এখন চীনও ভয় পাচ্ছে উত্তর কোরিয়াকে!
শিফারুল শেখ১১ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ইং
এখন চীনও ভয় পাচ্ছে উত্তর কোরিয়াকে!
উত্তর কোরিয়া গত কয়েক মাস ধরেই ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা অব্যাহত রেখেছে। যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্রদের প্রতি হুমকিও অব্যাহত রেখেছে। আর চীনের ওপর চাপ বাড়াচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। কারণ চীনকে উত্তর কোরিয়ার প্রধান মিত্র হিসেবে গণ্য করা হয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তো বলেই দিয়েছেন, চীন উত্তর কোরিয়াকে থামাতে ব্যর্থ হলে তাদের সঙ্গে বাণিজ্যের বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা হবে। গত মাসেও বিশ্ব গণমাধ্যমে খবর বেরিয়েছিল চীনের হয়েই পশ্চিমা বিশ্বের বিরুদ্ধে লড়ছেন উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন। কিন্তু এখন শোনা যাচ্ছে কিম জং উন চীনের কথাও শুনছেন না। তাই তো ক্ষেপণাস্ত্র হামলার ভয়ে আছে চীনও।

চীন-কিম সম্পর্কের অবনতি হচ্ছে: ২০১১ সালে যখন কিম জং উন উত্তর কোরিয়ার ক্ষমতায় আসেন তখন তাকে সমর্থন করেছিলেন চীনের তত্কালীন প্রেসিডেন্ট হু জিনতাও। যদিও কিম জং উনের বয়স খুব কম ছিল। কিন্তু হু জিনতাও মনে করেছিলেন, কিম যুবক হলেও ঐতিহ্যগতভাবেই দুই দেশের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় থাকবে এবং আরো শক্তিশালী হবে। দুই বছর পর কিম তার কাকা জ্যাং সং থায়েককে ফাঁসি দেওয়ার নির্দেশ দেন। জ্যাং সং থায়েক ছিলেন চীনের সঙ্গে সুসম্পর্ক তৈরির অন্যতম কারিগর। সেখান থেকেই দুই দেশের সম্পর্কে কিছুটা দূরত্ব সৃষ্টি হয়। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, ওয়াশিংটনের মতো চীনকেও টার্গেট করতে পারেন কিম। যদিও যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রসহ চীনেরও অনেকে মনে করেন, বেইজিং পিয়ংইয়ংকে বাগে আনতে আরো কিছু করবে। কূটনীতিকরা জানিয়েছেন, চীনে উত্তর কোরিয়ার বিষয়ে দেখভাল করতেন উ দেউই। চলতি গ্রীষ্মে অবসরে যাওয়ার আগে গত এক বছর তিনি উত্তর কোরিয়া সফর করেননি। এমনকি তার উত্তরসূরি কং জুয়ানইউও এখনো দেশটিতে সফরে যাননি। অথচ তিনি গত মাসের মাঝামাঝি পাকিস্তান সফর করেছেন। বেইজিংয়ের রেনমিন ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের প্রফেসর জিন ক্যানরং বলেছেন, দরিদ্র দেশ উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে চীন যে ধরনের কূটনৈতিক নিয়ন্ত্রণ আনার চেষ্টা করেছেন তা ভুল। দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক কখনো কারো ওপর কারো নিয়ন্ত্রণাধীন ছিল না। কখনো না। বিশেষ করে স্নায়ুযুদ্ধের পর। ওই সময় উত্তর কোরিয়া খুবই খারাপ পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে গিয়েছিল।

ঝামেলা এড়ানো: ১৯৫০ থেকে ৫৩ সালের কোরিয়ান যুদ্ধে উত্তর কোরিয়ার পাশে ছিল চীন। চীনের নেতা মাও জেডং তার সন্তানকেও হারান। বেইজিং উত্তর কোরিয়ার দীর্ঘদিনের মিত্র হিসেবে কাজ করছে। তবে দুই দেশের সম্পর্কে সবসময়ই অবিশ্বাস এবং সন্দেহের ছায়া ছিল। চীন উত্তর কোরিয়াকে সহ্য করে এইজন্য যে, দক্ষিণ কোরিয়ার প্রধান মিত্র যুক্তরাষ্ট্র। কোরীয় উপদ্বীপে কিছু হলে তা চীনের ওপরও আঘাত হানবে। আর অর্থনৈতিকভাবেও উত্তর কোরিয়া দুর্বল হলে তা চীনের জন্য ভালো হবে না। এ নিয়েও দুশ্চিন্তা আছে বেইজিংয়ের। জ্বালানির ওপর নিষেধাজ্ঞা উত্তর কোরিয়ার অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। চীন সবসময়ই উত্তর কোরিয়াকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়ে আসছে।

