কেন এত হারিকেন?
১১ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ইং
কেন এত হারিকেন?
আশেক খান আলেখীন

জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে সাথে প্রকৃতি যেন দিন দিন রুদ্ররূপ ধারণ করছে। ফলে বর্তমানে প্রাকৃতিক বিপর্যয়গুলোকে কেবলই ‘প্রাকৃতিক’ বলতে অনেকে দ্বিধান্বিত হচ্ছেন। কারণ বিগত ৫০/৬০ বছর যাবত্ বিশ্বের জলবায়ুর অস্বাভাবিক পরিবর্তনের জন্য শিল্পোন্নয়নের নামে মানুষেরই নানা কার্যকলাপকে দায়ী করছেন অধিকাংশ পরিবেশ বিজ্ঞানী। আর শিল্পকারখানার ধোঁয়া থেকে সৃষ্ট গ্রিনহাউজ এফেক্টের কারণে পৃথিবীর তাপমাত্রা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। সেই সঙ্গে জলবায়ুর চরিত্রও বদলে গেছে। এখন সব কিছুই হয় বেশি বেশি। বৃষ্টি হলে হয় অতিবৃষ্টি, ভূমিকম্প হলে তা হয় প্রলয়ঙ্কারী, আর ঝড় হলে তা হয় ভয়াবহ, সব কিছু ভেঙেচুরে তছনছ করে দিয়ে যায়। ফলে এ সমস্ত বিপর্যয়গুলোকে এখন মনুষ্যসৃষ্ট প্রাকৃতিক বিপর্যয় বললেই যেন বেশি মানানসই হয়। গত কয়েক বছর ধরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ঘন ঘন বন্যা, সাইক্লোনসহ নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার হচ্ছে। গত কয়েক দিনে ক্যারিবীয় দ্বীপগুলোতে ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে হারিকেন ইরমা। আটলান্টিক মহাসাগরে জন্ম নিচ্ছে জোসে ও কাতিয়া নাম দেওয়া আরো দুটো হারিকেন। সেগুলোও প্রবল বিক্রমে যুক্তরাষ্ট্রে আঘাত হানবে বলে মনে করা হচ্ছে। ইরমার আগেও বেশ কয়েকটি হারিকেন যুক্তরাষ্ট্রে আঘাত হানে, ক্ষতি হয় জান-মালের।

প্রকৃতি হঠাত্ করে এত ক্ষেপে গেল কেন? কেন এত হারিকেন? বিশেষ করে হারিকেনের গতিবেগ এত বেড়ে যাওয়ার কারণ কী? বেশির ভাগ বিজ্ঞানীই এ ব্যাপারে বৈশ্বিক উষ্ণায়ণের দিকেই অঙ্গুলী নির্দেশ করছেন এবং তাদের থিওরির স্বপক্ষে বিভিন্ন তথ্যপ্রমাণ উপস্থাপন করেছেন। যদিও একমাত্র বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণেই হারিকেনের তীব্রতা বৃদ্ধি পেয়েছে- এ কথা হলফ করে বলা যায় না। এ প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের পরিবেশ বিষয়ক পরামর্শদাতা সংস্থা ক্লাইমেট সেন্ট্রালের প্রধান বিজ্ঞানী হেইদি কুলেন বৈশ্বিক উষ্ণায়ন এবং হারিকেনকে সিগারেট ও ফুসফুসের ক্যান্সারের সঙ্গে তুলনা করেছেন। বলেছেন, সিগারেট খেলে ক্যান্সার হওয়ার আশংকা বাড়ে, এ কথা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত। তবে সিগারেট খেলেই যে ক্যান্সার হবে, তা কিন্তু জোর দিয়ে বলা যায় না। বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও হারিকেনের বিষয়টিও অনেকটা তেমনই। পৃথিবীর তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় হারিকেনের তীব্রতা বেড়েছে- এর সপক্ষে অনেক প্রমাণ থাকলেও কেবল উষ্ণতা বাড়ার কারণেই এটি হয়েছে, সেকথা প্রকৃতি সম্পর্কে আমাদের ক্ষুদ্র জ্ঞানের ভিত্তিতে চট করে বলে দেওয়াটা ঠিক হবে না। তারপরও এ ব্যাপারে বিজ্ঞানীদের মতামত জেনে নিলে ক্ষতি কী। পৃথিবীটা ঠান্ডা রেখে প্রকৃতিকে যত কম চটানো যায় ততোই তো মঙ্গল। মনুষ্যসৃষ্ট বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণেই যে হারিকেনের তীব্রতা বৃদ্ধি পাচ্ছে তার সপক্ষে বিজ্ঞানীদের যুক্তি—

