থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) নিয়োগের নীতিমালা মানছে না খোদ পুলিশ প্রশাসন। নীতিমালা অনুযায়ী ওসি পদে পদায়নের সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৫৪ বছর। কিন্তু দেশের বিভিন্ন থানায় ৫৪ বছরের বেশি বয়সের ইন্সপেক্টরদেরকে ওসি পদে পদায়ন করা হয়েছে এবং হচ্ছে। আবার চাকরি জীবনে গুরুদণ্ড ও বিভাগীয় শাস্তিপ্রাপ্ত ব্যক্তিরাও ওসি হিসেবে নিয়োগ পাচ্ছেন। এনিয়ে খোদ পুলিশ প্রশাসনেও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে।
কেউ কেউ বলছেন, রাজনৈতিক তদবির কিংবা অবৈধ ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে অনেক বয়স্ক ইন্সপেক্টররাও ওসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
পুলিশ সদর দপ্তরের ডিআইজি (প্রশাসন) হাবিবুর রহমান বলেন, ওসি নিয়োগের ক্ষেত্রে বিভাগীয়ভাবে একটি নীতিমালা অনুসরণ করা হয়। সাধারণত ৫৪ বছরের বেশি বয়সের কেউ ওসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারেন না। কারণ, একজন ওসিকে মাঠ পর্যায়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতে হয়। তবে আইজিপি যদি কাউকে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে যথোপযুক্ত মনে করেন, সে ক্ষেত্রে বয়স কোনো বিবেচ্য বিষয় নয়। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ৫০টি থানার মধ্যে গেন্ডারিয়া থানার ওসির বয়স ৫৪ বছরের বেশি। আরো কয়েকটি থানার বেশ কয়েকজন ওসি ইতিমধ্যে ১২ বছরের বেশি সময় ধরে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। ঢাকার বাইরে মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর থানার ওসির বয়স ৫৮ বছর। কনস্টেবল থেকে পদোন্নতি পাওয়া এই ব্যক্তি বয়সজনিত কারণে থানার ওসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। একইভাবে দেশের অনেক থানাতেও বেশি বয়স্ক ব্যক্তি ওসি হিসেবে পদায়ন পেয়েছেন।
পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র জানায়, ইন্সপেক্টর (পরিদর্শক) পদে কমপক্ষে তিন বছর চাকরি করার পরই কেবল সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তা ওসি পদে নিয়োগের যোগ্যতা অর্জন করবেন। পাশাপাশি কোনো কর্মকর্তা ১২ বছর ওসি পদে দায়িত্ব পালন করলে অথবা কোনো কর্মকর্তার বয়স ৫৪ বছর হলে ওই কর্মকর্তা পরবর্তীকালে আর ওসি পদে নিয়োগের অযোগ্য বলে বিবেচিত হবেন।
ওসি নিয়োগের ৮ দফা নীতিমালার মধ্যে আরও রয়েছে, পরিদর্শক হিসেবে কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুই বা ততোধিক এবং সমগ্র চাকরিকালে চার বা ততোধিক গুরুদণ্ড থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে ওসি হিসেবে পদায়ন করা যাবে না। আর কারো বিরুদ্ধে একটি আর্থিক অনিয়ম বা নৈতিক স্খলন সংক্রান্ত গুরুদণ্ড থাকলেও সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তা ওসি পদে নিয়োগের যোগ্যতা হারাবেন।
নীতিমালায় আরও বলা হয়েছে, থানায় পদায়নকৃত পরিদর্শকের মধ্যে সিনিয়রকে ওসি পদে নিয়োগ করতে হবে। কোনো পুলিশ কর্মকর্তা একটি থানার ওসির দায়িত্ব পালন করলে পরবর্তীকালে দ্বিতীয় দফায় ওই থানায় ওসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না। সদাচরণ, গণমুখী ও কমিউনিটি পুলিশিং কার্যক্রমে উত্সাহী পুলিশ পরিদর্শকদের ওসি হিসেবে পদায়নে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। এছাড়া ভবিষ্যতে আরআই (রিজার্ভ ইন্সপেক্টর) প্যানেলের মতো থানার ওসি পদায়নের লক্ষ্যে প্যানেল প্রস্তুত করার কথা বলা হয়েছে নীতিমালায়।
সূত্র জানায়, গত বছর পুলিশ সদর দপ্তরে পলিসি গ্রুপের সভায় আট দফা বিধান সম্বলিত ওসি নিয়োগ নীতিমালা জারি করা হয়। এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে পুলিশ সদর দপ্তরের একজন সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি) জানান, ইতিমধ্যে এই নির্দেশনা সারা দেশের পুলিশ ইউনিটগুলোতে পাঠানো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র আরও জানায়, ওসি হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার জন্য একটি প্যানেল তৈরি করছে পুলিশ সদর দপ্তর। ইন্সপেক্টরদের বার্ষিক গোপন প্রতিবেদন, অতীত রেকর্ড, পারফরম্যান্স ইত্যাদি বিশ্লেষণ করে ওসি পদে নিয়োগের বিষয়টি চূড়ান্ত করবে ওই প্যানেল।
রাজধানী ঢাকা ও ঢাকার বাইরে কয়েকটি থানার ওসিদের সঙ্গে এ বিষয়ে আলাপ করে জানা গেছে, ইন্সপেক্টর পদে পদোন্নতির পর ৩ বছর হয়নি এ রকম বহু কর্মকর্তা দেশের বিভিন্ন থানায় ওসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। পাশাপাশি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পুলিশ কর্মকর্তা রয়েছেন ১২ বছরের বেশি সময় ধরে ওসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বেশ কয়েকজন পুলিশ পরিদর্শক জানান, রাজনৈতিক তদবির কিংবা অসত্ উপায়ে ওসি নিয়োগের ফলে অনেক দক্ষ ও সত্ কর্মকর্তারা বঞ্চিত হচ্ছেন।
ইত্তেফাক/আরকেজি