রাজধানী | The Daily Ittefaq

দুই যুগেও মিরপুরে স্থায়ী বেনারসি পল্লী গড়ে উঠেনি

দুই যুগেও মিরপুরে স্থায়ী বেনারসি পল্লী গড়ে উঠেনি
বহু তাঁতী চলে গেছেন অন্য পেশায়
আলাউদ্দিন চৌধুরী০২ জুন, ২০১৮ ইং ০১:০৮ মিঃ
দুই যুগেও মিরপুরে স্থায়ী বেনারসি পল্লী গড়ে উঠেনি

দুই যুগেও মিরপুরে স্থায়ী বেনারসি পল্লী গড়ে উঠেনি। এ লক্ষ্যে সরকারিভাবে নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত তা আর আলোর মুখ দেখেনি। প্রতিযোগিতায় টিকতে না পেরে অনেক তাঁতী এ পেশা ছেড়ে ভিন্ন পেশায় চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন।

সম্প্রতি মিরপুর ‘বেনারসি পল্লী’ গিয়ে দেখা যায়, আসছে ঈদের বাজারকে কেন্দ্র করে যতটা দেশীয় শাড়ি দোকানগুলোতে উঠছে তার চেয়ে বেশি শোভা পাচ্ছে ভারতীয় পোশাক। মিরপুরের বাইরে দেশের বিভিন্ন এলাকা যেমন পাবনা, টাঙ্গাইল, রূপগঞ্জের সুতি, সিল্ক, জামদানি শাড়িও এসবও দোকানে শোভা পাচ্ছে।

জানা যায়, দেশ স্বাধীন হবার পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সময়ে এই তাঁতীদের পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। সর্বশেষ সরকার ১৯৯৫ সালে ভাসানটেক এলাকায় ৪০ একর জমির উপর বেনারসি পল্লী, মিরপুর শীর্ষক একটি প্রকল্প বাস্তাবায়নের উদ্যোগ নেয়; কিন্তু মামলার কারণে তাঁতপল্লী ভাসানটেকে স্থানান্তর করা সম্ভব হয়নি। ফলে এই অঞ্চলের তাঁতীরা অবর্ণনীয় অবস্থার মধ্যে বাস করছে। অনেকেরই সেখানে আবাসন ব্যবস্থা নেই, তাদের পণ্য বিপণনের নিজস্ব কোনো ব্যবস্থা নেই। ফলে আর্থ-সামাজিকভাবেও   পিছিয়ে পড়ছেন তারা। স্থানীয়রা জানান, বেনারসি পল্লীতে এখন হাজার খানেক তাঁত থাকলেও সচল রয়েছে মাত্র সাত থেকে আটশ তাঁত।

বেনারসি পল্লীর তাঁতি সমিতির সাবেক সভাপতি মো. রফিক ইত্তেফাককে বলেন, প্লট প্রাপ্তির আশায় তাঁতীরা তাদের ঘাম জড়ানো টাকা জমা দেয়। ১৮শ তাঁতী প্রত্যেকে দশ হাজার টাকা করে প্রায় দুই কোটি টাকা জমা দেয়। ১৯৯৫ সালে ভাসানটেকে বেনারসি পল্লী গড়ে তোলার কাজ শুরু করলেও আজো তারা প্লট বুঝে পাননি।

তাঁত বোর্ড ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ৪০ একর জমির উপর বেনারসি পল্লী গড়ার প্রকল্পটি ১৯৯৯ সালের জুলাই মেয়াদে প্রায় বিশ কোটি টাকায় বাস্তবায়নের লক্ষ্য ছিল। প্রকল্পের আওতায় ৯০৬টি প্লট তৈরি করার কথা ছিল; কিন্তু স্থানীয় এলাকাবাসীকে পুনর্বাসন না করেই উচ্ছেদের চেষ্টা করায় হাইকোর্টে রিট পিটিশন দাখিল করা হয়। এর ফলে আদালতের নির্দেশে প্রকল্পের কাজ স্থগিত হয়ে যায়। ফলে ভাসানটেকের ৩৭ একর জমির দখল জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের নিকট হতে তাঁত বোর্ডের কাছে হস্তান্তর ও রেজিস্ট্রেশন হয়নি। এই এলাকার অবশিষ্ট তিন একর জমিতে তাঁত বোর্ডের অফিস ভবনসহ অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হলে বেনারসি তাঁতীদের অপর একটি মামলার কারণে সেটিও বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে ভাসানটেকে সকল কাজ স্থগিত হয়ে যায়। মূলত মামলার কারণে তাঁতপল্লী ভাসানটেকে স্থানান্তর করা সম্ভব হয়নি। অর্থ পরিশোধ করার পরেও মামলার কারণে জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ তাঁত বোর্ডকে জমি বুঝিয়ে দেয়নি। ফলে সে কার্যক্রম সফল হয়নি।

মিরপুরের তাঁতীরা জানান, সরকারিভাবে ১৮শ তাঁতীর কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়েছে; কিন্তু ভাসানটেকে প্লট রয়েছে মাত্র ৯০৬টা।

