মিয়ানমারে নাটকীয় অভিযান
শিফারুল শেখ১৫ জুন, ২০১৫ ইং
মিয়ানমারে নাটকীয় অভিযান
 

মিয়ানমার সীমান্তের ভেতরে জঙ্গি নিধনে এক নাটকীয় অভিযান চালালো ভারতের সেনাবাহিনী। আকস্মিকভাবে চালানো এই অভিযান জঙ্গিদের কাছে একেবারেই অপ্রত্যাশিত ছিল। যদিও এই ধরনের অভিযান আগে মিয়ানমার এবং ভুটানে হয়েছে। তবে এবার আগের চেয়ে অভিযানের ধরন এবং রাজনৈতিক ভাবটা ছিল ভিন্ন। এবারের অভিযান হয়েছে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের অনুমোদনে এবং সেটা ধীরে ও ঠাণ্ডা মাথায়।

৯ জুন মঙ্গলবার খুব ভোরে ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্যারাকমান্ডো বাহিনীর সদস্যরা মিয়ানমারের সীমান্ত পেরিয়ে নাগা জঙ্গি গোষ্ঠী এনএসসিএন বা খাপলাংয়ের অন্তত দুটি শিবির ধ্বংস করে আসে আর তাতে অন্তত ৩৮ জন জঙ্গি নিহত হয়। গত ৪ জুন মনিপুরে সন্দেহভাজন নাগা জঙ্গিদের আক্রমণে ডোগরা রেজিমেন্টের ২০ জন সদস্য নিহত হন। যার প্রতিশোধ হিসেবেই মিয়ানমারে ওই জঙ্গিদের ওপর আক্রমণ চালায় সেনাবাহিনী। গোয়েন্দাদের কাছে তথ্য ছিল ফের আঘাত হানতে পারে জঙ্গিরা। আর তাই দ্রুতই এই অভিযান। মাত্র ৪৫ মিনিট অভিযান পরিচালিত হয়। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী স্বয়ং এই অভিযানের নির্দেশ দেন। পরিকল্পনা নেয়া হয় ৫ দিন আগে। এ কারণে জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল বাংলাদেশে প্রধানমন্ত্রী মোদীর সফরসঙ্গী হননি। তিনি মণিপুরে চলে যান। এজন্য সেনাপ্রধান জেনারেল দলবির সিং সুহাগও তার যুক্তরাজ্য সফর বাতিল করেন। তিনিও চলে যান মণিপুরে। সেখানে তিনি কোর-৩ এর কমান্ডার ও আসাম রাইফেল্স কর্তাদের সঙ্গে প্রাথমিক বৈঠক করেন। মিয়ানমার সরকারের শীর্ষ মহলে হামলার খবর জানাতে হত। কিন্তু সেই দেশের সেনাবাহিনীকে সরকারিভাবে আগে ওই তথ্য জানাতে চায়নি ভারতীয় সেনাবাহিনী। তাতে খবর ফাঁস হওয়ার আশঙ্কা ছিল। অভিযানের কয়েক মিনিট আগে মিয়ানমার সেনাবাহিনীকে জানানো হয়। এতে ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টিও নজরে রাখা হয়।

গত সপ্তাহেই কেবল মণিপুরে নাগা বিদ্রোহীদের ওপর এই প্রথম হামলা হয়েছে তা কিন্তু নয়। এ বছর ৪১ জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য জঙ্গিদের হামলায় নিহত হয়েছেন। সরকারি কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, এই অঞ্চলের রাজ্যগুলোতে গত বছর নিহত হয়েছে ২৩ জন। গত ৪ জুন নিহত হয় ১৮ জন সেনা সদস্য, আহত হয় ১১ জন। গত ৩০ বছরে সবচেয়ে বড় ধরনের হামলা এটি। এই অঞ্চলটি এখন ভারতের সবচেয়ে সংঘাতপূর্ণ এবং অনিরাপদ অঞ্চল হিসেবে দেখা দিয়েছে। মাওবাদীদের হামলায় নিহত মানুষের দিক দিয়ে কাশ্মীর আছে তৃতীয় অবস্থানে। মণিপুরে বিভিন্ন বিদ্রোহী গ্রুপ রয়েছে। আসাম, মিজোরাম, নাগাল্যান্ড এবং ত্রিপুরা এখন অনেক শান্তিপূর্ণ। বাংলাদেশের শেখ হাসিনা সরকারের এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। ২০০৫ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত সন্ত্রাসী হামলায় ৩০৯৩ জন নিরাপত্তা কর্মী প্রাণ হারিয়েছেন। তবে ২০০৫ সাল থেকে এই হার ৬৩ শতাংশ কমেছে। নাগা এবং উলফা এখন মিয়ানমারের ভেতর থেকে ভারত সীমান্তে হামলা চালায়।

