গোলাপজান
প্রতিবাদী নারীর প্রতীক
৩০ এপ্রিল, ২০১৫ ইং
প্রতিবাদী নারীর প্রতীক
l পীযূষ সিকদার l

 

‘গোলাপজান’ থিয়েটার আর্ট ইউনিটের একটি বহুল আলোচিত এবং দর্শকনন্দিত নাটক। এস এম সোলায়মান নির্দেশিত যেকোনো নাটকই বলে দেয় এ মানুষটি থিয়েটারে ঘর বেঁধেছেন। তার আকাশস্পর্শী নাট্যভাবনা আমাদের মোহগ্রস্থ করে রাখে না, আমাদের ভাবায়! ভাবতে ভাবতে ঘরে ফিরি... এক অনন্য শিল্পদুয়ার খুলে যায় চোখের সামনে! আহা! এ মানুষটি যদি আর কিছুদিন বেঁচে থাকতেন! তাহলে আরো কত কত ভালো নাটক আমরা দেখতে পেতাম। পাল্টে যেত আজকের থিয়েটারের দৃশ্যপট। একই বৃত্তে ঘুরপাক খেতাম না আমরা! যদিও জানি, মানুষ বাঁচে তার কর্মে। তিনি নেই একথা একবারও মনে হয়নি তার ‘গোলাপজান’ দেখে দেখে। নাহলে গোলাপজানের আনন্দ-বেদনা সঙ্গীত হয়ে বাজে কেন কানে! গোলাপজানের জন্য কষ্ট হয় কেন আমার! ‘গোলাপজান গোলাপজান’ করে কেন আমার অতৃপ্ত আত্মা কেবলই গুমরে কাঁদে! গোলাপজান নামটি শুনলেই আমাদের বুঝতে কষ্ট হয় না বাবা-মা কত আদরে নামটি রেখেছিলেন! গোলাপের মতো সুন্দর এই মেয়েটি একদিন আমাদের এই পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থার যাঁতাকলে পিষ্ট হতে হতে সংগ্রাম করে করে পৃথিবী থেকে বিদায় নেয়। ‘গোলাপজান’ নাটকটি আদি ঢাকার জীবন-জীবিকার স্মৃতিভাণ্ডার থেকে উঠে আসা কাহিনি। ৬৫ বছরের  গোলাপজান আদি ঢাকার এক সাধারণ নারী। সেই নারী গোলাপজানের কণ্ঠ থেকে বেরিয়ে এসেছে তার শৈশব-কৈশোর, যৌবন থেকে পৌঢ়ত্বে পৌঁছানোর সংগ্রামী কাহিনি। বিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে ঢাকা শহরের শ্রমজীবী এক নারীর সংগ্রামী হয়ে উঠার গল্প ‘গোলাপজান’। তিরিশের দশকে আদি ঢাকার এক দরিদ্র পরিবারে তার জন্ম। শৈশব-কৈশোর গোলাপজানের কেটেছে আনন্দ-মধুরতায়। শৈশবেই তার বিয়ে হয়ে যায় ঘোড়ার গাড়ির এক কোচোয়ানের সঙ্গে। গাড়িটানা ঘোড়াটির নাম লালু। এই লালু তার কাছে সন্তানসম। লালুর সাথে মিলিয়ে গোলাপজান তার একমাত্র সন্তানের নাম রাখেন সালু। আসল নাম সালাউদ্দিন। লালু, সালু ও প্রিয়তম স্বামীকে নিয়েই তার জীবন। একদিন ঢাকার জনপ্রিয় ঘুড়ি ওড়ানোর প্রতিযোগিতা ‘সাকরাইন’-এ অংশ নিতে গিয়ে সালু ছাদ থেকে পড়ে আহত হয়। সালুকে বাঁচাতে তার সন্তানসম লালুকে বিক্রি করতে হয় জকি এরফানের কাছে। কিন্তু তারপরও সালুকে বাঁচাতে পারে না। গোলাপজান এ অবস্থায় দিশেহারা হয়ে পড়ে। এরমধ্যে ঢাকার চিত্র বদলাতে শুরু করে। নতুন প্রযুক্তির