শ্রোতাদের জন্যই গান করি এবং তারাই আমার গানের সমালোচক
১৬ অক্টোবর, ২০১৪ ইং
শ্রোতাদের জন্যই গান করি এবং তারাই আমার গানের সমালোচক
 ‘আজ এই বৃষ্টির কান্না দেখে’ কিংবা ‘জীবনানন্দ হয়ে সংসারে আজও আমি’—এমন বেশকিছু শ্রোতাপ্রিয় গানের শিল্পী ওস্তাদ নিয়াজ মোহাম্মদ চৌধুরী। উপমহাদেশের প্রখ্যাত এই রাগ সঙ্গীতশিল্পী গত ১৩ জানুয়ারি পা রেখেছেন ৬২-তে। নরসিংদীর সন্তান ওস্তাদ নিয়াজ মোহাম্মদ চৌধুরী সবসময়ই নিজেকে কেন যেন একটু আড়ালে রাখারই চেষ্টা করেছেন প্রফেশনালি গায়কী জীবনের শুরু থেকে। এর নির্দিষ্ট কোনো কারণও নেই। তিনি বলেন, ‘এটা কেন যেন হয়ে গেছে আমি নিজেও জানি না। আমি কখনোই প্রচারণায় যাইনি। কারণ আমার মনে হয়েছে আমার নিজের আসল জায়গা হচ্ছে সাধনা। এখানে ঠিক থাকলেই হয়তো সবই ঠিক থাকবে।’ ওস্তাদ নিয়াজ মোহাম্মদ চৌধুরীর মতো একজন শিল্পীর কারণেই আজ বাংলা গান এত সমৃদ্ধ। প্রতিনিয়ত তিনি তার নিজের হাতে গড়ে তুলছেন কিছু সুযোগ্য উত্তরসূরি। সেইসব উত্তরসূরি নিজেদেরকে গানে মনেপ্রাণে প্রতিষ্ঠিত করারও চেষ্টা করছেন। নিয়াজ মোহাম্মদ চৌধুরী তাদেরকে অনবরত সাধনা করে যেতে বলেন। জানার আর সাধনার কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করেন তিনি। গুণী এই সঙ্গীতশিল্পী এবারই প্রথম মুখোমুখি হয়ে অনেক কথা বলেছেন। সবসময়ই প্রচারণায় দীর্ঘ বিরতির কারণ আর তার ব্যক্তিজীবনের অনেক কথাই উঠে এসেছে তার সাথে আলাপচারিতায়। লিখেছেন নূপুর বন্দোপাধ্যায়

টেলিভিশন অনুষ্ঠানে একেবারেই আপনাকে দেখা যায় না। অথচ শ্রোতারা আপনার গান শুনতে চান। কিন্তু তারা আপনাকে টেলিভিশনে একেবারেই পান না। এর কারণ কী?

আমি কখনোই শ্রোতাদের চাহিদাকে কম গুরুত্বের চোখে দেখিনি। আমি সবসময়ই তাদেরকে আমার গানের সমালোচক হিসেবে সর্বোচ্চ আসনে দাঁড় করিয়েছি। সমালোচক হিসেবে তারা আমায় যে রায় দিয়েছেন আমি তা মাথা পেতে নিয়েছি এবং সেই সাথে তাদের ভালোবাসা নিয়েই আজও সাহস করে গান গেয়ে চলেছি। শ্রোতারা যদি আমার গানকে মূল্যায়ন না করতেন তাহলে হয়তোবা তাদের কাছাকাছি আমার পক্ষে পৌঁছানো সম্ভব ছিল না। যথাযথ সুযোগ পাই না বলে গানের অনুষ্ঠানে সেভাবে আমাকে দেখা যায় না। যদি সবকিছু আমার মনের মতো হয় তবে কেন টিভি অনুষ্ঠানে গাইব না! কিছু অনুষ্ঠানে কিন্তু গেয়েছিও কিছুদিন আগে।

ঈদের আগে স্পেশাল স্মাইল শোতে আপনাকে গাইতে দেখা গেছে, কেমন লেগেছে এই অনুষ্ঠানে গাইতে?

