নারীর করুণ পরিণতির সুন্দর উপস্থাপন
কমলা সুন্দরীর কিস্সা
২১ ডিসেম্বর, ২০১৭ ইং
কমলা সুন্দরীর কিস্সা
মাহবুব আলম

 

যুগে যুগে নারী অবহেলিত, নিপীড়িত ও নির্যাতিত। সুপ্রাচীনকাল থেকেই নারীর এই হেনস্থা কবি, সাহিত্যিক ও নাট্যকাররা তাদের গল্প, কবিতা ও নাটকে সুনিপুণভাবে তুলে ধরেছেন। কিন্তু তাতে কী? নারীর অবস্থানগত কোনো পরিবর্তন কি আমরা দেখতে পাই বা পাচ্ছি। বোধ করি আজও নারী সেই আগের দিনের মতোই নির্যাতিত। যুগ পাল্টে গেছে সেই সঙ্গে পাল্টে গেছে নির্যাতনের ধরন। আজও সাংসারিক নানা ছুত্ ছলনায় নারীকে নির্যাতনের শিকার হতে হয় এবং হচ্ছে। এ থেকে উত্তরণের কোনো পথ আজও আবিষ্কৃত হয়নি বা আমাদের সমাজের সুশীলরা উত্তরণের কোনো পথ বাতলে দিতেও পারেননি। তাহলে প্রশ্ন হলো নারী কি এভাবেই নির্যাতিত হতে থাকবে? কোথায় সমস্যা? এমন প্রশ্নের কোনো উত্তর দিতে পারে না কেউই। এমন কি গণায়ন নাট্যসম্প্রদায়ের ৩২তম প্রযোজনা ‘কমলা সুন্দরীর কিস্সা’-তেও এর কোনো সমাধান দেখতে পাওয়া যায় না। অবশ্য নাটকের কাজ সমস্যা সামাজিকগণের চোখের সামনে তুলে ধরা, এর কোনো সমাধান বাতলে দেওয়া নয়।

‘কমলা রানি সাগরদীঘি’ একটি সুপ্রাচীন প্রচলিত লোকগাথা। আমাদের দেশের নেত্রকোণা জেলার সোমেশ্বরী নদীর কোল ঘেঁষে খনন করা একটি দীর্ঘ দীঘি খননের কাহিনি এটি। সংগৃহীত এই লোকগাথাটি নির্দেশনা দিয়েছেন বাপ্পা চৌধুরী। নাটকের নামকরণেই বুঝা যায় এর প্রয়োগ ধরন কেমন হবে? নির্দেশক ঠিক সেভাবেই নাটকের নির্মাণ করেছেন অতি সূক্ষ্ম বুননে। একেকটি দৃশ্যায়ন যেন একেকটি ছবির মতো মনে হচ্ছিল। নাটক তো তাই গল্পের জীবন্ত ছবি। নির্দেশক বাপ্পা চৌধুরী সিদ্ধতার সঙ্গে গল্পে প্রাণের সঞ্চার করতে পেরেছেন। অবশ্য সেই প্রাণের অন্যতম প্রায়োগিক কারিগর নাটকের প্রাণ চরিত্র গায়েন ধর্মরাজ তঞ্চঙ্গ্যা। কি অসাধারণ তার গায়কী আর অভিনয়! নিখুঁত অভিনয় আর নাচে গানে মাতিয়ে গেলেন ঢাকার মঞ্চ। মঞ্চ নাটকে এমন শিল্পী এখন খুব কমই চোখে পড়ে। প্রতিটি দৃশ্যই প্রাণবন্ত করে তুলেছেন তিনি। কিন্তু অপর দিকে নাটকের ধর্মরাজ চরিত্রে তৌহিদ হাসান ইকবালের অভিনয় কিছুটা মোনোটোনাস লাগছিল, যাকে আমরা বলে থাকি একঘেঁয়ে। শুরু থেকেই তার উত্তেজিত এক রোখা অভিনয় বা চরিত্র নির্মাণ দর্শক হিসেবে নিজের কাছে যুক্তিযুক্ত মনে হয়নি। চরিত্রটি নিয়ে তিনি ভিন্নভাবেও ভাবতে পারেন। সেক্ষেত্রে নাটকের সৌন্দর্য বাড়বে বৈ কমবে না আশা করি। নাটকের অন্যতম প্রধান চরিত্র কমলা সুন্দরীও ভালো অভিনয় করেছেন। তার অভিনয়ের কিছু কিছু অংশ বেশ প্রাঞ্জল মনে হলেও সন্তান জন্ম দেওয়ার পরের কিছু অংশে অভিনয় আরও জীবনঘনিষ্ঠ হলে ভালো লাগত। কিন্তু ঘুরে ফিরে সেই গায়েনের ওপর ভর করেই গোটা নাটক মনোমুগ্ধকর মনে হলো। নাটকের সংগীত অত্যন্ত শ্রুতিমধুর হয়েছে, আর কোরিওগ্রাফি ও আলোক পরিকল্পনা হয়েছে দৃষ্টিনন্দন!

