দুই কোরিয়ার ঐতিহাসিক বৈঠক
শান্তির পথে আছে শঙ্কাও
তালেব রানা৩০ এপ্রিল, ২০১৮ ইং
শান্তির পথে আছে শঙ্কাও
প্রায় সাত দশক পর কোরিয়ানরা শান্তির পথে হাঁটছে! গত শুক্রবার দুই কোরিয়ার শীর্ষ নেতাদের মধ্যে অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক বৈঠকে কোরীয় উপদ্বীপে যুদ্ধের অবসানের ঘোষণা এসেছে। একইসঙ্গে কোরীয় উপদ্বীপকে পরমাণু অস্ত্র মুক্ত করতে সম্মত হয়েছেন উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উন। কয়েক মাস আগেও এমন কথা ভাবা যায়নি। বরং কোরীয় উপদ্বীপে নতুন করে যুদ্ধের দামামা বাজতে চলেছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছিলো। এমন অবস্থায় দুই কোরিয়ার ঘোষণা অনেকটা স্বস্তির বার্তা নিয়ে এসেছে।

ওই দিন বৈঠকের আগে ১৯৫৩ সালের পর কিম জং উন প্রথম উত্তর কোরীয় নেতা হিসেবে দুই দেশের সীমান্তের সেনামুক্ত রেখা অতিক্রম করে দক্ষিণ    কোরিয়ায় পা রাখেন। সকালে তিনি সীমান্তে পৌঁছালে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট মুন জায়ে-ইন তাকে স্বাগত জানান। দুই নেতা সেখানে হাতে হাত মেলান। এরপর সেনামুক্ত এলাকা পানমুনজমের ‘পিস হাউস’ তারা বৈঠকে বসেন।

বৈঠকের পর দুই কোরিয়ার যৌথ ঘোষণায় বলা হয়, ১৯৫৩ সালে কোরীয় যুদ্ধ থামাতে যে যুদ্ধ বিরতি চুক্তি হয়েছিল তা এ বছরই শান্তি চুক্তিতে বদলে দিতে দুই নেতা সম্মত হয়েছেন। ১৯৫০ সালে উত্তর কোরিয়ার সেনারা দক্ষিণে আগ্রাসন শুরু করলে দুই কোরিয়া যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। তিন বছর পর ১৯৫৩ সালে যুদ্ধ বন্ধ হয় একটি যুদ্ধ-বিরতি চুক্তির মাধ্যমে। কিন্তু এখন পর্যন্ত দুই কোরিয়ার মধ্যে কোনো আনুষ্ঠানিক শান্তি চুক্তি হয়নি। যে কারণে দুই কোরিয়া এখনো যুদ্ধের মধ্যে রয়েছে বলা চলে।

পরমাণু নিরস্ত্রীকরণের প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়েছে। দুই দেশের মধ্যে শত্রুতাপূর্ণ কর্মকাণ্ড বন্ধ, সেনামুক্ত অঞ্চলকে ‘শান্তি অঞ্চল’ এ পরিণত করা, সামরিক উত্তেজনা কমাতে অস্ত্র সীমিতকরণ, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনকে নিয়ে চার দেশীয় আলোচনায় যুক্ত হতে কাজ করতে সম্মত হয়েছে দুই দেশ। যুদ্ধের কারণে বিচ্ছিন্ন পরিবারের সদস্যদের পুনঃএকত্রীকরণ, সীমান্তজুড়ে রেল ও সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা আধুনিকায়ন এবং খেলাধুলার ক্ষেত্রে আবারো যৌথ অংশগ্রহণের বিষয়ে দুই নেতা সম্মত হন।

গণমাধ্যমের সামনে কিম উন বলেন, দুই কোরিয়া এক দেশে পুনর্মিলিত হবে। আমরা আবারো এক হতে চলেছি। এই অঞ্চলে দুর্ভাগ্যজনক ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি চাই না। সামনে অনেক ঘাত-প্রতিঘাত, দুর্ভোগ এবং হতাশা থাকতে পারে, কিন্তু কষ্ট ছাড়া কোনো বিজয় অর্জিত হয় না।

সবচেয়ে বড় ইস্যু কোরীয় উপদ্বীপকে পরমাণু অস্ত্র মুক্ত করার ঘোষণা দিলেও এই লক্ষ্য কীভাবে অর্জিত হবে সে ব্যাপারে বিস্তারিত কিছু বলা হয়নি। অনেক বিশ্লেষক এখনো এ ব্যাপারে উত্তর কোরিয়ার আগ্রহ নিয়ে সন্দিহান। কারণ অতীতে এ ধরনের চুক্তিতে পরমাণু কার্যক্রম বন্ধ ও বৈরিতা নিরসনের অঙ্গীকার ছিলো। কিন্তু পরবর্তীতে উত্তর কোরিয়া পরমাণু ও ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালালে চুক্তি ভেস্তে যায়। ইতিহাস ঘাটলে দেখা যায় গত কয়েক দশকে অন্তত সাতটি চুক্তি করেও পরমাণু ও ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি থেকে সরে আসেনি উত্তর কোরিয়া। ২০০৬ সালে সবাইকে অবাক করে উত্তর কোরিয়া পরমাণু অস্ত্রের পরীক্ষা চালায়।