এই অনুষ্ঠানটির নির্মাতা খন্দকার ইসমাইল আমার অত্যন্ত স্নেহভাজন একজন। তার বিশেষ অনুরোধেই মূলত এই অনুষ্ঠানে গত ২৫ সেপ্টেম্বর আমার প্রিয় সাতটি গান গেয়েছি। আমাকে অনুষ্ঠানে গান গাওয়ানোর ব্যাপারে তার আন্তরিকতার কোনোই কমতি ছিল না, যে কারণেই মূলত আমি তার অনুষ্ঠানে গেয়েছি। আমার ব্যাপারে যে যথেষ্ট আন্তরিক থাকবে আমি কেন তার অনুষ্ঠানে গাইব না! তার পরের অনুষ্ঠান ‘ঈদের বাজনা বাজেরে’তেও আমি একটি গান গেয়েছি। সত্যি বলতে কী একজন শিল্পী তার প্রাপ্য সম্মানটুকু চায়, এর খুব বেশি কিছু নয়।

আপনার গানে হাতেখড়ি কার কাছে?

শৈশবে সঙ্গীতে আমার হাতেখড়ি হয় ওস্তাদ মরহুম মোহাম্মদ আয়াত উল্লার কাছে। সঙ্গীতে যখন মোটামুটি পারদর্শী হয়ে ওঠি ঠিক সে সময় আমার ওস্তাদ তার শিষ্যত্ব নিজ হাতে পাক-ভারত উপমহাদেশের পাটিয়ালা ঘরানার দিকপাল ওস্তাদ আমানত আলী খান ও ওস্তাদ ফতেহ আলী খান ভ্রাতৃদ্বয়ের কাছে তুলে দেন। কতটা উদার মনের পরিচয় দিয়েছেন তিনি, তা ভাবলে আমি আজও অবাক হই। কারণ সাধারণত এ কাজটি কোনো ওস্তাদ করেন না। এরপর দুই দিকপালের কাছেই সঙ্গীতের উপর সার্বিক শিক্ষা লাভ করি আমি।

আপনার জন্ম...

আমার জন্ম ১৯৫২ সালের ২৫ অক্টোবর। তবে সার্টিফিকেট অনুযায়ী আমার জন্ম ১৩ জানুয়ারি। গ্রামের বাড়ি নরসিংদীর শিবপুর থানার খৈনকুট গ্রামে। মা-বাবা আর ভাই-বোনদের সাথে কিছুটা সময় আমার সেখানে কেটেছে। মূলত ঢাকা শহরের ধুলোবালিতেই আমার বেড়ে ওঠা।

শিক্ষা জীবনের কথা জানতে চাচ্ছিলাম...

১৯৬৭ সালে ঢাকার বকশি বাজারের নবকুমার ইনস্টিটিউট থেকে এসএসসি, ১৯৬৯ সালে ঢাকা কলেজ থেকে এইচএসসি এবং ১৯৭১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করি আমি। বাংলাদেশ টেলিভিশনে ১৯৮৫ সালে প্রথমবারের মতো আমি কোনো লাইভ প্রোগ্রামে শ্রোতাদের গান গেয়ে শোনাই। ‘আমার যত গান’ শিরোনামের সে অনুষ্ঠানের উপস্থাপক ছিলেন প্রয়াত আবু হেনা মোস্তফা কামাল।

এই সময়ের গান সম্পর্কে যদি কিছু বলতেন...

এই উপমহাদেশে যারা গান লিখতেন তারাই সুর দিতেন। এতে গানের স্বকীয়তা বেরিয়ে আসত। ভালো ভালো গান তখন আমরা শুনতে পেতাম। কারণ তখন একজন গীতিকার তার মনের নিজস্ব ভাবনা থেকে যেমন গান লিখতেন, সুরও করতেন। কিন্তু এখন গান লিখেন একজন এক মনোভাব নিয়ে আর সুর করেন অন্যজন অন্য মনোভাব নিয়ে। ফলে ভালো কোনো গান তৈরি হচ্ছে না। আসলে আমাদের দেশে কোনো গীতিকারই নেই। যে ছন্দ বুঝে, গীত বুঝে তিনিই তো গীতিকার। শুধু গান লিখে গেলাম আর তাতেই গীতিকার হয়ে গেলাম—এতই যদি সহজ হতো তবে বাংলাদেশের প্রতিটি ঘরে ঘরে গীতিকার থাকত। আসলে কোনো কিছুই নিয়মের মধ্যে চলছে না। যদি মিডিয়ার কথাই বলি তাহলে বলতে হয় মিডিয়া কি সঠিক মানুষদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে? হচ্ছে না। যদি হতোই তবে সঙ্গীতসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমাদের যে ঐতিহ্য ছিল তা হারিয়ে যেত না। তবে কি আমরা ব্যর্থ? জানি এর সঠিক জবাব দেওয়ার সাহস কারোরই নেই। আসলে আমার অনেক কিছুই বলতে ইচ্ছে করে। কিন্তু বলি না। কারণ সময়টা এখন সত্যিই অনিয়ন্ত্রিত।

দেশের বাইরে প্রথম কোন দেশে গান গাইতে যান?