গরম বাতাস: বায়ুমন্ডলের তাপমাত্রা বৃদ্ধির সাথে হারিকেনের সম্পর্ক রয়েছে। বাতাসের উষ্ণতা বেশি বেড়ে গেলে হারিকেনের সূচনা হয় এবং এর ঠিক নিচে বাতাসের চাপ কমে যায়। হারিকেনের ঘূর্ণায়মান বায়ুর টানে তখন নিচের ও আশেপাশের গরম বাতাসও তার সঙ্গে যুক্ত হয় এবং হারিকেনের আকার বৃদ্ধি পেতে থাকে। ডাঙায় হারিকেনের সৃষ্টি হলে সেটি ততোটা বড় আকার ধারণ করে না, এর ক্ষয়ক্ষতিও তুলনামূলকভাবে কম হয়। কিন্তু সমুদ্রে সৃষ্ট হারিকেন গরম বাতাসের সাথে সাথে সাগরের পানিও শুষে তার মধ্যে নিয়ে নেয় এবং বাতাস-পানি মিশে এক দানবীয় আকার ধারণ করে। বাতাস যত উষ্ণ হয়, হারিকেনের তীব্রতাও ততো বেশি বাড়ে আর সেটি যখন সাগর থেকে ডাঙায় এসে হাজির হয়, তখন তা ভেঙেচুরে সবকিছু তছনছ করে দেয়। পৃথিবীর তাপমাত্রা যত বৃদ্ধি পাচ্ছে, বায়ুমন্ডলও ততো গরম হচ্ছে, ফলে একের পর এক হারিকেনের জন্ম হচ্ছে আর সেগুলো উপকূলীয় এলাকাগুলোতে ঘন ঘন আঘাত হানছে। যেমনটি এখন করছে ইরমা। যুক্তরাষ্ট্রে গত বছর ও চলতি বছরের জুলাইতে যত গরম পড়েছে, বিগত ১৩৭ বছরেও ততোটা পড়েনি। ফলে যা হওয়ার তাই হচ্ছে। একের পর এক হারিকেনের অত্যাচার সহ্য করতে হচ্ছে দেশটিকে।

গরম পানি: সাগরের পানি যতো গরম হয় হারিকেন ততো শক্তিশালী হয়ে ওঠে। আর সমুদ্রের পানির তাপমাত্রা গত কয়েক দশকে অস্বাভাবিক মাত্রায় বেড়েছে যার কারণে হারিকেন বেশি বেশি পানি টেনে নিচ্ছে এবং শক্তিশালী হারিকেন ডাঙায় এসে প্রচণ্ড ঝড়ো বাতাসের সাথে সাথে প্রবল বর্ষণও ঘটাচ্ছে, ক্ষয়ক্ষতিও হচ্ছে আগের চেয়ে অনেক বেশি।

সাগরের গভীরতা বৃদ্ধি: বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে গ্রিনল্যান্ড ও অ্যান্টার্টিকার বরফ দ্রুত গলছে, ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ১৮৮০ সালের পর এ পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী সাগরের গড় উচ্চতা ৮ ইঞ্চি পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। পৃথিবীর কোন কোন অংশে সাগরের এই উচ্চতা আরো কয়েক ইঞ্চি বেশি। উচ্চতা বৃদ্ধির অর্থ হলো সাগরের গভীরতাও বাড়ছে। আর এ অবস্থায় হারিকেনের উত্পত্তি হলে ঝড়ের সঙ্গে জলোচ্ছ্বাসের মাত্রাও বৃদ্ধি পায়।