নানা আশঙ্কা সত্ত্বেও দুই কোরিয়ার ঐতিহাসিক বৈঠক ও সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জাপান, রাশিয়া, ইইউ, জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ক্ষেপণাস্ত্র ও পরমাণু পরীক্ষার এক অগ্নি বছরের পর ঐতিহাসিক বৈঠক হয়েছে। তিনি টুইট করে বলেন, ভালো কিছু হচ্ছে, কিন্তু সেটা সময়ই বলবে! তবে যুক্তরাষ্ট্রের গর্ব বোধ করা উচিত। প্রতিবেশী চীন দুই দেশের রাজনৈতিক প্রত্যয়ের প্রশংসা করেছে।

উত্তর আর দক্ষিণ কোরিয়ার দুই নেতার এই ঐতিহাসিক বৈঠককের কৃতিত্ব নিচ্ছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট মুন জায়ে-ইন একমত যে, শান্তি আলোচনার কৃতিত্ব ডোনাল্ড ট্রাম্পেরই প্রাপ্য। ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজে কোরিয়া উপদ্বীপে পরিবর্তনের আভাসের কৃতিত্ব নেবার আভাস দেন অনেক আগেই। এ বছরের ৪ জানুয়ারি ট্রাম্প টুইট করেছিলেন, ‘ব্যর্থ বিশেষজ্ঞরা’ এ নিয়ে নানা কথা বলছে। কিন্তু আমি যদি শক্ত অবস্থান না নিতাম এবং উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে সর্বশক্তি প্রয়োগের অঙ্গীকারের কথা প্রকাশ না করতাম- তাহলে এ আলোচনা হতো এমন কথা কি কেউ বিশ্বাস করবে?

দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট মুন জায়ে-ইনও এ কথা প্রকাশ্যেই বলেছেন যে, উত্তরের সাথে এই শান্তি আলোচনা হবার পেছনে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পেন বড় কৃতিত্ব পাওনা আছে। তার কথায় ‘মার্কিন-নেতৃত্বাধীন নিষেধাজ্ঞা ও চাপের ফলেই’ এটা সম্ভব হয়েছে। আগামী মে বা জুন মাসে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং উনের বৈঠক হবে বলে আশা করা হচ্ছে। যা হবে উত্তর কোরিয়ার কোনো নেতার সাথে ক্ষমতাসীন কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রথম বৈঠক।

দুই কোরিয়ার বৈঠকের মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক সম্পাদকীয়তে বলা হয়েছে, শুক্রবার দুই কোরিয়ার নেতারা যে ঘোষণা দিয়েছেন কয়েক মাস আগে তা ভাবা যায়নি। কয়েক সপ্তাহের মধ্যে ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠক হবে কিমের। দূরে বসে তর্কের বিষবাষ্প ছড়ানোর চেয়ে মুখোমুখি বৈঠক অনেক ভালো। তবে কিম শান্তির কথা বললেও তিনি এখনো একজন রক্তপিপাসু স্বৈরশাসক। তিনি তার ক্ষমতাকে পোক্ত করতে যে কোনো কিছুই করতে পারেন। অনেক বিশ্লেষকের সন্দেহ, সব কিছুর শেষে আসলে কিছুই বদলাবে না। তবে কিমের কোরীয় উপদ্বীপকে পরমাণু অস্ত্র মুক্ত করার চিন্তা খুবই অগ্রগতিশীল। এই পরমাণু নিরস্ত্রীকরণের বিষয়টি ট্রাম্প-কিম আলোচনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডা হবে। কিম যেমন এর বিনিময়ে সুবিধা চাইবে তেমনি যুক্তরাষ্ট্র কার্যকর পদক্ষেপ চাইবে। প্রকৃতপক্ষে দুই কোরিয়ার আলোচনার সাফল্য আসলে উত্তর কোরিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের আলোচনার সাফল্যের ওপরই নির্ভর করছে।

দুই কোরিয়ার আলোচনার প্রাথমিক সাফল্য শান্তির পথে অগ্রসর হতে ট্রাম্পের ওপর চাপ তৈরি করছে। কিন্তু সবচেয়ে আশঙ্কার ব্যাপার হলো ট্রাম্প এবং কিম দুই জনই ধৈর্য্যহীন এবং ‘আনপ্রেডিকটেবল’ ব্যক্তিত্ব। এখনো ট্রাম্প এবং কিম তাদের পরমাণু বোতাম থেকে দূরে আছেন এবং বিশ্ব অপেক্ষাকৃত ভালো রয়েছে।

 

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
৩০ এপ্রিল, ২০২১ ইং
ফজর৪:০৪
যোহর১১:৫৬
আসর৪:৩২
মাগরিব৬:২৯
এশা৭:৪৭
সূর্যোদয় - ৫:২৫সূর্যাস্ত - ০৬:২৪
পড়ুন