নির্মাণের জীবন্ত কিংবদন্তি
৩০ এপ্রিল, ২০১৫ ইং
নির্মাণের জীবন্ত কিংবদন্তি
 

সম্প্রতি বাংলাদেশ টেলিভিশনে আজগর আলীর প্রযোজনায় টিভি নাটক নির্মাণ ও প্রযোজনা নিয়ে ‘স্মৃতির মুকুরে’ শিরোনামের একটি অনুষ্ঠানে সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মুক্তিযোদ্ধা নাসির উদ্দিন ইউসুফ সাক্ষাত্কার দেন। সেই আলাপচারিতার চুম্বকীয় অংশ পাঠকদের জন্য তুলে ধরেছেন রাজু আলীম

বাংলাদেশ টেলিভিশনের যে দর্শক তৈরি হয়েছে বা বাংলাদেশে আজ যে ২৬টি চ্যানেল রয়েছে নানা কিছু দেখাচ্ছে—যেমন খবর দেখাচ্ছে, ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান দেখাচ্ছে। এই যে দর্শক তৈরি হয়েছে এটি কিন্তু এই বাংলাদেশ টেলিভিশনই শুরু করেছে। বাংলাদেশ টেলিভিশনের যে প্রথমদিকের পুরোধা ব্যক্তিগণ ছিলেন নাসির উদ্দিন ইউসুফ তাদের মধ্যে একজন। টেলিভিশনে এখন যারা দর্শক তারা অনেকেই হয়তো বিস্মিত হয়েছে, অনেকে হয়তো আপনার কথা জানেনই না আপনি বাংলাদেশ টেলিভিশনকে কী দিয়েছেন টেলিভিশনের প্রযোজক হিসেবে। এর জবাবে সদাহাস্য নাসির উদ্দিন ইউসুফ জানালেন, ‘হ্যাঁ কিছুটা সত্যি, আমি সর্বপ্রথম ১৯৭৩ সালে একটা অনুষ্ঠান করি। ১৯৭২ এ করেছি ছোট ছোট অনুষ্ঠান। হ্যা এটা মনে রাখা ভালো, বাংলাদেশ টেলিভিশনের প্রথম দিনের অনুষ্ঠানে একটা ঘোষণা পাঠ করেছি। এটা ছিল ১৭ ডিসেম্বর। ১৬ ডিসেম্বর দেশ স্বাধীন হয়েছে। ১৭ ডিসেম্বর আমরা টেলিভিশন ওপেন করলাম। অনেক বন্ধুরা—মিজান হায়দার, ফতেহ আলী, টিপু এবং আমাদের হাবিবুল আলম বীরপ্রতীক ও শাহাদাত্ চৌধুরীও ছিল। সেটা একটা পর্যায় ছিল। ১৯৭৩-এ আমি যে অনুষ্ঠানটি করি সেটা হলো ‘আমি কি ভুলিতে পারি’। এই অনুষ্ঠানে পাকিস্তান হানাদার বাহিনী কর্তৃক নির্যাতিত হয়েছেন, নিপীড়িত হয়েছেন, নিহত হয়েছেন অথবা নানাভাবে নিগৃহীত হয়েছেন, যাদের বাড়ি-ঘর পুড়েছে তাদের সাক্ষাত্কার নেওয়া হতো, তাদের নিয়ে আলাপচারিতা থাকত।’

নাটক নির্দেশনার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘১৯৭২-এর ডিসেম্বরে নাট্যচক্রের আহ্বানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তঃহল নাট্য প্রযোজিত হয়, যেখানে সেলিম আল দীনের ‘জন্ডিস ও বিবিধ ভাবে’ তার নির্দেশনায় প্রথম স্থান লাভ করে। এটা দিয়ে আমার নাটকের শুরু।’ 