এই ধরনের অভিযানে যেমন সেনাবাহিনী এবং গোয়েন্দাদের সমন্বিত একটা পদক্ষেপ দরকার, তবে সবেচেয়ে বেশি দরকার রাজনৈতিক নেতৃত্বের দৃঢ়তা। কারণ অভিযান যদি ভুল হতো, যদি অভিযান চালাতে গিয়ে সেনাবাহিনী আক্রমণের শিকার হয়ে আহত হতেন এবং যদি কূটনৈতিক সমস্যার সৃষ্টি হতো তাহলে এর সব দায় পড়তো প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ওপর। ব্যর্থতার বোঝা তাকেই বহন করতে হতো।

এই অভিযান আমেরিকার দুটি অভিযানের সঙ্গে তুলনা করা যায়। যদিও যৌক্তিকভাবে সেটা করা সম্ভব নয়। প্রথমত, ১৯৮০ সালে আমেরিকার উদ্ধার অভিযান। দেশটির বিশেষ বাহিনী ইরানের তেহরানে নিজস্ব দূতাবাসে জিম্মি হওয়া কর্মকর্তাদের উদ্ধারে এই অভিযান চালায়। এসময় একটি হেলিকপ্টার বিধ্বস্ত হয়ে কয়েকজন মার্কিন সেনা নিহত হন। তখন এর বোঝা বহনের দায় গিয়ে পড়ে তত্কালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের ওপর। আর এজন্য এর পরের নির্বাচনে জিমি কার্টারকে পরাজয় বরণ করতে হয়। আর এই অভিযানের ২৫ বছর পরে পাকিস্তানের অ্যাবোটাবাদে আল কায়েদা নেতা ওসামা বিন লাদেনকে ধরতে অভিযান চালানোর নির্দেশ দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা। আস্থার সঙ্গেই তিনি এই নির্দেশ দেন। সেটা সফলও হয়। এবং ওবামা দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসেন।

মার্কিন ওইসব অভিযানের চেয়ে ভারতের অভিযান অনেকটাই সহজ। কারণ গত ১৫ বছরে মিয়ানমারের জেনারেল এবং রাজনীতিবিদদের সঙ্গে সহযোগিতার সম্পর্ক সৃষ্টি হয়েছে। আর এটা শুরু হয় ২০০১ সালে তত্কালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জশবন্ত সিংয়ের আমলে। কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএ সরকারের আমলেই মূলত সম্পর্কের ভিত্তি তৈরি হয়। আর গত বছর মিয়ানমারে নরেন্দ্র মোদীর সফরে সেটা আরো এগিয়ে যায়। অভিযানে সফলতা মোদীর সুনামকে যে আরো বাড়িয়ে দেবে সেটা সন্দেহাতীতভাবেই বলা যায়। আর এই অভিযান পাকিস্তানকে একটা বার্তা দেবে। তা হলো যদি কোথাও চ্যালেঞ্জ আসে তাহলে মোদী সরকার সেই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় যথাযথ ভূমিকা গ্রহণ করবে। বিশেষ করে কাশ্মীর ইস্যুতে এই অভিযান একটা ইঙ্গিতবহ হয়েই থাকবে। ভারত শাসিত কাশ্মীরেও অনেক সময় ভারতের সেনাবাহিনী লাইন অব কন্ট্রোল (লক) অতিক্রম করে জঙ্গিদের দমনে। অটল বিহারি বাজপেয়ির আমলে এধরনের ঘটনা ঘটেছিল। ভারতের রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং অবজার্ভ রিসার্চ ফাউন্ডেশনের সিনিয়র ফেলো অশোক মালিকের মতে, সামপ্রতিক অভিযান যেমন ক্ষমতাসীন বিজেপি নেতাদের চোখে একটা সফলতার বার্তা পৌঁছে দিয়েছে তেমনি মনে সাহস জোগাবে সেনাবাহিনী এবং গোয়েন্দাদের মধ্যে।

