আত্মীক চেতনায় উদ্ভাসিত শিল্পী
২১ ডিসেম্বর, ২০১৭ ইং
আত্মীক চেতনায় উদ্ভাসিত শিল্পী
দেলোয়ার আরজুদা শরফ

 

সময়টা ছিল ২০০৬ সাল। ‘আমি একটা জিন্দা লাশ/কাটিসনারে জংলার বাঁশ/আমার লাইগা সাড়ে তিন হাত কবর খুঁড়িস না/ আমি পিরিতের অনলে পোড়া মরার পরে আমায় পুড়িস না...।’ এই গানটি দিয়েই বারী সিদ্দিকীর (শ্রদ্ধেয় বারী ভাই) সঙ্গে আমার গানের যাত্রা শুরু হয়েছিল। এই গান ছিল তাঁর সুরে আমার লেখা প্রথম গান। মরার আগে যে মরে আর পোড়ার আগে যে পুড়ে, সে তো জিন্দা মড়া; তাঁকে আর কবর দিয়েই কী হবে! পোড়ারে আর চিতায় পুড়িয়েই বা কী হবে! গানটিতে এমন দর্শন বারী ভাইকে দারুণভাবে আন্দোলিত করেছিল। তিনি গানের বাণীর গভীরে ডুবে গেলেন আর যে সুর করলেন! এখন আমার চেয়ে সবাই তা ভালো জানেন। আমার সঙ্গে দেখা হলে গানটি প্রসঙ্গে প্রায়ই বলতেন, ‘দেলোয়ার তোমার লেখা জিন্দা লাশ গানটি হাজার বছর বেঁচে থাকবে।’ শুনে শ্রদ্ধায় কৃতজ্ঞতায় আমার চোখে জল চলে আসত, পা ছুঁয়ে সালাম করতে গেলে বুকে টেনে নিতেন। আমার লেখা সহস্রাধিক গানে বাঁশি বাজিয়েছেন তিনি। ৩০টিরও বেশি গানে সুরারোপ ও কণ্ঠ দিয়েছিলেন। তার সর্বশেষ অ্যালবাম ‘নিষিদ্ধ মানুষ’-এর সবকটি গানই আমার লেখা ছিল। এরপরে নতুন আরেকটি অ্যালবামের গান লেখা ও সুরের কাজ চলছিল। এ কাজটি করতে গিয়ে আমি এই গুণী মানুষটিকে খুব কাছে থেকে বোঝার ও জানার চেষ্টা করেছি। আমাকে তাঁর খুব কাছে টেনে নিয়েছিলেন। অবাক হয়ে লক্ষ করছিলাম, তিনি যখন গান সুর করছিলেন এবং হারমোনিয়াম বাজিয়ে গাইছিলেন—কণ্ঠের মধ্যে যেন তারুণ্য ফিরে এসেছে, চেহারায় ছিল পবিত্রতার আভা।

কিন্তু এত তাড়াতাড়ি সব শেষ হয়ে যাবে ভুলেও ভাবতে পারিনি। এত আলোর পিছনে এত গভীর অন্ধকার লুকিয়ে ছিল তা বুঝতে পারিনি। আমার লেখা ৪টি গান সুর করেছিলেন। স্টুডিওতে এসে গানগুলো আর নামানো হলো না তাঁর।

একদিনের একটি ঘটনা মনে পড়ে গেল। সকাল ১১টায় বারী ভাইয়ের বাসায় পৌঁছলাম, উদ্দেশ্য নতুন গানের সুর করা। তিনি হারমোনিয়াম নিয়ে বসলেন। আমি পাশে বসলাম। কী লিখেছ শোনাও? আমি গানের মুখরা পড়ে শোনালাম, ‘এক ফোঁটা জল দেখে ডরে/কাঁপে এ অন্তর/দয়াল আমার পিপীলিকার ঘর...’।

অনেকক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, ‘খুব ভালো লিখেছ!’ ডুব দিলেন সুরের সমুদ্রে। অসাধারণ একটি সুর করলেন। বললেন, ‘পুরো গানটা লিখে শেষ করো সামনের রবিবার চ্যানেল আইতে গানটি করব।’ ঠিকই তিনি গানটি চ্যানেল আইতে লাইভে করেছিলেন। এই গানটিই ছিল আমার লেখা বারী ভাইয়ের শেষ সুরারোপিত গান।

