জাতীয় | The Daily Ittefaq

সংলাপের ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া

সংলাপের ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া
শামছুদ্দীন আহমেদ০৩ নভেম্বর, ২০১৮ ইং ০২:১৩ মিঃ
সংলাপের ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া
একাদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল-জোটের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার শুরু হওয়া সংলাপ চলবে আরও কয়েকদিন। রাজনীতিতে হঠাৎ নতুন মাত্রা যোগ করা জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতাদের সঙ্গে  বৃহস্পতিবার গণভবনে আলোচনার মধ্য দিয়ে এই সংলাপের পর্দা উঠেছে। ঐক্যফ্রন্ট নেতাদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগসহ ১৪ দলের শীর্ষ নেতাদের বৈঠকের দিকে চোখ ছিল সবার। প্রায় পৌণে চার ঘণ্টার ওই সংলাপের পর থেকেই সর্বত্র চলছে এর চুলচেরা বিশ্লেষণ। সংলাপের পর উভয় পক্ষের নেতাদের বক্তব্য এবং বিভিন্ন সূত্রে প্রাপ্ত তথ্যাদি নিয়ে চলছে ব্যাপক পর্যালোচনা। রাজনৈতিক অঙ্গণ থেকে শুরু করে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও টেলিভিশনের টকশোতে আসছে নানা ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া।
 
সংলাপ শেষে বৃহস্পতিবার রাতে গণভবন থেকে বের হওয়ার সময় জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ড. কামাল হোসেন বলেছেন ‘আলোচনা ভালো হয়েছে।’ সেখান থেকে বেইলি রোডে নিজ বাড়িতে গিয়ে প্রেস ব্রিফিংয়ে তিনি বলেছেন, ‘আমরা ওখানে (সংলাপে) কোনো বিশেষ সমাধান পাইনি।’ সংলাপ থেকে বের হয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রী ঐক্যফ্রন্ট নেতাদের একটা অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের নিশ্চয়তা দিয়েছেন। ড. কামালকে দেয়া চিঠিতেই প্রধানমন্ত্রী বলেছেন-সংবিধানসম্মত সব বিষয়ে আলোচনার জন্য তার দ্বার সর্বদা উন্মুক্ত। কাজেই আমরা সংবিধানের বাইরে যাব না।’
 
গণভবন থেকে মলিন মুখে বের হয়ে অনেকটা জোর করে হাসি ধরে রেখে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘আমরা সন্তুষ্ট নই, আলোচনা আরও হতে পারে।’ এরপর ড. কামালের বাসায় প্রেস ব্রিফিংয়েও তিনি বলেছেন, ‘আগেই তো বলেছি আমরা সন্তুষ্ট নই।’ ‘তাহলে এই সংলাপ থেকে আমরা কি পেলাম’- এক সাংবাদিকের এই প্রশ্নের জবাবে ফখরুল বলেন, ‘একদিনে তো সবকিছু অর্জন করা সম্ভব হয় না।’
 
সংলাপের পরপর আওয়ামী লীগের ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতাদের তাত্ক্ষণিক এসব প্রতিক্রিয়া ও নেতাদের শরীরী ভাষা, চেহারা নিয়েও রাজনৈতিক অঙ্গণসহ বিভিন্ন মহলে গতকাল শুক্রবার দিনভর নানামুখী পর্যালোচনা চলতে দেখা গেছে। পাশাপাশি শেষ মুহূর্তে তালিকায় নাম উঠলেও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের সংলাপে না যাওয়া, ফ্রন্ট নেতা ও নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মহামুদুর রহমান মান্নার সংলাপে বিলম্বে যাওয়া এবং ড. কামালের বাসায় অনুষ্ঠিত প্রেস ব্রিফিংয়ে তার অনুপস্থিত থাকা নিয়েও মেলা কথা চলছে।
 
তবে এর সবকিছুকে ছাপিয়ে এসব আলোচনার বড় অংশ জুড়ে স্থান করে নেয় গণভবনে ঐক্যফ্রন্ট নেতাদের নৈশভোজে অংশ নেয়া না নেয়া নিয়ে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ও টিভি টকশোগুলোতে এই নৈশভোজের বিষয়টি নিয়ে সরস আলোচনা-সমালোচনা চলছে। কেউ কেউ বলছেন, নৈশভোজে অংশ না নেয়ার পূর্বঘোষণা দিয়েও পরে তা গ্রহণ করেছেন ফ্রন্ট নেতারা। আবার কেউ কেউ বলছেন, নৈশভোজে ফ্রন্ট নেতাদের অংশগ্রহণের কোনো ছবি তো কোথাও পাওয়া যায়নি। কার্যত বিষয়টি নিয়ে এক ধরনের ধুম্রজাল সৃষ্টি হয়েছে। অবশ্য সংলাপের শুরুতে যখন টেলিভিশন চ্যানেলগুলো গণভবনে সংলাপস্থল থেকে নেতাদের আসা-যাওয়া ও বসার স্থান সরাসরি সম্প্রচার করছিল তখন টেবিলে সবার আসনের সামনে ফলের রস, চিপস, বাদাম দেখা যায়। কাউকে কাউকে ফলের রস পানের পাশাপাশি চিপস-বাদাম চিবোতেও দেখা গেছে; এরমধ্যে ফ্রন্ট নেতা ও জেএসডি সভাপতি আ স ম আব্দুর রব, গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য  ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ ও ড. আবদুল মইন খানসহ কয়েকজনের জুস, চিপস, বাদাম খাওয়ার ছবি দেখা গেছে। সেসব ছবি ফেসবুকের ওয়ালেও ভাসছে।
 
