নেপাল
ঘুরেফিরে সেই প্রচন্ড
বরকতুল্লাহ সুজন০৮ আগষ্ট, ২০১৬ ইং
ঘুরেফিরে সেই প্রচন্ড
বিশ্বের সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ এভারেস্টের দেশ নেপাল। রহস্যজনকভাবে দেশটি এখন রাজনীতিকদের স্বার্থপরায়ণতা এবং ক্ষমতার লালসার শিকার। রাজতন্ত্র অবসানের পর কোনো সরকারই পূর্ণ করতে পারেনি ক্ষমতার মেয়াদ। গত ১০ বছরে গঠিত হলো নয়টি সরকার। যেন স্থায়ী রূপ নিয়েছে রাজনৈতিক অস্থিরতা আর ক্ষমতা ভাগাভাগির নাটক। এরই অংশ হিসেবে এমপিদের ভোটে আবারো প্রধানমন্ত্রী হলেন কমিউনিস্ট পার্টির নেতা ও সাবেক মাওবাদী গেরিলা প্রধান পুষ্প কমল দহাল প্রচন্ড। মূলত নেপালের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল নেপালি কংগ্রেস এবং তৃতীয় বৃহত্তম দল কমিউনিস্ট পার্টির দুই নেতার ক্ষমতায় যাওয়ার লোভ থেকেই গণতন্ত্রে এমন ছন্দপতন। বিশ্লেষকরা তাই বলছেন, প্রচন্ডের প্রধানমন্ত্রিত্বে নেপালের কিচ্ছু যায় আসে না।

অনাস্থা ভোটের হুমকির মুখে গত বুধবার পদত্যাগে বাধ্য হন প্রধানমন্ত্রী কে পি ওলি। এই সুযোগে কংগ্রেস ও ছোট ছোট কয়েকটি দলের সমর্থন নিয়ে পার্লামেন্টের সংখ্যাগরিষ্ঠের ভোটে ২৪তম প্রধানমন্ত্রী হন প্রচন্ড। ৫৯৫ আসনের এই পার্লামেন্টের ভোটে অংশ নেন ৫৭৩ জন এমপি। তাদের মধ্যে প্রচন্ডের পক্ষে ভোট দেন ৩৬৩ জন আর বিপক্ষে ভোট দেন ২১০ জন। তবে নেপালি কংগ্রেস এবং কমিউনিস্ট পার্টির মতো দুই বৈরী শক্তির এমন সখ্যতায় রীতিমত হতবাক ও হতাশ হয়েছে গোটা জাতি। পুষ্প কমল দহাল প্রচন্ড যখন সরকারের বিরুদ্ধে মাওবাদী বিদ্রোহের নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন, তখন নেপালের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন কংগ্রেস নেতা শের বাহাদুর দিউবা। ২০০১ সালে প্রচন্ডসহ প্রথম সারির বিদ্রোহী নেতাদের মাথার জন্য ৫০ লাখ রুপি পুরস্কারও ঘোষণা করেছিলেন তিনি। এরপর গেরিলা হামলার শিকার হয় দিউবার গাড়িবহর। তবে তিনি অক্ষত পালিয়ে যান। এমন পুরনো শত্রুতা সত্ত্বেও দুই নেতার সমঝোতার কেন্দ্রবিন্দু কেবল ক্ষমতার গদি। দুই কোটি আশি লাখ নাগরিক বা দেশের বৃহত্তর স্বার্থের কোনো স্থান নেই সেখানে। রাজনীতিতে যেন স্থায়ী বন্ধু বা শত্রু বলে কিছু নেই। যেন ব্যক্তিস্বার্থ ও লোভের কাছে সব আদর্শই ভূলুণ্ঠিত।

কংগ্রেস ও কমিউনিস্ট পার্টির এমন সমঝোতাকে বলা হচ্ছে ভাগ বন্দোবস্ত বা ক্ষমতা ভাগাভাগির রাজনীতি। বিশ্লেষকরা বলছেন, সম্পূর্ণ বিপরীত আদর্শের দুই দলের মধ্যে মিত্রতা কেবল নেপালেই সম্ভব। তাদের মতে, তৃতীয় বৃহত্তম দল কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে সর্ববৃহত্ দল কংগ্রেস পার্টির সরকারে যোগ দেওয়ার বিষয়টি ভোটারদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার শামিল। এ অবস্থায় জাতির জন্য ভালো কিছু আশা করা যায় না। বরং রাজনৈতিক দল ও নেতাদের স্বার্থই এখানে হাসিল হবে।