—সূত্র: টাইম

শতবর্ষের শক্তিশালী সাইক্লোন ইরমা

অলক বিশ্বাস

ক্যারিবিয়ান অঞ্চল ও কিউবার পর যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডাতেও তাণ্ডব চালাল সাইক্লোন ইরমা। আটলান্টিক মহাসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড়গুলোর মধ্যে শতাব্দীর সবচেয়ে শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় ছিল ইরমা। ক্যারিবিয়ার পূর্বাঞ্চলে এক সপ্তাহ ধরে ইরমার তাণ্ডবে অন্তত ২৫ জনের প্রাণহানি ঘটে। এরপর শুক্রবার এটি আঘাত হানে কিউবায়। ক্যারিবীয় দ্বীপগুলোর মতোই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কিউবা। তবে সেখানে প্রাণহানির বিষয়ে এখনো বিস্তারিত জানা যায়নি। কিউবার পর ইরমার গন্তব্য ছিল যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল হারিকেন সেন্টার (এনএইচসি) জানায়, শুরুতে পাঁচ মাত্রার শক্তিশালী ঝড় হিসেবে ক্যারিবীয় অঞ্চলের বিভিন্ন দ্বীপ পেরিয়ে এসে শুক্রবার কিউবায় আঘাত হানে ইরমা। এরপর ঝড়টি দুর্বল হয়ে তিন মাত্রার ঝড়ে পরিণত হয়। তবে তা পুনরায় শক্তি সঞ্চয় করে পাঁচ মাত্রা হিসেবেই ফ্লোরিডায় আঘাত হানে।

এনএইচএসের স্কেল অনুযায়ী, পাঁচ মাত্রার ঘূর্ণিঝড় সবচেয়ে শক্তিশালী। ১৮৫১ সালের পর থেকে তিনবার এই ধরনের পাঁচ মাত্রার ঝড় প্রত্যক্ষ করে যুক্তরাষ্ট্র। সর্বশেষ ১৯৯২ সালে যে পাঁচ মাত্রার হারিকেন অ্যান্ড্রু আঘাত হেনেছিল ইরমা তার চেয়েও অনেক বেশি শক্তিশালী। তাই আগে থেকেই প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিল মানুষ। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ফ্লোরিডার মেয়র রিক স্কট সবাইকে সতর্ক করে বলেন, আমরা এমন একটি ঘূর্ণিঝড়ের সামনে রয়েছি যা আগে কেউ দেখেনি। তাই যেসব এলাকার মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরে যেতে বলা হয়েছে তারা যেন দ্রুত আশ্রয় কেন্দ্রে চলে যান। ইরমার ভয়ে ফ্লোরিডার প্রায় ৬৩ লাখ মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়। জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা হয় নর্থ ও সাউথ ক্যারোলিনা অঙ্গরাজ্যে। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল হ্যারিকেন সেন্টার ফ্লোরিডার দক্ষিণে অবস্থিত ছোট দ্বীপপুঞ্জ ‘ফ্লোরিডা কিজ’ এলাকায় বিধ্বংসী জলোচ্ছ্বাসের সতর্কতা জারি করে। ইরমার প্রভাবে ফ্লোরিডার দক্ষিণাঞ্চল ও সেন্ট্রাল মায়ামিতে ভারী বর্ষণ হয়। গত এক শতকে যোগাযোগ প্রযুক্তি থেকে শুরু করে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সব দিক থেকেই ঈর্ষণীয় সাফল্য অর্জন করেছে যুক্তরাষ্ট্র। তা সত্ত্বেও ইরমাকে মোটেও হালকা করে দেখেনি মার্কিন প্রশাসন।

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
১১ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ইং
ফজর৪:২৭
যোহর১১:৫৬
আসর৪:২৩
মাগরিব৬:১০
এশা৭:২৩
সূর্যোদয় - ৫:৪৪সূর্যাস্ত - ০৬:০৫
পড়ুন