শতবর্ষী ডেল্টা প্লান বাস্তবায়নে অর্থনৈতিক ও অবকাঠামো উন্নয়নের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা ও ধারাবাহিক পর্যবেক্ষণ বড় চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেছেন, শত বছরব্যাপী এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা-পর্যবেক্ষণের পাশাপাশি এখন থেকে প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য অর্থায়ন এবং শুরুতেই অবকাঠমোগত উন্নয়ন প্রয়োজন। পরিকল্পনার মাধ্যমে বন্যা, নদীভাঙন, নদী শাসন, নদী ব্যবস্থাপনা, নগর ও গ্রামের পানি সরবরাহ এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নগর বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও নিষ্কাশন ব্যবস্থাপনার কৌশল নির্ধারণ করা হয়েছে। দেশীয় বিশেষজ্ঞদের দ্বারা প্রণীত এ পরিকল্পনা সঠিক নেতৃত্বের দ্বারা বাস্তবায়ন করতে হবে। গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় প্রেসক্লাবে জার্নালিস্ট ফর ডেভেলপমেন্ট আয়োজিত ‘ডেল্টা প্লান-২১০০ বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় বক্তারা এসব কথা বলেছেন।
জার্নালিস্ট ফর ডেভেলপমেন্ট-এর আহ্বায়ক আবুল কালাম আজাদ-এর সঞ্চালনায় এবং সদস্য সচিব বেলাল হোসেন-এর স্বাগত বক্তব্যে অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য সিনিয়র সচিব ড. শামসুল আলম। আলোচনা সভায় বক্তব্য দেন তথ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব আবদুল মালেক, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের এমিরেটাস অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থ এন্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সের ডীন ড. এ এস এম মাকসুদ কামাল, বুয়েটের প্রাণিসম্পদ প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. উম্মে কুলসুম নভেরা।
ড. শামসুল আলম বলেন, সারা দেশের সমস্যা চিহ্নিত করে শতবর্ষী ডেল্টা পরিকল্পনায় ছয়টি হটস্পট নির্ধারণ করে সেখানে ৩৩ ধরনের চ্যালেঞ্জ শনাক্ত করা হয়েছে। হটস্পটগুলো হচ্ছে উপকূলীয় অঞ্চল, বরেন্দ্র ও খরাপ্রবণ অঞ্চল, হাওর ও আকস্মিক বন্যাপ্রবণ অঞ্চল, পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চল, নদী ও মোহনা অঞ্চল ও নগরাঞ্চল। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিসহ ভিশন-২০৪১ এর লক্ষ্য অর্জনে সামগ্রিকভাবে এর সঙ্গে যুক্ত প্রধান উপাদানগুলোর সমন্বয়ের মাধ্যমে ব-দ্বীপ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সম্ভব। এসডিজিসহ আমাদের সকল লক্ষ্যমাত্রা ডেল্টা প্লান বাস্তবায়নের মাধ্যমে পূরণ হবে। ২০৩০ সালের মধ্যে উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে পৌঁছবে বাংলাদেশ। তখন মাথাপিছু আয় হবে ৪ হাজার ৬২৫ ইউএস ডলার। আবার ২০৪১ সালে গিয়ে মাথাপিছু আয় দাঁড়াবে ১৬ হাজার ইউ এস ডলার। ডেল্টা পরিকল্পনা গ্রহণ করলে জিডিপি বাড়বে ১ দশমিক ৭ শতাংশ। দারিদ্র্যতা দ্রুত কমে আসবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০২৭ সালের মধ্যে দেশ দরিদ্রমুক্ত হবে। আর তা না হলে দেশ দরিদ্রমুক্ত হতে ২০৪১ সাল পর্যন্ত সময় লাগবে। পাশাপাশি বাড়বে উত্পাদন ব্যবস্থা। তবে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হলে জিডিপির দশমিক ৫ শতাংশ বরাদ্দ রাখতে হবে। পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য ১৩৩টি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। এতে ব্লু-ইকোনমির উপর জোর দেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, আমরা বিজ্ঞানভিত্তিক অনুসন্ধানের মাধ্যমে ২০৪১ সালের মধ্যে ৫০ শতাংশ নবায়ন জ্বালানিতে যেতে চাই। এছাড়া হ্যাজার্ড মোকাবেলার কথা বলা হয়েছে। ১৩৩টা প্রকল্পের মধ্যে ৮০টা প্রকল্প দিয়ে বাস্তবায়ন শুরু হলে ডেল্টা প্রকল্প অনুভূত হবে।
তিনি আরো বলেন, ডেল্টা প্লানে প্রকৃতির সাথে বসবাসের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এ পরিকল্পা করতে ২৬টি গবেষণা পরিচালনা করা হয়েছে। এর মাধ্যমে নদী নব্যতা ফিরে পাবে। পরিকল্পিতভাবে নদীগুলোর নাব্যতা রাখতে পারলে দেশে আর বন্যা থাকবে না। প্লানে সম্পূর্ণ যমুনা নদীর ম্যাপ করে দেখানো হয়েছে, কোথায় নদীর চ্যানেল হবে তাও চিহ্নিত করা হয়েছে। এলাকাভিত্তিক কি ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হবে তাও দেখানো হয়েছে। বর্তমানে ২৫ শতাংশ পানি আসে পদ্মা নদী থেকে।
ড. উম্মে কুলসুম নভেরা বলেন, ডেল্টা প্লান বাস্তবায়নের জন্য শুরুতেই অবকাঠামোগত উন্নয়ন করতে হবে। আর এখন থেকে শুরু না করলে প্রকল্প বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হবে। পাশাপাশি পানির সাথে সম্পৃক্ত সকল মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয় করা দরকার। পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা, পর্যবেক্ষণ এবং স্টাডি দরকার।
ড. এ এস এম মাকসুদ কামাল বলেন, ডেল্টা প্লান বাস্তবায়ন হলে ২০৪১ সালের আগে বাংলাদেশ উন্নত দেশে পরিণত হবে। এটি দেশের প্রথম একটি পরিকল্পনা যেখানে প্রত্যেকটি সেক্টরের ঝুঁকিগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে। কারণ ঝুঁকি জানা না থাকলে গবেষণা ও প্রকল্প বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হয়। আগে দেশের কোনো মেগাপ্রকল্প নিলে বিদেশি বিশেষজ্ঞদের উপর নির্ভর করা হতো; কিন্তু এটাই প্রথম পরিকল্পনা, যেটা দেশীয় বিশেষজ্ঞদের দ্বারা প্রণয়ন করা হয়েছে।
ড. আইনুন নিশাত বলেন, পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য অর্থায়ন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে। আর সেজন্য এখন থেকেই অর্থের উত্স ঠিক করে প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে। দেশে অবকাঠামোগত উন্নয়ন করার ফলে ২০১৭ সালে সবচেয়ে বেশি পানি প্রবাহিত হওয়ার পরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি এবং আমরা টের পাইনি। এজন্য অবকাঠামোগত উন্নয়ন খুবই জরুরি।
ইত্তেফাক/আরকেজি