২০১১ সালে মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত উত্তর কোরিয়া নেতা কিম জং ইল অনেকবার চেষ্টা করেছেন যাতে তার উত্তরসূরি হিসেবে পুত্র কিম জং উনকে চীনের সমর্থন অব্যাহত থাকে। প্রেসিডেন্ট হু ২০ বছর বয়সী কিমকে সমর্থন দেন। তবে কিম জং উন তার দেশের প্রধান ও শক্তিশালী মিত্র থেকে দূরত্ব বজায় রাখতে শুরু করেন। সিউলের ইয়োনসেই ইউনিভার্সিটির জন ডেলুরি বলেন, উত্তর কোরিয়ার নিজস্ব রাজনীতি আছে যেখানে কিম খুব বেশি পরিচিত নন। তিনি সেটা এখনো প্রমাণ করতে পারেননি। তাকে দেখাতে হবে যে তিনি বেইজিংয়ের পকেটের নেতা নন। মনে হয়, তিনি হু জিনতাও এবং বর্তমান প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং থেকে কিছুটা হলেও দূরত্ব বজায় রেখেছেন। ক্ষমতায় আসার কয়েক মাসের মধ্যে কিম চীনকে টেলিগ্রাফ করে জানান, উত্তর কোরিয়া তার সংবিধান সংশোধন করতে চায়। সংশোধন করে দেশটি নিজেকে পরমাণু অস্ত্রধর রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা দিতে চায়। ২০১৩ সালে জ্যাংয়ের ফাঁসির মাধ্যমে চীনের সঙ্গে কিমের অবিশ্বাস সৃষ্টি হয়। বেইজিংয়ে এক বিদেশি কূটনীতিক জানান, অবশ্যই চীন এই ঘটনায় খুশি ছিল না। কিন্তু তারপরও সম্পর্ক উষ্ণ করতে শি জিন পিং ২০১৫ সালের অক্টোবরে কোরিয়ার ওয়ার্কার্স পার্টির ৭০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে সামরিক কুচকাওয়াজে কমিউনিস্ট পার্টির উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা লিউ ইউনশানকে পাঠান। লিউ শি’র লেখা একটি চিঠিও কিমের কাছে হস্তান্তর করেন। এতে কিমের নেতৃত্বের প্রশংসা করা হয়। শি ব্যক্তিগতভাবে কিমের শক্তিশালী কুচকাওয়াজের প্রশংসা করেন। কিন্তু শি’র এই প্রশংসার কোনো মূল্য দেননি কিম। 

উত্তর কোরিয়াকে ভয় পাচ্ছে চীন: উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে চীনের সম্পর্ককে মাও জেডং ঠোঁট এবং দাঁতের সঙ্গে তুলনা করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ঠোঁট যদি না থাকে তাহলে দাঁত তো ঠান্ডায় আক্রান্ত হবে। তিনি ভৌগোলিক দিক থেকে উত্তর কোরিয়া কতটা গুরুত্বপূর্ণ তা বোঝাতেই এই মন্তব্য করেছিলেন। কিন্তু সেই দেশটি এখন উল্টো চীনের জন্যই হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছে।

উত্তর কোরিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা এবং কিমের সত্ ভাই কিম জং ন্যাম মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুর বিমানবন্দরে হত্যার শিকার হলেও বেইজিং তেমন একটা উচ্চবাচ্য করেনি। অথচ ন্যাম ছিল কিমের ক্ষমতার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী। চীনের প্রভাবশালী পত্রিকা গ্লোবাল টাইমসে সতর্ক করে বলা হয়েছে, এবারের হাইড্রোজেন বোমার পরীক্ষার পর চীন যদি উত্তর কোরিয়ার ওপর তেল নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে তাহলে চীনের সঙ্গেই সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে উত্তর কোরিয়া। বেইজিংয়ের কার্নেগী-সিনহুয়া সেন্টারের বিশেষজ্ঞ ঝাও টং বলেন, জাতিসংঘের নিষেধাজ্ঞায় চীন সমর্থন দেওয়ায় অসন্তুষ্ট হয়েছে উত্তর কোরিয়া। তিনি বলেন, চীন যদি দেশটির অর্থনীতির ওপর আরো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে তাহলে অর্থনীতি ধ্বংসের মুখে পড়বে। আর কিমের জন্য ক্ষমতায় থাকাটা কঠিন হয়ে যাবে। ফলে ক্ষুব্ধ হয়ে কিম জং উন চীনের প্রতি শত্রুতার নীতি গ্রহণ করতে পারেন যেভাবে করছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি।

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
১১ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ইং
ফজর৪:২৭
যোহর১১:৫৬
আসর৪:২৩
মাগরিব৬:১০
এশা৭:২৩
সূর্যোদয় - ৫:৪৪সূর্যাস্ত - ০৬:০৫
পড়ুন