এরদোয়ানের আনলাকি থার্টিন
তালেব রানা১৫ জুন, ২০১৫ ইং
এরদোয়ানের আনলাকি থার্টিন
 

তুরস্কের পার্লামেন্ট নির্বাচনে বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের ক্ষমতাসীন দল জাস্টিস অ্যান্ড ডেভলপমেন্ট পার্টি (একেপি)। দীর্ঘদিন পর নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারিয়েছে তারা। একেপি নির্বাচনে মোট ৪১ শতাংশ ভোট পেয়েছে। কুর্দিশ সমর্থক দেশটির বামপন্থি দল এইচডিপি প্রথমবারের মতো ১০ শতাংশ ভোট পেয়ে সংসদে উল্লেখযোগ্য আসন পেলো। দীর্ঘ ১৩ বছর পর নির্বাচনের এমন ফলের কারণে সরকার গঠন করাও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে একেপির জন্য। সরকার গড়তে একেপিকে অন্য রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জোট করতে হবে। অথচ এবারের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারলে দেশটির সংবিধানে পরিবর্তন আনতে পারতেন রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান। মূলত রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রেসিডেন্ট শাসিত করার পরিকল্পনা ছিলো এরদোয়ানের। কিন্তু গত সপ্তাহের নির্বাচনে অপ্রত্যাশিত ফলাফলে তাঁর পরিকল্পনা অনেকটাই ভেস্তে যেতে বসেছে। অর্থাত্ শাসনের ১৩তম বছর সত্যিকার অর্থেই ‘আনলাকি’ হয়ে উঠেছে প্রবল প্রতাপশালী এরদোয়ানের জন্য।

নির্বাচনে ৫৫০ আসনের পার্লামেন্টে একেপি পেয়েছে ২৫৮টি। রিপাবলিকান পিপলস পার্টি (সিএইচপি) ১৩২ এবং ন্যাশনালিস্ট মুভমেন্ট পার্টি ও এইচডিপি ৮০টি করে আসনে জয়ী হয়েছে। ফলাফল প্রকাশের পর ইতিমধ্যেই নতুন সরকার গঠনের জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান। বৃহস্পতিবার টেলিভিশনে সমপ্রচারিত এ বক্তব্যে তিনি বলেন, সাংবিধানিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করে শিগগিরই একটি সরকার গঠন করতে হবে। এজন্য প্রত্যেকেরই নিজ নিজ অহংবোধ উপেক্ষা করে তত্পর হওয়া উচিত। আর তুর্কি প্রধানমন্ত্রী আহমেত দাভুতোগলু মন্তব্য করেন, জোট সরকার তুরস্কের জন্য উপযোগী নয়। তবে সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য একেপির সামনে সব পথ খোলা রয়েছে। এর মাধ্যমে তিনি দৃশ্যত জোট করার ব্যাপারে নমনীয়তাই প্রকাশ করেছেন। তবে নির্বাচনে প্রত্যাশার চেয়ে ভালো করা এইচডিপি বলেছে, তারা একেপি ছাড়া অন্য যেকোনো দলের সঙ্গে জোট সরকার গঠনের আলোচনা করতে পারে। আর প্রেসিডেন্ট এরদোয়ানের উচিত তার সাংবিধানিক সীমারেখার মধ্যেই থাকা। এই পরিস্থিতিতে দেশে ফের ভোটের সম্ভাবনাও দেখা দিয়েছে।

রক্ষণশীল এই একেপি ইসলামি ভাবধারায় বিশ্বাসী। গত একযুগের বেশি সময় ক্ষমতায় থাকাকালে দলটি তুরস্কের অর্থনীতি শক্তিশালী করতে সক্ষম হয়েছে। তাদের নানামুখী উদ্যোগের কারণে গতবছরের বেকারত্বের হার ১৪ দশমিক ৪ শতাংশ এ বছরের মার্চে কমে ১১ দশমিক ৫ শতাংশে নেমে এসেছে। এছাড়া একেপি সরকার বৈদেশিক নীতির ক্ষেত্রেও ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে। এবারের নির্বাচনী প্রচারাভিযানে অর্থনীতিকে আরো শক্তিশালী করার পাশাপাশি অনেক উচ্চাভিলাষী কর্মসূচি হাতে নেয়ার কথা ঘোষণা দিয়েছিলো একেপি। এর মধ্যে রয়েছে কৃষ্ণসাগর থেকে আজিয়ান সাগর পর্যন্ত খাল খনন, ইস্তাম্বুুলের বাইরে একটি নতুন শহর স্থাপন এবং নতুন নতুন ব্রিজ, বিমানবন্দর ও হাসপাতাল নির্মাণ। এরপরও দলটি ১৩ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম আসন পেলো।