আত্মীক চেতনায় উদ্ভাসিত ছিলেন তিনি। পরম প্রভুতে গভীর বিশ্বাস ছিল তাঁর। বাউলদর্শন, আধ্যাত্মবোধ মরমীবাদ ও সুফিবাদ; অর্থাত্ আকর্ষণ মায়া প্রেম বিশ্বাস আরাধনা তীব্র আকাঙ্ক্ষা ও পরম প্রভুতে বিলীন হওয়ার চিরন্তন আকুতিই ছিল সুর সাধক বারী সিদ্দিকীর। পরম প্রভুকে সুর সাধনার মাধ্যমে স্মরণ এবং দৃশ্যমান ও অদৃশ্য জগতের বস্তুকে অনুসন্ধিত্সু মন নিয়ে অনুসন্ধানের নিরন্তর চেষ্টা ছিল এই মানুষটির। বিশুদ্ধ দেহ-মন-আত্মা ছাড়া কখনোই পরম প্রভুর সান্নিধ্যলাভ সম্ভব নয়। জৈবিক চেতনায় লীন হয়ে প্রভু দর্শন এ যেন গহীন অন্ধকারের আয়নায় নিজের মুখ দর্শনের ব্যর্থ চেষ্টা। তাই তিনি নিজেকে খুঁজে বেড়িয়েছেন নিজের ভিতরে, ডুব দিতে চেয়েছেন আত্মার অতল গহীনে। গানের বাণী সুরে ও গায়কীতে তাঁরই প্রকাশ ছিল।

সংগীতই ছিল তাঁর একমাত্র ধ্যান ও জ্ঞান। সুরের বারি দিয়ে কলুষিত আত্মাকে ধুয়ে মুছে পবিত্র করাই তাঁর লক্ষ্য ছিল। একটি গাছ যেমন বারি ব্যতীত নির্জীব থাকে, ঠিক তেমনি বারী সিদ্দিকী তাঁর সুরের বারি দিয়ে নির্জীব চিত্তকে সজীব করে তুলতেন। বারী সিদ্দিকী তাঁর সুরের ইন্দ্রজালে গভীর প্রেমে হূদয়কে আক্রান্ত করতেন। তাঁর জাদুকরী বাঁশির সুরে শুধু যে নিজে হারিয়ে যেতেন তা নয়, অন্যদেরও নিয়ে যেতেন সুরের এক মায়া জগতে। বিমুগ্ধতায় গভীর মৌনতায় বিভোর করে রাখতেন সবাইকে ।

বাউল সুর ও ক্লাসিক্যাল সুরের সংমিশ্রণে আধুনিক বাংলা ফোক গানে এক নতুন ধারা সৃষ্টি করেছিলেন তিনি। সাধারণ শ্রোতাদর্শকও তাঁর সুর মনেপ্রাণে গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর সুর করা গান শুধু যে তিনিই গেয়েছেন এমনটি নয়, বাংলাদেশের অনেক জনপ্রিয় কণ্ঠশিল্পীরাও গেয়েছেন। তাঁর গানের সুরে যে আবেগ ঢালতেন তার দ্যুতি মানুষের হূদয়ে খুব সহজেই প্রবেশ করত। তিনি সুর স্রষ্টা হয়ে উঠলেন। হয়ে উঠলেন বারী সিদ্দিকী।

বাংলা গান যতদিন থাকবেন বারী সিদ্দিকীও ততদিন থাকবেন যুগের পর যুগ প্রজন্মের পর প্রজন্মের হূদয়ে অনুপ্ররণায়, ভালোবাসায় ও গভীর শ্রদ্ধায়।

লেখক গীতিকবি

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
২১ নভেম্বর, ২০২১ ইং
ফজর৫:১৬
যোহর১১:৫৭
আসর৩:৪১
মাগরিব৫:২০
এশা৬:৩৭
সূর্যোদয় - ৬:৩৬সূর্যাস্ত - ০৫:১৫
পড়ুন