব, মুনমুন সেন, নচিকেতা, ইন্দ্রনীলসহ আরও অনেকে। ওদের সাথে আমার পরিচয়টা কিন্তু অনেকদিনের। নিয়মিতই ওদের সাথে আমার যোগাযোগ হয়। আমাদের চলচ্চিত্র সম্পর্কে ওরা খোঁঁজ খবর রাখেন। এবার সফরের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আমি ওদের সাথে ছিলাম। প্রসেনজিত্, দেব ওরা চায় দুই বাংলার শিল্পীদের মধ্যে যেন কোনো বাঁধা না থাকে। একই আকাশ দুই বাংলার। তাই দুই বাংলার শিল্পীরা যেন দুই বাংলাতেই কাজ করে।

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
২৭ ফেব্রুয়ারী, ২০২০ ইং
ফজর৫:০৭
যোহর১২:১২
আসর৪:২৩
মাগরিব৬:০৪
এশা৭:১৬
সূর্যোদয় - ৬:২২সূর্যাস্ত - ০৫:৫৯
পড়ুন