ফিরে দেখা
বইমেলার উদ্ভবের ইতিহাস
শামসুজ্জামান খান০১ ফেব্রুয়ারী, ২০১৭ ইং
বইমেলার উদ্ভবের ইতিহাস
বাংলাদেশে বইমেলার উদ্ভবের ইতিহাস খুবই কৌতূহলোদ্দীপক। বইমেলার  চিন্তাটি এদেশে প্রথমে মাথায় আসে কথাসাহিত্যিক জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের সাবেক পরিচালক সরদার জয়েনউদ্দীনের। তিনি বাংলা একাডেমিতেও একসময় চাকরি করেছেন। বাংলা একাডেমি থেকে ষাটের দশকের প্রথম দিকে তিনি গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক পদে নিয়োগ পান। তিনি যখন বাংলা একাডেমিতে ছিলেন তখন বাংলা একাডেমি প্রচুর বিদেশি বই সংগ্রহ করত। এর মধ্যে একটি বই ছিল Alfred Stefferud সম্পাদিত The Wonderful World of Books নামের একটি সংকলন বই এবং বইয়ের জগত্সংক্রান্ত ৭২টি বিচিত্র লেখা নিয়ে A Mentor Book।  এই বইটি পড়তে গিয়ে তিনি হঠাত্ দুটি শব্দ দেখে পুলকিত বোধ করেন। শব্দ দুটি হলো: ‘Book’ এবং ‘Fair’।  কত কিছুর মেলা হয়। কিন্তু বইয়েরও যে ‘মেলা’ হতে পারে এবং বইয়ের প্রচার-প্রসারের কাজে এই বইমেলা কতটা প্রয়োজনীয় সেটি তিনি এই বই পড়েই বুঝতে পারেন। ওই বইটি পড়ার কিছু পরেই তিনি ইউনেস্কোর শিশু-কিশোরদের পাঠ-উপকরণ (Reading Materials) উন্নয়নের একটি প্রকল্পে কাজ করছিলেন। কাজটি শেষ হওয়ার পর তিনি ভাবছিলেন বিষয়গুলো নিয়ে একটি  প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করবেন। তখনই তাঁর মাথায় আসে, আরে প্রদর্শনী কেন? এগুলো নিয়ে তো একটি শিশু-গ্রন্থমেলাই করা যায়। যেমন ভাবা তেমনি কাজ। তিনি একটি শিশু গ্রন্থমেলার ব্যবস্থাই করে ফেললেন তত্কালীন কেন্দ্রীয় পাবলিক লাইব্রেরির (বর্তমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরি) নীচতলায়। যতদূর জানা যায়, এটাই ছিল পূর্ববাংলায় প্রথম বইমেলা। এটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৬৫ সালে।

শিশু-গ্রন্থমেলা করে সরদার জয়েনউদ্দীন পুরোপুরি তৃপ্ত হতে পারেননি। আরো বড় আয়োজনে গ্রন্থমেলা করার তিনি সুযোগ খুঁজতে থাকেন। সুযোগটি পেয়েও যান। ১৯৭০ সালে নারায়ণগঞ্জ ক্লাবের সহযোগিতায় নারায়ণগঞ্জে একটি গ্রন্থমেলার আয়োজন করা হয়। এই মেলায় আলোচনা সভারও ব্যবস্থা ছিল। সে সব আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের তত্কালীন অধ্যক্ষ মুহম্মদ আবদুল হাই, অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী (১৯৭১-এর শহিদ), সরদার ফজলুল করিম প্রমুখ। এই মেলায় তিনি একটি মজার কাণ্ড করেছিলেন। মেলায় অনেক প্রকাশক বইয়ের পসরা সাজিয়ে বসেছিলেন। উত্সুক দর্শকরাও এসেছিলেন প্রচুর; বইয়ের বেচাকেনাও মন্দ ছিল না কিন্তু তাদের জন্য ছিল একটি রঙ্গতামাশাময় ইঙ্গিতধর্মী বিষয়ও। মেলার ভেতরে একটি গরু বেঁধে রেখে তার গায়ে লিখে রাখা হয়েছিল ‘আমি বই পড়ি না’। সরদার জয়েনউদ্দীন সাহেবের এই উদ্ভাবনা  দর্শকদের ভালোভাবেই গ্রন্থমনস্ক করে তুলেছিলেন বলে অনুমান করি।

এখানেই সরদার জয়েনউদ্দীন থেমে থাকেননি। ১৯৭২ সালে তিনি যখন গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক তখন ইউনেস্কো ওই বছরকে ‘আন্তর্জাতিক গ্রন্থবর্ষ’ হিসেবে ঘোষণা করে। গ্রন্থমেলায় আগ্রহী সরদার সাহেব এই আন্তর্জাতিক গ্রন্থবর্ষ উপলক্ষে ১৯৭২ সালে ডিসেম্বর মাসে বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে একটি আন্তর্জাতিক গ্রন্থমেলার আয়োজন করেন। এই মেলার পেছনেও ইউনেস্কের পৃষ্টপোষকতা এবং সহযোগিতা ছিল। মেলায় অংশগ্রহণ করেছিল ইউনেস্কো, ঢাকার কয়েকটি দূতাবাস, ভারতীয় কয়েকজন প্রকাশক এবং ফরাসি দূতাবাসের আমন্ত্রণে এসেছিলেন বিশিষ্ট লেখক, অনুবাদক লোকনাথ ভট্টাচার্য। সেই থেকেই বাংলা একাডেমিতে বইমেলার সূচনা।    (অংশ)

সূত্র: অমর একুশে (বইমেলা উপলক্ষে বাংলা একাডেমির স্মারকপত্র, ২০১৫)

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
১ ফেব্রুয়ারী, ২০২১ ইং
ফজর৫:২১
যোহর১২:১৩
আসর৪:০৯
মাগরিব৫:৪৮
এশা৭:০৩
সূর্যোদয় - ৬:৩৯সূর্যাস্ত - ০৫:৪৩
পড়ুন