এ ব্যাপারে সংলাপে অংশ নেয়া গণফোরামের প্রেসিডিয়াম সদস্য অ্যাডভোকেট জগলুল হায়দার আফ্রিক গতকাল ইত্তেফাকের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, ‘নৈশভোজের বিষয়টি নিয়ে আসলে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হচ্ছে। ১৭ পদ, ২০ পদ ইত্যাদি ছিল- এরকম নানা কথা মিডিয়ায় দেখে আমরাও বিব্রত। আমরা তো সেখানে খেতে যাইনি, জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কথা বলতে গেছি। প্রকৃত সত্য হলো- আলোচনার মাঝখানে সবার সামনে প্লেটে করে নানরুটি, কাবাব, মাছের কোপ্তা, ছোট ছোট মিটবল জাতীয় কিছু একটা দেয়া হয়েছিল। আমরা যে টেবিলে বসে আলোচনা করেছি সেখানেই সবার সামনে এগুলো দেয়া হয়। যার মন চেয়েছে তিনি খেয়েছেন, যার মন চায়নি তিনি খাননি। খাবার নিয়ে কেউ কাউকে কিছু বলেননি। এখন এটাকে কেউ নৈশভোজ বলতে পারেন, কেউ হাল্কা নাস্তা বলতে পারেন, কেউ স্ন্যাকস বলতে পারেন। আর আগে থেকেই টেবিলে সবার সামনে ফলের জুস, চিপস ও বাদাম রাখা ছিল।
 
এদিকে, জেলহত্যা দিবস উপলক্ষে গতকাল মতিঝিলে গণফোরামের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক স্মরণসভায় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে ড. কামাল হোসেন বলেছেন, ‘খোলামন নিয়ে বসলে, ব্যক্তি, পরিবারের স্বার্থ না দেখলে অবশ্যই সংবিধানের আলোকে সব সমস্যার সমাধান সম্ভব। সরকার সমস্যার সমাধানে আন্তরিক হলে অবশ্যই আবার আলোচনায় বসা যাবে।’ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন, দেশের মালিক জনগণ। সে মালিক সংগঠিত হয়ে শক্তিশালী হলে তারা যে কোনো ধরনের আক্রমণের জবাব দিতে পারে। জাতীয় ঐক্য হচ্ছে জনগণের ঐক্য। জনগণের সে ঐক্যের মাধ্যমে যে শক্তি বৃদ্ধি হয় তাকে কোনো ধরনে আক্রমণ করে থামিয়ে দেয়া যাবে না। এটা মুক্তিযুদ্ধেই দেখেছি।
 
ওবায়দুল কাদের গতকাল ঢাকার বাইরে এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের বলেছেন, সংলাপের বিষয়ে আমরা আশাবাদী। অপজিশন কীভাবে রিয়েক্ট করে এটা তাদের ব্যাপার। আমি তো মনে করি না এখানে ব্যর্থতার কিছু আছে। শুরুটা ভালো হয়েছে। তাদের সাত দফার তিনটি বিষয়ে আমাদের কোনও বাধা-আপত্তি থাকবে না। শেখ হাসিনা স্পষ্ট করে বলেছেন এ বিষয়ে আমাদের কোনও আপত্তি নেই। দীর্ঘদিনের লং গ্যাপ, ডিস্টেন্সকে রাতারাতি ম্যাজিক্যাল ট্রান্সফরমেশন সম্ভব না, ক্লোজ করাও সম্ভব না। কিন্তু সংলাপে কিছু বিষয়ে ইতিবাচক অগ্রগতি হয়েছে। বিএনপি নেতা-কর্মীদের যাদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ও মামলা আছে, ক্রিমিনাল অফেন্স ছাড়া শুধু রাজনৈতিক কারণে, তাহলে আমার কাছে তাদের তালিকা পাঠাতে বলেছি। এই তালিকা অনুযায়ী সুষ্ঠু তদন্ত করা হবে।
 
বৃহস্পতিবার সংলাপের পরপরই আ স ম রব বলেছেন, ঐক্যফ্রন্টের যেসব কর্মসূচি রয়েছে সেগুলো চলবে। আন্দোলন চলবে। ৬ নভেম্বর ঢাকায় ও ৯ তারিখ রাজশাহীতে আমরা সমাবেশ করবো। আর গতকাল প্রেস ব্রিফিংয়ে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে সরকারি  জোটের সংলাপে সরকারের একগুঁয়েমি মনোভাব গণতন্ত্র ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য বড় ধরনের অশনিসংকেত। সংলাপে মানুষের মনে যে আশাবাদ জেগে উঠেছিল, সংলাপ শেষে সেই আশার মুকুল ঝরে যেতে শুরু করেছে। সংলাপে ৭ দফায় আওয়ামী লীগ সাড়া না দেয়ায় এবং দলটির অনড় অবস্থানের কারণে সুষ্ঠু নির্বাচনের পথে অগ্রগতি তিমিরাচ্ছন্ন হলো। আর মাহমুদুর রহমান মান্না গতকাল সাংবাদিকদের বলেন, সংলাপ ফলপ্রসূ হয়নি। ঐক্যফ্রন্টের ৭ দফার কোনোটিই মেনে নেয়নি সরকার।
 
ইত্তেফাক/আরকেজি
এই পাতার আরো খবর -
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত
facebook-recent-activity
১৭ অক্টোবর, ২০১৯ ইং
ফজর৪:৪২
যোহর১১:৪৪
আসর৩:৫৩
মাগরিব৫:৩৪
এশা৬:৪৬
সূর্যোদয় - ৫:৫৭সূর্যাস্ত - ০৫:২৯