তাঁত বোর্ডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানান, ২০১৪ সালের ১২ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয় পরিদর্শন করে রাজধানীর বাইরে একটি তাঁতপল্লী গড়ে তোলার নির্দেশনা দেন। এরপর ২০১৪ সালের ১৮ নভেম্বর একনেক সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ‘বেনারসি পল্লী’ ঢাকার বাইরে খোলামেলা পরিবেশে স্থানান্তর করার নির্দেশনা দেওয়া হয়। তাঁতীদের জন্য ঘরবাড়ি ও শিশুদের জন্য স্কুল, কলেজ স্থাপনের ব্যবস্থা গ্রহণসহ তাঁতীদের উন্নত কাজের পরিবেশ সৃষ্টির মাধ্যমে তাদের উত্পাদন ক্ষমতা বৃদ্ধির ব্যবস্থা গ্রহণেরও অনুশাসন দেওয়া হয়। এ প্রেক্ষিতে পদ্মা নদীর পারে জাজিরা ও শিবচরে ১২০ একর জমির উপর তাঁতপল্লী গড়ে তোলার বিশাল পরিকল্পনা গ্রহণ করে বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নামে প্রস্তাবিত এই পল্লীতে তাঁতীদের জন্য ৪২টি আবাসিক ভবন নির্মাণ করে ২০১৬ জন তাঁতীর প্রত্যেককে একটি করে ৮০০ বর্গফুটের ফ্ল্যাট দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এছাড়া তাঁতীদের জন্য তাঁত শেড, কারিগরদের বাসোপযোগী ডরমেটরি, রেস্টহাউজ, সাইবার ক্যাফে তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে।

তাঁতীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মাত্র ৮০০ বর্গফুটের ফ্ল্যাট বা স্বল্প পরিসরের জমি তাদের জন্য পর্যাপ্ত নয়। সরকার যেখানেই তাদের পুনর্বাসন করুক কমপক্ষে পাঁচ কাঠা জমি চান তারা।

বাংলাদেশ তাঁত বোর্ড সূত্রে জানা যায়, প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হলে তাঁতীরা তাঁত বস্ত্রের জন্য বিভিন্ন সুবিধাদি গ্রহণ করতে পারবেন। সপ্তাহে দুই-একদিন তাঁত পণ্যের হাট বসবে। সেখানে সুতাসহ বিভিন্ন উত্পাদন উপকরণ ও কাঁচামালের মার্কেট এবং ডিসপ্লে সেন্টার তৈরি করা হবে। প্রস্তাবিত তাঁতপল্লীতে তাঁতের বুনন হতে শুরু করে বিপণনের যাবতীয় সুযোগ-সুবিধা থাকবে। তাঁতপল্লীতে ৮ হাজার ৬৪টি তাঁত স্থাপন করার লক্ষ্য রয়েছে। তাঁতপল্লীতে তাঁতীদের জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকবে। এছাড়া তাঁতপল্লীটির অবস্থান পদ্মা সেতুর অপর প্রান্তে প্রস্তাবিত রেলস্টেশনের কাছাকাছি নির্ধারণ করায় উত্পাদিত পণ্য ও কাঁচামাল পরিবহন সহজ হবে।

বেনারসি পল্লীসহ সারাদেশে দরিদ্র তাঁতীরা কি প্রক্রিয়ায় পুনর্বাসিত হবেন এবং পুনর্বাসিত তাঁতীরা নতুন তাঁতপল্লীতে কি কি সুযোগ-সুবিধা পাবে তা উল্লেখ করে তাঁত বোর্ড এবং তাঁতীদের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হওয়া প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা উল্লেখ করেন। তবে তাঁত বোর্ডের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তাঁতপল্লীর জন্য একটি নীতিমালা প্রণয়ন করে তার আওতায় তাঁতপল্লীর উপকারভোগী নির্ধারণ, রক্ষণাবেক্ষণ ইত্যাদি কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, দেশের অভ্যন্তরীণ বস্ত্র চাহিদার ৪০ শতাংশ তাঁত শিল্প যোগান দিয়ে আসছে। তাঁত বোর্ড ও পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা যায়, ১ হাজার ৯১১ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০২১ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে মাদারীপুর জেলার শিবচর উপজেলাধীন ৯২ নম্বর কুতুবপুর মৌজায় ৬০ একর জমি এবং শরিয়তপুর জেলার জাজিরা উপজেলায় ১০১ নম্বর নাওডোবা মৌজায় ৬০ একর জমি মোট ১২০ একর জমিতে শেখ হাসিনা তাঁতপল্লী স্থাপনের প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে সরকারি উদ্যোগ বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতার ফলে তাঁতীদের মাঝে হতাশা আরো গভীর হচ্ছে।

ইত্তেফাক/নূহু

এই পাতার আরো খবর -
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
২১ জুন, ২০২১ ইং
ফজর৩:৪৩
যোহর১২:০০
আসর৪:৪০
মাগরিব৬:৫১
এশা৮:১৬
সূর্যোদয় - ৫:১১সূর্যাস্ত - ০৬:৪৬