বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠসুধা নেওয়া সেই অমর মাইক্রোফোন
‘দেশ স্বাধীন হওয়ার পর অন্য কেউ সেই মাইক্রোফোনে ভাষণ দেননি’
২৫ নভেম্বর, ২০১৭ ইং
‘দেশ স্বাধীন হওয়ার পর অন্য কেউ সেই মাইক্রোফোনে ভাষণ দেননি’
8 নুরুল করিম

ইউনেস্কো সম্প্রতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণকে ‘মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড’-এর স্বীকৃতি দিয়েছে। ইউনেস্কোর মহাপরিচালক ইরিনা বোকোভা এই ঘোষণা দেন। ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ৪৬ বছর আগে স্বাধীনতাকামী ৭ কোটি মানুষকে যুদ্ধের প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ বঙ্গবন্ধুর মুখের সেই কথাগুলো লাখো মানুষের কানে পৌঁছে দিয়েছিল ‘কল-রেডি’ মাইক সার্ভিস। বাংলার স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রতিটি ধাপের সাথে বেশকিছু নাম ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে আছে নীরবে-নিভৃতে। ‘কল-রেডি’ তার মধ্যে অন্যতম।

 

ইউনেস্কোর ‘মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড’ ৭ মার্চের ভাষণ

ইউনেস্কো গত ২৪ থেকে ২৭ অক্টোবর প্যারিসে দ্বি-বার্ষিক বৈঠক শেষে ‘মেমোরি অব দ্য ওয়ার্ল্ড’ কর্মসূচির ইন্টারন্যাশনাল অ্যাডভাইজরি কমিটি বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণসহ মোট ৭৮টি দলিলকে ‘ডকুমেন্টারি হেরিটেজ’ হিসেবে ‘মেমোরি অফ দ্য ওয়ার্ল্ড’ ইন্টারন্যাশনাল রেজিস্টারে যুক্ত করার সুপারিশ করে। এরপর মহাপরিচালক ইরিনা বোকোভা ওই সুপারিশে সম্মতি দিয়ে বিষয়টি ইউনেস্কোর নির্বাহী পরিষদে পাঠিয়ে দেন এবং আনুষ্ঠানিকভাবে সেই তথ্য প্রকাশ করা হয়। এমন কালজয়ী ভাষণ প্রদান এবং দেশকে স্বাধীনতা এনে দিতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করায় নিউজউইক ম্যাগাজিন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘রাজনীতির কবি’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। ১৮ মিনিট স্থায়ী এই ভাষণে তিনি পূর্ব পাকিস্তানের বাঙালিদের স্বাধীনতা সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত হওয়ার আহ্বান জানান।

 

‘কল-রেডি’ ইতিহাসের অন্যতম সাক্ষী

অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষার বিনিময়ে এসেছে আমাদের স্বাধীনতা। আত্মদানের পাশাপাশি আরও কত ত্যাগ কতভাবে স্বাধীনতার আন্দোলনকে বেগবান করেছে, সফলতার শিখরে নিয়ে গেছে তা নিরূপণ করা দুষ্কর। অতীত খুঁড়ি, খুঁজে ফিরি স্বজাতির গুলিবিদ্ধ কড়োটি। ভাষা আন্দোলনের পরই বাংলাদেশে পাকিস্তানের নিপীড়নের ইতিহাস ক্রমেই দীর্ঘ হতে থাকে এবং বাড়তে থেকে মিছিল-সমাবেশ। বলা যায়, প্রতিদিন বাংলার রাজপথ মুখোরিত হতো মিটিং, মিছিল কিংবা ছোট-বড় জনসভায়। সেই আন্দোলনকে উজ্জ্বীবিত করেছিল মাইকের প্রতিধ্বনি! সেই ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু, ‘কল-রেডি’ মাইক সার্ভিস যেন কালের সাক্ষী হিসেবে এখনও কথা বলে। ভাষা আন্দোলনসহ ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ১৯৬৬ সালের ৬ দফা আন্দোলন, ১৯৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থান, ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচন, ১৯৭১ সালের ঐতিহাসিক ৭ মার্চের সমাবেশের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে কল-রেডি। কল-রেডির মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়ে ভাষণ দিয়েছেন তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানে এবং স্বাধীনতা পরবর্তীকালের জাতীয় নেতৃবৃন্দ। স্বাধীনতা পরবর্তীকালেও কল-রেডির মাইক সার্ভিস সমানভাবে সেবা দিয়ে যাচ্ছে। ‘কল-রেডি’ শুধু একটি মাইক সার্ভিস নয়, এটি বাঙালির স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম সাক্ষী।

 

শুরুটা হয় যেভাবে

এখনও ঢাকায় কল-রেডির ডাক পড়ে। মাইক শব্দটি কানে এলেই সবার মনে পড়ে কল-রেডির কথা। পুরান ঢাকায় কল-রেডির আদি কার্যালয় এখনও রয়েছে। বর্তমানে কল-রেডির মালিকসহ ২৪ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত রয়েছেন। এই প্রতিষ্ঠানটির জন্মের গল্পটিও খানিকটা সংগ্রামের। সেই গল্পটি শুনতে কয়েকদিন আগে গিয়েছিলাম কল-রেডি’তে।