অভিযান নিয়ে আবার বিতর্কও আছে। এখন কেন বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে এই ধরনের অভিযান চালাতে হলো? এই প্রশ্ন আর এস পারের, যিনি বিদ্রোহীদের সঙ্গে শান্তি আলোচনার অন্যতম প্রধান একজন ছিলেন। ২০১২ -১৩ সালে এনএসসিএনের বিদ্রোহীদের সঙ্গে আলোচনা চলছিল। আলোচনায় এনএস সিএন ছাড়াও ২০১৩ সাল পর্যন্ত সরকার এবং বিদ্রোহীদের মধ্যে অস্ত্র বিরতি বহাল ছিল। কিন্তু ২০১৪ সালে সেই অস্ত্রবিরতি আর নবায়ন করা হয়নি। তার প্রশ্ন তখন কেন পত্রিকায় এই বিষয়টি প্রধান শিরোনাম হলো না? সেই শিরোনাম হলে সরকার সজাগ হতো। ১৮ জন সেনাবাহিনীকে প্রাণ দিতে হতো না।

মিয়ানমারে অভিযানে প্রতিক্রিয়া পাকিস্তানে

মিয়ানমার সীমান্তে ঢুকে হামলার কথা সংবাদমাধ্যমকে জানান ভারতের তথ্য প্রতিমন্ত্রী রাজ্যবর্ধন সিংহ রাঠৌর। তিনি বলেন, জঙ্গিরা মিয়ানমারে ঘাঁটি গেড়ে ভারতে নাশকতা চালিয়ে যাবে তা সহ্য করা হবে না। যে কোনো দেশে যে কোনো স্থানে হামলা চালানো হবে। যারা জঙ্গিদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয় এটা তাদের জন্য একটি বার্তা। এর প্রতিক্রিয়ায় পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিসার আলী খান বৃহস্পতিবার হুঁশিয়ারি দেন, ভারত যেন ঘুণাক্ষরেও পাকিস্তানে এ ধরনের অভিযানের কথা কল্পনা না করে। তিনি বলেন, পাকিস্তান মিয়ানমার নয়-ভারতের এটা মনে রাখা উচিত। এর পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় প্রতিরক্ষামন্ত্রী মনোহর পর্রিকর বলেন, এই অভিযানে যারা ভয় পেয়েছে তারাই প্রতিক্রিয়া দিতে শুরু করেছে। পাকিস্তান সেনাপ্রধান রাহিল শরিফ শনিবার বলেছেন, পাকিস্তান সেনাবাহিনী কাশ্মীরসহ যেকোনো ইস্যুতে চ্যালেঞ্জ গ্রহণে প্রস্তুত। তবে যাই হোক মিয়ানমারের মতো সত্যিই ভারত পাকিস্তানে অভিযান চালাতে পারবে? বিবিসির এরকমই এক প্রশ্নের জবাবে ভারতের সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল কে কে চৌধুরী বলেন, ‘এধরনের অভিযানের ক্ষমতা ভারতের রয়েছে। তার কৌশলও যেমন বাহিনীর জানা আছে, তেমনই অস্ত্র বা অন্যান্য উপকরণও মজুত আছে। কিন্তু ভারত যদি সীমান্ত পেরিয়ে এ ধরনের হামলা পাকিস্তানে চালায়, তাহলে সেই মুহূর্তে পাকিস্তান যে প্রতিক্রিয়া দেখাবে তার জন্যও প্রস্তুত থাকতে হবে। কারণ তখন গোটা পশ্চিম সীমান্ত জুড়েই তখন গোলাগুলি শুরু হয়ে যাবে। এই অভিযান যেমন পাকিস্তানকে প্রতিক্রিয়া দেখাতে বাধ্য করছে তেমনি মিয়ানমারকেও অস্বস্তিতে ফেলছে। বাংলাদেশে নিযুক্ত সাবেক হাইকমিশনার পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তীর মতে, এইসব অভিযানের কথা বেশি না বলাই ভাল।

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
১৫ জুন, ২০২১ ইং
ফজর৩:৪৩
যোহর১১:৫৯
আসর৪:৩৯
মাগরিব৬:৪৯
এশা৮:১৪
সূর্যোদয় - ৫:১১সূর্যাস্ত - ০৬:৪৪
পড়ুন