ড. কুদরাত-এ-খুদার শিল্পভাবনা
আলী আসগর০১ ডিসেম্বর, ২০১৬ ইং
ড. কুদরাত-এ-খুদার শিল্পভাবনা
ডক্টর কুদরাত-এ-খুদা ছিলেন প্রখ্যাত বিজ্ঞানী, বহু গুণে গুণান্বিত, বিদগ্ধ শিক্ষাবিদ। চিন্ময়, সত্যনিষ্ঠ। একজন শ্রেষ্ঠ বাঙালি। কিন্তু সর্বোপরি শিল্পদ্রষ্টা। তাঁর মেধা, শিক্ষা, গবেষণা, বৈদগ্ধ, তাঁর দেশপ্রেম—সবকিছুর একীভূত বহিঃপ্রকাশ আমরা দেখতে পাই তাঁর শিল্প-ভাবনায়। সমস্ত জীবনের অভিজ্ঞতা, রসায়নশান্ত্রের গবেষণায় সাফল্য—এ সবকিছু তাঁকে প্রস্তুত করেছিল দেশীয় শিল্পের ভবিষ্যদ্বক্তারূপে। যেখানে তিনি বিখ্যাত রসায়নবিদ, তদ্গত গবেষক ও পণ্ডিত, সেখানে তাঁর তুল্য ব্যক্তি দুর্লভ হলেও প্রাপ্য ছিল না। কিন্তু যেখানে তিনি এ দেশের শিল্প চেতনার উদ্বোধক—একজন স্রষ্টা, সেখানে তিনি শুধু বিশিষ্ট নন, সম্ভবত একমাত্র দিগ্দর্শী। গভীর এক উত্কণ্ঠা, কর্মতত্পরতা দূরদৃষ্টি নিয়ে বাংলাদেশের শিল্প-সম্ভাবনার কথা তিনি ভেবেছেন। প্রকৃতিজ সম্পদ নিয়ে কী কী শিল্প গড়ে উঠতে পারে, সেজন্যে শুধু গবেষণা চালানো নয়—পরিকল্পনা গ্রহণ, গবেষক দল সৃষ্টি, শিল্প গবেষণার কেন্দ্র স্থাপন, অর্থ সংগ্রহ, রাষ্ট্র পরিচালক ও সাধারণ্যে শিল্প প্রতিষ্ঠার পক্ষে মত সৃষ্টি—এ সবকিছু তিনি একনিষ্ঠভাবে করে গেছেন।

সব শিল্প উন্নয়নের পেছনেই একজনের দূরদৃষ্টি ও প্রেরণা থাকে। ইউরোপে বেকন শিল্প বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন তার প্রয়োগিক দর্শনের প্রভাবে। আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায় তাঁর গবেষণাকার্য ও শিল্প-চেতনা দিয়ে ভারতে শিল্প-আন্দোলনের সূত্রপাত করেছিলেন। বলতে পারি, ড. খুদা বাংলাদেশের জন্যে তেমনি এক শিল্প-চেতনার উদ্বোধক। অবশ্য সম্পদের সীমাবদ্ধতা, পরিবেশের বিরুদ্ধতা, সাধারণ্যে বৈজ্ঞানিক চিন্তা, কর্মশক্তির অকিঞ্চিত্করতা ও সময়ের প্রতিকূলতা প্রতিহত করেছে আমাদের শিল্পায়ন। ফলে, শিল্প কারখানার বিস্তার ও অগ্রগতির ভিতর দিয়ে কুদরাত-এ-খুদার শিল্প-ভাবনা ফলপ্রসূ হয়ে উঠতে পারেনি।

ড. খুদার শিল্প-ভাবনা এবং আমাদের প্রকৃতিজ সম্পদকে ভিত্তি করে বিভিন্ন রকম শিল্প গড়ে তোলা সম্পর্কে তাঁর উত্থাপিত প্রকল্পের গুরুত্ব অনুধাবন করতে হলে আমাদের জাতীয় অর্থনৈতিক সমস্যা ও তার সঙ্গে শিল্পের সম্পর্ক প্রত্যক্ষ করতে হবে সেই গভীর বৈজ্ঞানিক হিসাবকষা দৃষ্টিতে, যা কুদরাত-এ-খুদার জন্যে সহজাত ছিল, তাঁর প্রজ্ঞা, উদ্ভাবনশক্তি ও বাস্তবমুখীনতার গুণে। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন আমাদের ক্রমবর্ধমান বৃহত্ জনসংখ্যা, কর্মহীনতা, সবরকম পণ্যের জন্যে পরনির্ভরতা, অপুষ্টি, অশিক্ষা, অপচয়, অসহায়ত্ব—সব কিছুরই একটিমাত্র সম্ভাব্য সমাধান, সমাধান না হোক তার মোকাবিলা করার পর হলো, এ দেশের প্রাকৃতিক সম্পদকে শিল্পজাতদ্রব্যে রূপান্তরিত করা, এবং তা আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে। তাঁর ভাবনা একজন রাজনীতিবিদ বা অর্থনীতিবিদের ভাবনা থেকে অনেক দিক থেকে পৃথক ছিল। প্রত্যক্ষ রাজনীতির সঙ্গে সম্পর্কহীন, স্বল্পভাষী, অভিনিবিষ্ট বিজ্ঞানকর্মী ও সরকারি চাকুরে হিসাবে তাঁর বক্তব্য ছিল ঘোরপ্যাঁচহীন সরল। জনসভায় হালকা করে কিছু বলা তাঁর ধারা ছিল না। তাঁর বক্তব্য ছিল বিশেষজ্ঞের, গবেষকের। অত্যন্ত হিসাব কষে, রক্ষণশীলতার সঙ্গে তিনি বাংলাদেশের শিল্প-সম্ভাবনা সম্পর্কে অভিমত প্রকাশ করেছেন। সাধারণের জন্যে লিখিত তাঁর শিল্পসম্পর্কিত প্রবন্ধগুলো গ্রন্থাকারে ‘যুদ্ধোত্তর বাংলায় কৃষি ও শিল্প’ এবং ‘পূর্ব পাকিস্তানের শিল্প সম্ভাবনা’ এই দুই গ্রন্থে এবং বিভিন্ন প্রবন্ধাকারে তাঁরই প্রকাশিত পুরোগামী বিজ্ঞান পত্রিকায় স্থান পেয়েছে।   (অংশ)

সূত্র: ড. কুদরাত-এ-খুদা স্মারকগ্রন্থ/ সম্পাদনা: শেখর দত্ত ও রুশো তাহের (২০১৪)

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
১ নভেম্বর, ২০২১ ইং
ফজর৫:০৪
যোহর১১:৪৮
আসর৩:৩৫
মাগরিব৫:১৪
এশা৬:৩১
সূর্যোদয় - ৬:২৪সূর্যাস্ত - ০৫:০৯
পড়ুন