১৯৪৭ সালের কথা, ভারত ও পাকিস্তান নামের দুটো দেশের জন্ম হয়। মূলত ধর্মকে কেন্দ্র করেই ভারতীয় উপমহাদেশ ভাগ হয়। তখন ধর্ম নিয়ে কত শোরগোল! হরিপদ ঘোষ ও দয়াল ঘোষের জন্ম হয় তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানে। তারা ঠিক করেন যেখানে তাদের বাপ-দাদার ভিটা সেখানেই থাকবেন। তখন তারা কি করবেন ভেবে কূল পাচ্ছিলেন না! হরিপদের মাথায় একটি আইড়িয়া এলো, পুরান ঢাকায় লাইট আর সাউন্ডের দোকান নেই খুব একটা। তার এই ভাবনা জানান ভাই দয়ালকে। তারপর দুই ভাই মিলে বৃদ্ধ পিতার অনুমতি নেন। কয়েক মাইল মরিচবাতি, ৫-৬টি হ্যাজাগ, কয়েকটি রেভলবিং লাইট আর কয়েকজন কর্মচারী। ব্যস, আর কী! ১৯৪৮ সাথে মাঝামাঝি সময়ে ‘আরজু লাইট হাউজ’ নামে একটি দোকান চালু করেন তারা। লাইটের পাশাপাশি দোকানটিতে গ্রামোফোনও ভাড়া দেওয়া হতো। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে লাইটের সঙ্গে গ্রামোফোনও ভাড়া নিতো লোকজন। দোকানটি পরিচিত হয়ে ওঠে অল্পদিনেই। চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় ভারত থেকে কয়েকটি মাইক নিয়ে আসেন দুই ভাই। তাতেও যেন চাহিদা মেটাতে পারছিলেন না তারা। কোনো কূল না পেয়ে হরিপদ ঘোষ যন্ত্রপাতি কিনে এনে নিজে কয়েকটি হ্যান্ডমাইক তৈরি করেন। তার আগে বলে রাখা ভালো, তিনি মাইকের কাজ শিখে এসেছিলেন ভারত থেকে মাইক কেনার সময়। এমনিতেই তারা মানুষের চাহিদা ঠিকমতো মেটাতে পারছিলেন না তার ওপর পূর্ব পাকিস্তানের আন্দোলন দানা বাঁধতে শুরু করে। আন্দোলনের নেতাকর্মীরা মাইক ভাড়া নিতে শুরু করেন এই দোকান থেকে। চাহিদা বাড়তে থাকে দিনদিন।

সময় যত বাড়ে, বাড়তে থাকে আন্দোলন। সেই সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে মাই সার্ভিসের চাহিদা।

 

নতুন নাম রাখেন ‘কল-রেডি’

আর ভুল করেননি তারা। পরের মাসেই ৯টি মাইক কিনে ব্যবসা শুরু করেন দয়াল ও হরি। নাম কি দেবেন কোম্পানির? সেলিম চাচার কাছে যান দুই ভাই। বলে রাখা ভালো, সেলিম চাচা মুরুব্বি, ইংরেজ আমলের বিএ পাস। পাড়ার সবাই এক নামে চেনে। যেকোনো পরামর্শের খোঁজে তাকে খুঁজে সবাই। উদ্দেশ্য শুনে মুরুব্বি খুশি হন। অলয়েজ রেডি অ্যাট ইওর সার্ভিস অন কল টাইপের উদ্দেশ্য। তাই ইংরেজি বাক্যটিকে সংক্ষিপ্ত করে তিনি নাম রাখেন আরজা ইলেক্ট্রনিক্স। আরও সোজা করে রাখেন আরজু ইলেক্ট্রনিক্স। দুই ভাই খুশি হন। শুরু করেন ব্যবসা। বেশ কয়েকদিন পর বড় বড় জায়গা থেকে ডাক আসা শুরু করে। সারা ঢাকা এফোঁড়-ওফোঁড় করে ফরমায়েশ আসতে থাকে। এদিকে, ছাত্রসমাজ পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় মনোভাবে খুবই তিতিবিরক্ত। সুযোগ পেলেই সভা করছে।

তাই অহরহ ডাক আসে আরজু মাইকের। তাদের কোম্পানির নাম হতে থাকে। হরিপদ ভাবেন কোম্পানির নাম বদলাতে হবে। এমন একটা নাম দরকার যে নামটা বলতে সহজ, কিন্তু তার মধ্যে ‘সদা প্রস্তুত’ ভাবটা থাকবে। এই দায়িত্ব দেওয়া হয় পাশের কলেজ (জগন্নাথ কলেজ)-এর ছাত্রছাত্রীদের। যার নাম পছন্দ হবে তার জন্য পুরস্কারেরও ব্যবস্থা করেছিলেন তারা। অবশেষে তারা নাম পেলেন। জগন্নাথ কলেজের এক ছাত্রের বুদ্ধিতে নতুন নাম রাখেন ‘কল-রেডি’। যে কেউ যেকোনো সময় ডাকলে যাতে প্রস্তুত থাকতে পারে, এমন মাইক কোম্পানিই বানাতে চান হরি আর দয়াল। বলা তো যায় না বাংলার মুখ্যমন্ত্রীরা যদি ঢাকায় এসে সমাবেশ করতে চান! তখনও যাতে কল-রেডি হাতের নাগালে থাকে, যেন তখন তাদের জাদুকরী কণ্ঠের সামনে এই মাইক ধরা যায়।