দোলা এসে লাগে ঢাকা শহরে। ঘোড়ার গাড়ির পরিবর্তে রিকশার প্রচলন হয়। ঘোড়ার গাড়ির কোচোয়ান রাতারাতি রূপান্তরিত হয় রিকশা চালকে। গোলাপজানের স্বামী রিকশা চালায়। একদিন গাড়ির ধাক্কায় তার স্বামী হারিয়ে ফেলে একটি পা। স্বামীর এই অবস্থায় সমস্ত পরিবারের বোঝা তার উপর চলে আসে। গোলাপজান আরেক জীবনে পা রাখে। রাষ্ট্র এবং সমাজের কাছে পরিত্যক্তা গোলাপজান হয়ে ওঠে জীবন সংগ্রামের প্রতীক। জীবনের প্রয়োজনে গোলাপজান ভেঙে ফেলে সমাজের আব্রু। নেমে আসে রাস্তায় ‘ঘুমনি’ বিক্রেতা পেশায়। সমাজের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে সামিল হয় সর্বহারা শ্রেণির কাতারে। এ সময় দ্রুত সমাজের প্রযুক্তি নির্ভরতা বাড়ে। অপার বিস্ময়ে গোলাপজান লক্ষ করে দ্রুততার সাথে বদলে যাচ্ছে ঢাকা শহরের সমাজ ও সামাজিক ব্যবস্থা। আর নষ্ট হচ্ছে মানুষের মূল্যবোধ। নব্য ধনপতিদের দৌরাত্ম্যে তার তিন পুরুষের অতি আপন ঢাকা তার কাছে অচেনা ঠেকে। তার জীবন বাঁধা পড়ে যায় সমাজপতিদের হাতে। একসময় হতাশ হয়ে পড়ে গোলাপজান। উন্নয়নের নামে চলে অবাধ ব্যবসা। গোলাপজান পিষ্ট হতে হতে মাটির সাথে মিশে যায়। পুলিশের হাতে উচ্ছেদ হয় তার রুটি-রুজির একমাত্র পেশা। পুলিশের পিটুনিতে আহত হয় পৌঢ়া এই নারী। সামাজিক অবিচারের বিরুদ্ধে ফেটে পড়ে পৌঢ়া এই নারী। মৃত্যুর পূর্বক্ষণ পর্যন্ত গোলাপজান আপসহীন সংগ্রাম করে গেছে। তাই তো গোলাপজান সাধারণ নারী হয়েও শ্রমজীবী মানুষের অসাধারণ সংগ্রামী নারীর প্রতীক হয়ে যায়। গোলাপজান চরিত্রে রোকেয়া রফিক বেবীর অসাধারণ অভিনয় নৈপুণ্যে টান টান দেহভাষ্যে, কী বচনে, কী সঙ্গীতে, কী চলায়, কী বলায়—সত্যিই এক অনন্য গোলাপজান সৃজন করে আমাদের নিয়ে গেছে অভিনয়ের অমৃতপাঠে। মঞ্চে মঞ্চে সে জ্বলুক দীর্ঘরজনী। অদৃশ্য হাতে অথবা অঙ্গুলি ইশারায় সেই বাজিকরের সুতার টানে টানে চলুক মঞ্চসৃজন গোলাপজানের। গোলাপজানের অঙ্গুলি ইশারায় থেমে যাক অসুরনৃত্য অথবা সে তাকালেই যেন শস্যদানায় ভরে উঠে পৃথিবী। বিভিন্ন চরিত্রে রূপদান করেছেন প্রশান্ত হালদার, চন্দন রেজা, সাইফ সুমন, সুজন, কামরুজ্জামান মিল্লাত, সাথী রঞ্জন, স্বাধীন শাহ্, আবুল হাসনাত প্রদীপ, আনিকা মাহিন, স্বর্ণা সরকার, মৌ এবং গোলাপজানের ভূমিকায় রোকেয়া রফিক বেবী।

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
৩০ এপ্রিল, ২০২০ ইং
ফজর৪:০৪
যোহর১১:৫৬
আসর৪:৩২
মাগরিব৬:২৯
এশা৭:৪৭
সূর্যোদয় - ৫:২৫সূর্যাস্ত - ০৬:২৪
পড়ুন