কয়েকশ’ বছরের পুরনো রাজতন্ত্রকে হটিয়ে ২০০৮ সালে প্রথম সরকার গঠন করেছিলেন কমিউনিস্ট পার্টির নেতা প্রচন্ড। এক বছর যেতে না যেতেই প্রেসিডেন্টের সঙ্গে তৈরি হয় মতবিরোধ। বরখাস্ত সেনাপ্রধানকে পুনরায় নিয়োগ করা হলে ওই বিরোধ চরম রূপ নেয়। প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরে যান প্রচন্ড। মাওবাদী বিদ্রোহী নেতা হিসেবে এক সময় রবিনহুড আখ্যা পেয়েছিলেন তিনি। ২০০৬ সাল পর্যন্ত টানা এক দশক সরকারের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন প্রচন্ড। আন্ডারগ্রাউন্ডে থেকেই ১৯৯৬ সালে সাংবিধানিক রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন তিনি। যা দেশের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ে। সরকারি সেনাবাহিনীর সঙ্গে সংঘাতে মারা যায় ১৭ হাজারেরও বেশি মানুষ। ২০০৬ সালে মাওবাদীরা মূল ধারার রাজনীতিতে যোগ দিলে ২০০৮ সালে বিলুপ্ত হয় রাজতন্ত্র। প্রাসাদ ছেড়ে চলে যান রাজা জ্ঞানেন্দ্র। কিন্তু প্রথম সরকার গঠনের পরই নিজ গুণেই তা খুইয়ে ফেলেন প্রচন্ড। দ্বিতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হওয়া সত্ত্বেও তার কাছ থেকে ভালো কিছু আশা করছে না কেউই।

বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম বলছে, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রচন্ড নিজেও স্থিতিশীল থাকছেন না। কারণ জাতীয় বা দেশের মূল কোনো এজেন্ডার ভিত্তিতে দুই দলের সমঝোতা হয়নি। বরং তাদের সমঝোতার উদ্দেশ্য নিজেদের ব্যক্তিগত সুযোগ-সুবিধা। নয় মাস পর প্রধানমন্ত্রী পরিবর্তিত হবে, এমন শর্তও রয়েছে ওই সমঝোতায়। ক্ষমতা ভাগাভাগির এই চুক্তি অনুযায়ী সাধারণ নির্বাচনের আগে অর্থাত্ ২০১৮ সালের শুরুতে প্রচন্ডের কাছ থেকে ক্ষমতা বুঝে নেবেন নেপালি কংগ্রেসের নেতা শের বাহাদুর দেউবা।

নেপালের রাজনীতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে ভারত ও চীন। দুই দেশেরই প্রভাব রয়েছে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে। ২০০৮ সালে সরকার গঠনের পর প্রথা ভেঙে ভারত সফরের আগে চীন সফর করেন প্রধানমন্ত্রী প্রচন্ড। এরপর সবশেষ গত মার্চে চীনের সঙ্গে নেপালের যে বাণিজ্য চুক্তি হয়, তাতে নয়াদিল্লির শান্তির ঘুম হারাম হওয়ার কথা। কারণ ওই চুক্তি অনুযায়ী ভারত বাদে অন্য দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্য বাড়াতে চীনা বন্দর ব্যবহারের অনুমতি পায় নেপাল। এর ফলে ভৌগোলিকভাবে ভারত ঘেরা নেপালের স্বাধীনচেতা মনোভাব পরস্ফুিট হয়। এছাড়া গত বছর রাজতন্ত্র পরবর্তী সংবিধানের বিরুদ্ধে সংখ্যালঘু মাধেশিদের বিক্ষোভ দানা বাঁধলে রাজনৈতিক নেতারা এর জন্য নয়াদিল্লির দিকেই আঙুল তোলেন। ওই অস্থিতিশীলতার জন্য প্রয়োজনীয় পণ্য ও জ্বালানি খাতে ভারতের অদৃশ্য অবরোধকে দায়ী করা হয়। যদিও দক্ষিণাঞ্চলের সমতলভূমির জনগোষ্ঠী মাধেশিদের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক ভালো। তাদের অভিযোগ, সাংবিধানিকভাবে তাদের দুর্বল দেখানো হয়েছে। যা দেশকে দু’টি অংশে বিভক্ত করতে পারে। রাজনৈতিক অস্থিরতার আড়ালে ভূমিকম্প বিধ্বস্ত নেপালের বার্ষিক মূল্যস্ফীতি ছাড়িয়েছে দশ শতাংশ। দিন দিন হারাচ্ছে বাণিজ্য সামর্থ্য ও আস্থা। পানি ও বিদ্যুত্ ঘাটতিও এখন চরমে। নতুন সরকারের তাই গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ বিভেদ ভেঙে জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলা ও অর্থনীতি পুনরুদ্ধার।

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
৮ আগষ্ট, ২০১৯ ইং
ফজর৪:০৯
যোহর১২:০৫
আসর৪:৪১
মাগরিব৬:৪০
এশা৭:৫৯
সূর্যোদয় - ৫:৩১সূর্যাস্ত - ০৬:৩৫
পড়ুন