 

উপেক্ষা করতে হয়েছে পাকিস্তানি হুমকিও

কল-রেডির বর্তমান কর্ণধার ত্রিনাথ ঘোষ জানান, বঙ্গবন্ধুর সাথে তার বাবা-চাচাদের ছিল ঘনিষ্ট সম্পর্ক। সে সূত্র ধরেই ৭ মার্চের জনসভায় শব্দযন্ত্র সরবরাহে বঙ্গবন্ধুর প্রত্যক্ষ নির্দেশ পায় কল-রেডি। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ পেয়েই হরিপদ ও তার ভাই ৫ মার্চ ছুটে যান সভাস্থলে। সাথে ছিলেন ১৫-২০ জন কর্মচারী। পুরো সভাস্থলে লাগানো হয় দেড় শতাধিক মাইক। এই মাইকের বেশিরভাগই তৈরি হয়েছিল শুধুমাত্র সমাবেশের জন্য। মাইক তৈরির এ কাজটি নিজের হাতেই করেছেন কল-রেডির প্রতিষ্ঠাতারা। তত্কালীন দেশীয় যন্ত্রপাতি দিয়ে মাইকগুলো তৈরি করা হয়েছিল। সেই মাইক লাগাতে গিয়ে উপেক্ষা করতে হয়েছে পাকিস্তানি হুমকিও।

ত্রিনাথ ঘোষ আক্ষেপ করে বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদানের জন্য প্রতিবছর বিদেশি বন্ধুদের সম্মাননা দেওয়া হচ্ছে, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিকে পুরস্কার দেওয়া হয়েছে। কিন্তু যে প্রতিষ্ঠানের কল্যাণে বীর বাঙালি মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে, সারাবিশ্বের মানুষ বঙ্গবন্ধুর সেই কালজয়ী ভাষণ শুনতে পেরেছে সেই প্রতিষ্ঠানকে আজ পর্যন্ত কোনো প্রকার সম্মাননা দেওয়া হয়নি। টাকা দিয়ে কল-রেডির সেদিনের সার্ভিসকে মূল্যায়ন করা সম্ভব না। এ জন্য দরকার স্বীকৃতি। আর সেই স্বীকৃতির অপেক্ষায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু কন্যার দিকে চেয়ে আছি।’

 

কল-রেডির মাইক্রোফোনে ভাষণ দিয়েছিলেন

৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে দাঁড়িয়ে কল-রেডির যে মাইক্রোফোনে বঙ্গবন্ধু তার ঐতিহাসিক ভাষণ দিয়েছিলেন সেই মাইক্রোফোন, মাইক্রোফোনের স্ট্যান্ড আজও আছে কল-রেডির কাছে। ত্রিনাথ ঘোষ এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আর অন্য কেউ সেই মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়ে ভাষণ দেননি। এরপর বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি দেশে ফিরে আবারও কল-রেডির মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়ে ভাষণ দিয়েছিলেন।’ দেশ-বিদেশের অনেক বিখ্যাত মানুষ কল-রেডির মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়ে ভাষণ দিয়েছেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, এ কে ফজলুল হক, শেখ হাসিনাসহ আরও অনেকে আছেন এই তালিকায়।

বিদেশের নেতাদের মধ্যে আছেন ভারতের ইন্দিরা গান্ধী। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশে এসে তার জন্য গড়া ইন্দিরা মঞ্চে দাঁড়িয়ে কল-রেডির মাইক্রোফোনে ভাষণ দিয়েছিলেন তিনি। এরপর ১৯৯৬ সালে ইয়াসির আরাফাত এবং নেলসন ম্যান্ডেলা কল-রেডির মাইক্রোফোনে ভাষণ দেন। আমেরিকার সাবেক প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন, ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারি বাজপেয়িও কল-রেডিতে কথা বলেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি সমাবর্তনে মাইক সার্ভিস দেয় কল-রেডি। ১৯৮১ সালে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পর থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় প্রতিটি সভা-সমাবেশে মাইক সার্ভিস দিয়েছে কল-রেডি। বর্তমানে ৩৬, এইচকে দাস রোড, লক্ষ্মীবাজার, সূত্রাপুর থেকে অত্যন্ত সুনামের সাথে সেবা দিয়ে যাচ্ছে কল-রেডি।

 

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
২৫ নভেম্বর, ২০১৮ ইং
ফজর৫:০১
যোহর১১:৪৬
আসর৩:৩৫
মাগরিব৫:১৪
এশা৬:৩০
সূর্যোদয় - ৬:২০সূর্যাস্ত - ০৫:০৯
পড়ুন