১৯৭৯ সালের কথা। সে বছরই আমি প্রথম সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়ায় যাই সঙ্গীত পরিবেশন করতে। এরপর থেকে এখন পর্যন্ত বহু দেশে গিয়েছি। নিজের দেশের গানকে, নিজের বাংলা ভাষার গানকে সম্মানের সাথে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি আমার গায়কী দিয়ে।

এ পর্যন্ত কতগুলো ছবিতে প্লে-ব্যাক করেছেন?

আমি প্রথম প্লে-ব্যাক করি এহতেশাম পরিচালিত ‘গীত কাহি সংগীত কাহি’ ছবিতে। এরপর আমি ‘নতুন বউ’, ‘দিওয়ানা’, ‘দেনা পাওনা’, ‘চকোরী’ ও ‘মিস সুন্দরী বাংলাদেশ’ ছবিতে প্লে-ব্যাক করি। এরপর বহুবার প্লে-ব্যাক করার যথেষ্ট সুযোগ এসেছে। কিন্তু আমার আর করা হয়ে উঠেনি। কেন হয়ে উঠেনি তার উত্তরে আপাতত যাব না। সেটা অন্য কোনোদিন বলব।

আপনার সর্বশেষ অ্যালবামটি প্রসঙ্গে জানতে চাচ্ছি।

সর্বশেষ গত বছরের শেষপ্রান্তে জি-সিরিজের ব্যানারে আমার নতুন অ্যালবাম ‘ওস্তাদ নিয়াজ মোহাম্মদ চৌধুরী’ প্রকাশ পায়। অ্যালবামে মোট নয়টি গান আছে, যার সবগুলোই আমার নিজের সুর করা। ছয়টি গান আমি নিজেই লিখেছি। বাকি তিনটি গান লিখেছেন মুন্শী ওয়াদুদ, মনিরুজ্জামান মনির ও ফয়সাল আহমেদ। নতুন অ্যালবামের গানগুলো হচ্ছে—ঝরঝর বৃষ্টি তুমি ঝরো না, ডেকো না পিছু ডেকো না, চলে গেছে যে, গভীর রাতে সূর্য খুঁজি, ফিরায়ে দিয়েছ ফিরে চলে যাই, হারানো দিনের স্মৃতি, যেও না গো তুমি, হূদয়ের কান্না শুনতে চেয়ো না, তুমি কি জানো না।

জীবনের এই সময়ে এসে সময়কে কীভাবে উপভোগ করছেন?

জীবনের এই সময়ে এসে আমার একমাত্র নাতনি ‘মানহা’র সাথে কাটানো সময়টুকুই আমি বেশি উপভোগ করি।

আপনার গানের প্রতি শ্রোতাদের ভালোবাসা বা চাহিদা কীভাবে দেখেন আপনি?

আমি কখনোই শ্রোতাদের চাহিদাকে কম গুরুত্বের চোখে দেখিনি। আমি সবসময়ই তাদেরকে আমার গানের সমালোচক হিসেবে সর্বোচ্চ আসনে দাঁড় করিয়েছি। সমালোচক হিসেবে তারা আমায় যে রায় দিয়েছেন আমি তা মাথা পেতে নিয়েছি এবং সেই সাথে তাদের ভালোবাসাকে সাথে করেই আজও মনে সাহস নিয়ে গান গেয়ে চলেছি। শ্রোতারা যদি আমার গানকে মূল্যায়ন না করতেন তাহলে হয়তোবা তাদের কাছাকাছি আমার পক্ষে পৌঁছানো সম্ভব ছিল না।

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
১৬ অক্টোবর, ২০২১ ইং
ফজর৪:৪১
যোহর১১:৪৫
আসর৩:৫৪
মাগরিব৫:৩৫
এশা৬:৪৭
সূর্যোদয় - ৫:৫৭সূর্যাস্ত - ০৫:৩০
পড়ুন