একজন জীবন্ত কিংবদন্তির গল্প
০১ ডিসেম্বর, ২০১৬ ইং
একজন জীবন্ত কিংবদন্তির গল্প
 

এদেশের মঞ্চ নাটক, টিভি নাটক ও চলচ্চিত্রাঙ্গন যাদের অভিনয়ে সমৃদ্ধ হয়েছে, তাদের অন্যতম একজন হলেন আরিফুল হক। বিগত পনের বছরেরও বেশি সময় ধরে তিনি সপরিবারে কানাডায় অবস্থান করলেও মাঝে মাঝে মনের টানেই দেশের মাটিতে ছুটে আসেন। পুরোনো স্মৃতির সঙ্গে নিজেকে মিলিয়ে নেওয়ার এ যেন এক অভিলাষ তার। গত ১৫ নভেম্বর আবার পাঁচ বছর পর দেশে ফিরেছেন গুণী এই সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। তার সঙ্গে কথা বলে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছেন অভি মঈনুদ্দীন

কথায় কথায় আরিফুল হক এখন প্রায়ই বলেন, ‘আর মায়ায় জড়াতে চাই না, কারণ জানি না আর দেখা হবে কিনা এদেশের মানুষের সঙ্গে। এদেশের মাটির ধুলোর পথে আর হাঁটা হবে কিনা জানা নেই। এদেশের দর্শকদের জন্য অভিনয় করা হবে কিনা তাও জানা নেই। তাই দেশে ফিরলে এমন ভাবনায় কেঁদে ওঠে মন। মানুষ হয়ে এসেছি পৃথিবীতে, জানি চলে যেতে হবেই একদিন। কিন্তু বয়স, সময়—সবমিলিয়ে যখন বারবার জানান দেয় চলে যাওয়ার সময় এসেছে, তখন আর মন চায় না এই পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে সবাইকে ছেড়ে চলে যেতে। বারবার সেই প্রিয় মুখগুলোর কাছেই থেকে যেতে মন চায়।’ ৮৫ বছর পেরিয়ে যাওয়া বর্ষীয়াণ অভিনেতা আরিফুল হকের এই মুহূর্তের জীবনের উপলব্ধি যেন ঠিক এমনই। একজন আরিফুল হকের অভিনয়ে দর্শক হেসেছেন, তার অভিনীত চরিত্রের গভীরে দর্শক প্রবেশ করে কেঁদেছেন, আবার তার অভিনীত খলচরিত্রগুলো দর্শককে ভাবিয়ে তুলেছে যে তিনি এমন চরিত্রেও অভিনয় করতে পারেন! একজন সত্যিকারের পরিপূর্ণ অভিনেতার সফলতা এখানেই, যখন তিনি বহুমাত্রিক চরিত্রে অভিনয় করতে পারেন। প্রশ্ন রাখি, বেশ কিছু চলচ্চিত্রে আপনি খলচরিত্রে অভিনয় করেছেন, যেমন ‘সারেং বউ’, ‘সুন্দরী’। সেসব চরিত্রে অভিনয় করে নিন্দিতও হয়েছেন। এ বিষয়টা কী আপনাকে পীড়া দিত কখনো? জবাবে আরিফুল হক বলেন, ‘না, কখনোই পীড়া দিত না। কারণ, আমি কমেডি চরিত্রে যেমন অভিনয় করেছি, ঠিক তেমনি খুব ভালো মানুষের চরিত্রেও অভিনয় করেছি; আবার পাশাপাশি মন্দ লোকের চরিত্রে অভিনয় করেছি। একজন অভিনেতা হিসেবে বহুমাত্রিক চরিত্রে অভিনয় করেই আমি নিজেকে জাত অভিনেতাতে পরিণত করার চেষ্টা করেছি। এখনো বারবার মনে হয়, মনের মতো কোনো চরিত্রে অভিনয় করার সুযোগ আসেনি, নিজের অভিনয়কে পুরোপুরি দেখানোর সুযোগ পাইনি আমি। যদি আবার অভিনয় করতে পারতাম, তাহলে হয়তো তৃপ্ত হতাম।’ গত ১৫ নভেম্বর তিনি পাঁচ বছর পর আবার ঢাকায় এসেছেন। মাত্র ১৭ দিনের সফরে। আবার তার বর্তমান আবাসস্থল কানাডায় ফিরে যাবেন তিনি আসছে ২ ডিসেম্বর। এবার তার সঙ্গে তার স্ত্রী ও দুই ছেলেমেয়েও এসেছেন। আরিফুল হক বলেন, ‘এবার একেবারেই পারিবারিক কাজে এসেছি। তাই ইচ্ছে থাকলেও কারো সঙ্গে দেখা করার তেমন কোনো সুযোগ ছিল না। তাছাড়া আমার কাছে অনেকের সঙ্গে যোগাযোগ করার ফোন নম্বরও নেই যে দেশে ফিরে খোঁজ নেব। যে কারণে অনেকের সঙ্গে দেখা না হয়েই আবার কানাডায় ফিরে যেতে হবে।’ আরিফুল হক জানান, বয়স ৮৫ পেরিয়ে গেলেও এখনো ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে অভিনয় করার প্রবল ইচ্ছে রয়েছে। কিন্তু এবারের সফরে অভিনয় করার তেমন কোনো সুযোগ থাকছে না। শুধু চ্যানেল আইতে গত ২৬ নভেম্বর বেলা ১২টা ৩০ মিনিটে অনন্যা রুমার প্রযোজনায় ‘তারকা কথন’ অনুষ্ঠানে তিনি অংশগ্রহণ করতে পেরেছেন। সেখানে তার সঙ্গে ছিলেন তারই হাত ধরে অভিনয় জগতে পা রাখা দর্শকপ্রিয় অভিনেত্রী মুনিরা ইউসুফ মেমী। চ্যানেল আইয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার আগেই মেকআপ রুমে দেখা হয় মেমীর সঙ্গে। বহুদিন পর মেমীকে দেখে আরিফুল হকের চোখ যেন ছলছল করে ওঠে। স্নেহভাজন মেমীকে বুকে জড়িয়ে নেন তিনি। আরিফুল হক বলেন, ‘একজন অভিনেত্রী হওয়ার জন্য সেই সময়ে মেমী কত কষ্ট করেছে! অভিনয়ের প্রতি তার অদম্য ভালোলাগা, একনিষ্ঠতাই তাকে আজ একজন ভালো অভিনেত্রীতে পরিণত করেছে। তার জন্য সবসময়ই আমি দোয়া করি। হঠাত্ মেমীর সঙ্গে দেখা হয়ে খুব ভালো লাগছে।’ গুণী এই চলচ্চিত্রাভিনেতা সর্বশেষ একেএম ফিরোজ বাবু পরিচালিত ‘প্রেম বিষাদ’ এবং প্রয়াত খালিদ মাহমুদ মিঠু পরিচালিত ‘গহীনে’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। আরিফুল হক প্রসঙ্গে চিত্রনায়ক আরজু বলেন, ‘তিনি আমার বাবার চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন ‘প্রেম বিষাদ’ চলচ্চিত্রে। আমার ভীষণ ভালোলাগা এই যে, আমার প্রিয় নায়ক সালমান শাহ যার সঙ্গে অভিনয় করেছিলেন, আমিও তারই সঙ্গে অভিনয় করতে পেরেছি। তার কাছে সালমান ভাইয়ার গল্প শুনেছি। আরিফুল হক আঙ্কেলের জন্য অনেক শ্রদ্ধা, ভালোবাসা। তিনি যেন সবসময় সুস্থ থাকেন, ভালো থাকেন।’ আরিফুল হক জীবনের প্রয়োজেনই ২০০০ সালে সপরিবারে কানাডায় স্থায়ী হন। ২০১২ সালের শুরুতে তিনি সর্বশেষ দেশে এসেছিলেন। প্রয়াত আতিকুল হক চৌধুরীর নির্দেশনায় একুশে ফেব্রুয়ারির একটি নাটকে অভিনয়ের পর দর্শকের কাছ থেকে ব্যাপক সাড়া পান তিনি। উত্তম কুমারের সঙ্গে ‘উত্তরায়ণ’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছিলেন তিনি। এটি নির্মাণ করেছিলেন বিভূতি