নাট্যাচার্য সেলিম আল দীনের সাথে কাজ করা বা ওই সময়ের নাটকের প্রযোজনার কথা জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ভাঙ্গনের শব্দ শুনি’ সেলিম আল দীনের লেখা একটি ধারাবাহিক নাটক। তার আগে ছিল ‘আয়না’। ‘লাল মাটি কালো ধোঁয়া’। আসাদুজ্জামান নূরের প্রথম ধারাবাহিক। তারপরেরটা ছিল হুমায়ূন ফরীদির প্রথম ধারাবাহিক। আপনারা হয়তো বিস্মিত হবেন—  আমি ঝড়ের দৃশ্য কিভাবে স্টুডিওতে করলাম। তখন ফায়ার ব্রিগেডের হোস পাইপ দিয়ে পানি এনে, এফডিসি থেকে ব্লোয়ার এনে সেটের পিছন থেকে ধাক্কা দিয়ে সেট ভেঙে ক্যামেরায় ধারণ করতাম। তা আমার একার পক্ষে সম্ভব হয়নি। সেট ডিজাইনার থেকে শুরু করে আর্টিস্ট সবাই সহায়তা করেছিল।’

তাদের শুরুর সময়ে অর্থাত্ স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে ডাকসু অনেক সচল ছিল। তখন মঞ্চ থেকে টিভি নাটকে এলেই তারকা হয়ে যেত। তখন নাসির উদ্দিন ইউসুফ প্রযোজক ছিলেন। তখনকার সময়ের তারকাদের নিয়ে কাজ করার কথা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘১৯৭৮ সালে হুমায়ুন ফরীদি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। আমাকে সেলিম আল দীন নাটকের বিচারক হিসেবে নিয়ে গেছেন। আন্তঃহল নাট্য প্রতিযোগিতা। আমি দেখে বললাম এই ছেলে তো ভালো করতে পারবে। তারপর সে ঢাকা থিয়েটারে যোগদান করল। পরে তাকে আমি টেলিভিশনে আনি। এগুলো করতে হলে প্রথমে প্রতিভা থাকাটা খুব জরুরি। তারপর চর্চারও একটা ব্যাপার আছে। সেই সাথে পড়ালেখার খুব দরকার। সেই সময় যারা অভিনয় করে ভালো করেছেন আসাদুজ্জামান নূর, আলী জাকের, গোলাম মোস্তফা, রাইসুল ইসলাম আসাদ, আফজাল হোসেন, হুমায়ুন ফরীদি, পীযূষ বন্দোপাধ্যায় প্রমুখ। এছাড়া সুবর্ণা, শম্পা, শিমুল ওরাও ছিল।’

ধারাবাহিক নাটকের শুরুর বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আগে একটা সময় ছিল মানুষ দোকান, ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ করে টিভি দেখত। তখন একটা ধারাবাহিক দেখে ভালো লাগলে ওই ধারাবাহিক ছেড়ে কেউ উঠত না। ‘সংশপ্তক’ ধারাবাহিক হিসেবে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। পরবর্তীতে হুমায়ূন আহমেদ আসেন, তিনি ধারাবাহিকে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠেন। ‘রক্ত করবী’ মুস্তাফা মনোয়ারের প্রযোজনায় নির্মিত। তিনি বিশ্বমানের প্রযোজক। সেলিম আল দীন, আব্দুল্লাহ আল মামুন, হুমায়ূন আহমেদ, ইমদাদুল হক মিলনদের মতো কিছু মানুষ এবং প্রযোজকরাই টেলিভিশনের দর্শক তৈরি করেছিলেন।’