বিশ্লেষকরা বলছেন, গত একবছরে প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান যেভাবে গণতন্ত্রের কণ্ঠরোধ করছিলেন তারই যোগ্য জবাব ভোটবাক্সে দিলেন দেশের সাধারণ মানুষ। বিরোধী মুখ বন্ধ করতে গত বারো মাসে ব্লগার গ্রেফতার থেকে শুরু করে নানা ধরনের কার্যকলাপে তার ‘স্বৈরাচারী’ মনোভাব প্রকাশিত হয়েছে। আর তারই জবাব মিলেছে ভোটে। তবে অনেকেই বলছেন, একেপির ভোট পাওয়ার ক্ষেত্রে রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের কারিশমা একটা ভূমিকা রাখে—যা বিগত নির্বাচনগুলোতেও দেখা গিয়েছিল। কিন্তু এবারের নির্বাচনে তার ব্যতিক্রম দেখা গেছে। নির্বাচনের ফলাফলে এটাই প্রতীয়মান হচ্ছে যে, সংবিধান পরিবর্তন করে নিজেকে আরো বেশি ক্ষমতাবান করার এরদোগানের পরিকল্পনা নস্যাত্ হয়ে গেছে। তবে শতকরা ৮৬ ভাগ ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করায় এরদোয়ান এই নির্বাচনকে গণতন্ত্রের প্রতি জনগণের আস্থা হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, আমাদের জনগণের রায় সব কিছুর ওপরে। আমি মনে করি বর্তমান পরিস্থিতিতে কোনো দলের এককভাবে ক্ষমতায় আসা সম্ভব নয়, নির্বাচনে অংশ নেয়া দলগুলোর বাস্তবতার আলোকে সুষ্ঠুভাবে বিষয়টি মূল্যায়ন করবে। একেপি প্রথম ২০০২ সালে তুরস্কের রাষ্ট্রক্ষমতায় আসে। তবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির স্বল্পতা ও এরদোয়ানের স্বৈরাচারী প্রবণতা বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

এদিকে পার্লামেন্ট নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় তুরস্কে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার সৃষ্টি হয়েছে। এ সমস্যা নিরসনে তুরস্কে আগাম নির্বাচন অনুষ্ঠানের দরকার হতে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তুরস্কে সবসময়ই একক সরকার ভালো কাজ করেছে, জোট সরকার সবসময়ই এ ব্যবস্থার ধ্বংস ডেকে এনেছে। আগামী ৪৫ দিনের মধ্যে যেকোনো সময়ে নতুন নির্বাচন আহ্বান করা হতে পারে বলে সংবাদ সংস্থা এএফপির এক খবরে বলা হয়েছে।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবরে বলা হচ্ছে, প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান ধীরে ধীরে বিতর্কিত হয়ে উঠেছেন। তার উচ্চাকাঙ্ক্ষার জন্যই এ বিপত্তি। ৭ জুনের এই নির্বাচন সাময়িক অনিশ্চয়তার জন্ম দিলেও একটি দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতার সুযোগ তৈরি করেছে। এর মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা কুর্দি বিদ্রোহীদের সঙ্গে বিরোধ মিটিয়ে শান্তির পথে চলারও সুযোগ তৈরি হতে পারে।

 

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
১৫ জুন, ২০২১ ইং
ফজর৩:৪৩
যোহর১১:৫৯
আসর৪:৩৯
মাগরিব৬:৪৯
এশা৮:১৪
সূর্যোদয় - ৫:১১সূর্যাস্ত - ০৬:৪৪
পড়ুন