লাহা। বাংলাদেশে একমাত্র তিনিই সেই অভিনেতা, যিনি উত্তমকুারের সঙ্গে একই চলচ্চিত্রে একই ফ্রেমে অভিনয় করার সুযোগ পেয়েছিলেন। আরিফুল হক অভিনীত উল্লে­খযোগ্য চলচ্চিত্রগুলো হলো ‘লালন ফকির’, ‘সারেং বউ’, ‘বড় বাড়ির মেয়ে’, ‘সূর্য কন্যা’, ‘সুন্দরী’, ‘সখি তুমি কার’, ‘কথা দিলাম’, ‘নতুন বউ’, ‘এখনই সময়’, ‘পিতা মাতা সন্তান’, ‘তোমাকে চাই’ ‘দেশপ্রেমিক’, ‘ঘৃণা’, ‘স্বপ্নের নায়ক’ ইত্যাদি। ছোটবেলায় নিজেকে একজন সংগীতশিল্পী হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন আরিফুল হক। তাই সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি তিনি কলকাতার ‘দক্ষিণী’ সংগীত বিদ্যালয় থেকে রবীন্দ্রসংগীতের উপর চার বছরের ডিপ্লে­ামা কোর্সও সম্পন্ন করেন। উচ্চাঙ্গ সংগীতে তালিম নিয়েছিলেন বিভিন্ন ওস্তাদের কাছ থেকে। নজরুলসংগীতে তালিম নিয়েছিলেন তিনি মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের কাকার কাছে। ১৯৬৪ সালে ঢাকায় চলে আসেন। এখানে এসেও স্বপ্ন ছিল নিজেকে সংগীতশিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার। কিন্তু অডিশন দেওয়ার পর নানা জটিলতার কারণে তা আর হলো না। একসময় টেলিভিশনে অভিনয়ের সুযোগ আসে। এরপর থেকে অভিনয়েই নিজেকে জড়িয়ে নেন সরকারি চাকরি করার পাশাপাশি। প্রশ্ন রাখি, টিভি নাটক কিংবা চলচ্চিত্র নির্দেশনা দিয়েছেন কী? জবাবে আরিফুল হক বলেন, ‘সে সুযোগ হয়নি আর এ জীবনে। তবে ভারতবর্ষে এবং বাংলাদেশে বেশ কয়েকটি মঞ্চ নাটকের নির্দেশনা দিয়েছি আমি। ঢাকার মঞ্চে ‘থিয়েটার আরামবাগ’ নাট্যদল থেকে ‘জমিদার দর্পণ’, ‘ক্ষত বিক্ষত’ নাটকের যেমন নির্দেশনা দিয়েছি, ঠিক তেমনি ভারতবর্ষে শরত্চন্দ্রের ‘মহেষ’ আমার নাট্যরূপ এবং নির্দেশনায় বহুবার মঞ্চস্থ হয়েছে।’ দেশের বাইরে থেকে দেশকে খুব মিস করেন তিনি প্রতিমুহূর্তে। কাল আবারও কানাডার উদ্দেশে উড়াল দিবেন তিনি। যাওয়ার আগে ইত্তেফাককে বললেন আরিফুল হক, ‘দেশের সংস্কৃতির সঙ্গে আমার সম্পর্কটা ছিল আত্মার। কিন্তু এখান থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে এখন কানাডায় অবস্থান করছি—এটা এই বয়সে এসে মনকে খুউব উতলা করে ফেলে। প্রায়ই নির্জনে একা একা বসে ভাবি, যদি আবার ওই জগতটাতে ফিরে আসতে পারতাম—এই অভিলাষটুকু মনের মধ্যে বারবার কাজ করে। সবাই আমার জন্য দোয়া করবেন যাতে আমি ভালো থাকি, সুস্থ থাকি। আপনারাও ভালো থাকবেন।’

ছবি মোহসীন আহমেদ কাওছার

 

 

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
১ নভেম্বর, ২০২১ ইং
ফজর৫:০৪
যোহর১১:৪৮
আসর৩:৩৫
মাগরিব৫:১৪
এশা৬:৩১
সূর্যোদয় - ৬:২৪সূর্যাস্ত - ০৫:০৯
পড়ুন