‘কমলা সুন্দরীর কিস্সা’ একটি বিয়োগান্তক আখ্যান। প্রচলিত এই লোকগাথায় পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় নারীর করুণ পরিণতির কথাই সুন্দর উপস্থাপনার মধ্যে দিয়ে চিত্রিত হয়েছে মঞ্চে। যাই হোক ফেলে আসা সেই কথা বলি—ধর্মরাজ তার মায়ের কথায় রাজি হয় বিয়ে করতে। অনেক খোঁজাখুঁজির পর পাওয়া যায় এক অপরূপ নারীকে। নাম তার কমলা সুন্দরী। সাত ভাইয়ের একমাত্র আদরের বোন কমলা। ভাইয়েরা এমন পাত্রের সন্ধানে আপ্লুত। বিয়েতে রাজি হয়ে যায় তারা। কিন্তু বিয়ের রাতেই সুন্দরী কমলাকে তার স্বামীর কাছে দিতে হয় এক পরীক্ষা। স্বামীর সঙ্গে তাকে পাশা খেলতে হয়। কমলা পাশা খেলতে রাজি হয়। ধর্মরাজ কমলাকে শর্ত দেয় যদি সে নিজে পাশা খেলায় হেরে যায় তাহলে তার স্ত্রীকে ছেড়ে বাইরের ঘরে তিন রাত্রি যাপন করবে আর যদি কমলা হেরে যায় তাহলে তাকে বাপের বাড়ি ফিরে যেতে হবে। ভাগ্যের উপরে নির্ভর করে কমলার সম্মান। পাশা খেলায় হেরে যায় ধর্মরাজ। পরে স্বামীকে অনুরোধ করে বাসর ঘরে রাত্রি যাপন করে কমলা ও ধর্মরাজ। সুখের সংসার বেশ ভালোই কাটছিল, কিন্তু পরীর রাজ্য থেকে একদল পরী আসে বেড়াতে। তারা কমলাকে দেখে মুগ্ধ হয়ে যায়। নিজেদের খেলার সাথি বাড়ানো আর কালরাজের সঙ্গী বৃদ্ধির জন্য তারা কমলাকে নিয়ে যেতে চায়। কমলা ততদিনে গর্ভবতী। গর্ভবতী কমলাকে তারা নিয়ে যেতে পারে না কিন্তু কালরাজ তাকে পেতে চায়। অপেক্ষা করে সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়া পর্যন্ত। পরীদেরকে নির্দেশ দেয় ধর্মরাজকে স্বপ্ন দেখানোর। পরী এসে ধর্মরাজকে স্বপ্ন দেখায়। স্বপ্ন মতে ধর্মরাজ আবার কমলার সঙ্গে পাশা খেলতে চায়, কিন্তু সন্তানসম্ভবা নারীর বেহাল শরীরের দশা। কী করে সে পাশা খেলবে! সে নানা অনুনয়-বিনয় করে ধর্মরাজের কাছে, কিন্তু অত্যাচারী ধর্মরাজ অনড়। পরে পাশা খেলার শর্তে ধর্মরাজ তার ষাট কুড়া জমির উপরে দীঘি খনন করে। দীঘিতে পানি ওঠে না। বিচলিত হয়ে পড়ে ধর্মরাজ। আবার স্বপ্নদৃষ্ট হয় তার স্ত্রীর চুল ভেজানো পানি যদি দীঘিতে পড়ে তাহলেই পানি উঠবে। স্বামীর অত্যাচারের কাছে মাথা নত করে কমলা। রাজি হয় দীঘিতে কলসি নিয়ে নামতে। কমলা দীঘিতে নামে—দীঘিতে পানি ওঠে কিন্তু কমলা আর উঠে আসে না। যুগযুগান্তরে কমলা রানি হয়ে থাকে লোককথা।

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
২১ নভেম্বর, ২০২১ ইং
ফজর৫:১৬
যোহর১১:৫৭
আসর৩:৪১
মাগরিব৫:২০
এশা৬:৩৭
সূর্যোদয় - ৬:৩৬সূর্যাস্ত - ০৫:১৫
পড়ুন