বাংলাদেশ টেলিভিশনের বিশ্ব নাটক বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সাঈদ আহমেদ নির্মাণ করতেন বিশ্ব নাটক। বিদেশি নাটকের ধরনগুলো নিয়ে টেলিভিশনের অনুষ্ঠানে বিদেশি মঞ্চ নাটকগুলো একটু অন্যরকমভাবে পরিবেশন করতেন কিছু কিছু অংশ। এটিও খুব জনপ্রিয় ছিল। আমরা যে বিভিন্ন খণ্ড নাটক, উপন্যাস থেকে নাটক, অনুষ্ঠানের কথা বলছি এগুলো বাংলাদেশের টিভি দর্শকদের রুচির উন্নয়নও ঘটিয়েছিল। মানুষের চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে। আমি বলব না বাংলাদেশে যে ২৬টি চ্যানেল এসেছে তারা খুব উন্নয়ন করেছে অথবা সবাই খুব ভালো কাজ করছে। হ্যাঁ মানুষের চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে, নতুনরা নতুনভাবে কাজ করছে। প্রতিদিন যদি ২৬টা চ্যানেলে ৫০-৬০টা নাটকও হয়ে থাকে এর মধ্যে ৫টা নাটক অবশ্যই ভালো হচ্ছে। এই ভালো হওয়ার কারণ অতীত ইতিহাস তাকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে (ভালো হতেই হবে)। অনেকেই ভেবে থাকে টেলিভিশন একটি ক্ষুদ্র কুটির শিল্প। কিন্তু তার এ ধারণা ভুল। এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। এটি একটি প্রতিষ্ঠানও বটে। তাই এখানে ভালো কাজ করা আবশ্যক হয়ে পড়েছে।

বাংলাদেশে ধারাবহিক নাটক জনপ্রিয় হওয়ার পেছনে অন্যতম ভূমিকা রয়েছে হুমায়ূন আহমেদের নাটকের। তখন ধারাবাহিকতার জোয়ার শুরু হয়। এ বিষয়ে তার অভিমত, ‘হুমায়ূন আহমেদের অনেকগুলো ধারাবাহিক নাটক ছিল। যেমন—‘অয়ময়’, ‘এইসব দিনরাত্রি’। চমত্কার সংলাপের বুনন তার এবং গল্প বলার এক নিজস্ব ভঙ্গি ছিল। এটি ছিল তার একটি চমত্কারিত্ব।’ মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ টেলিভিশনের প্রযোজক হিসেবে যোগদান করেন। সেই সময়কার মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে নাটক নির্মাণের কথা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে সেনাশাসন ছিল। তারপর ’৭৫-এর পরের প্রেক্ষাপটে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে অনুষ্ঠানগুলো তেমন উত্সাহিত হতো না। স্বাধীনতার বা বিজয়ের অনুষ্ঠানগুলো তখন ভালোভাবে কেউ গ্রহণ করত না। আমরা লিখিতভাবে তিরস্কৃত হয়েছি। আমরা মুক্তিযুদ্ধের শ্রেষ্ঠ সময়গুলো ওই কয় বছর টেলিভিশনে তুলে ধরতে পারিনি। এটা আমাদের জন্য খুব দুঃখজনক ছিল।’

একটা সময়ে তিনি প্রযোজনা থেকে ইস্তফা দেন। সেই বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, ‘আমি ১৯৮৩ সালে সিদ্ধান্ত নিই, আমি আর প্রযোজনা করব না। তখন স্বৈরশাসন চলছিল। আমি একজন সাংস্কৃতিক কর্মী হিসেবে বিভিন্ন সংগঠনের সাথে যোগদান করি। তখন আমার কর্মকর্তারা বলেছিল যেকোনো একটি কাজ তোমার করতে হবে। তাছাড়া আমি এত নিয়মকানুন মেনে কাজ করায় স্বস্তি পাচ্ছিলাম না। সেসময়ে সৃষ্টিশীল কাজের স্বাধীনতা পাচ্ছিলাম না। ১৯৮৪ সালের ১ জানুয়ারি আমি বাংলাদেশ টেলিভিশনকে বিদায় জানালাম।’

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
৩০ এপ্রিল, ২০২০ ইং
ফজর৪:০৪
যোহর১১:৫৬
আসর৪:৩২
মাগরিব৬:২৯
এশা৭:৪৭
সূর্যোদয় - ৫:২৫সূর্যাস্ত - ০৬:২৪
পড়ুন