ইরান চুক্তি থেকে কেন সরতে চান ট্রাম্প
৩০ এপ্রিল, ২০১৮ ইং
ইরান চুক্তি থেকে কেন সরতে চান ট্রাম্প

শিফারুল শেখ

 

পরমাণু প্রকল্প নিয়ে উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে যুদ্ধের খাদের কিনারে চলে গিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। সেখান থেকে উঠে এসে এখন কোরীয় উপদ্বীপে শান্তির বাতাস বইছে। কিন্তু এরই মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে ইরানের সঙ্গে করা ছয় জাতির পরমাণু চুক্তি নিয়ে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প চুক্তিটিকে আর প্রত্যয়ন করবেন না বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন আগেই। আগামী ১২ মে’র মধ্যে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাবেন ট্রাম্প। ফ্রান্স এবং জার্মানিসহ চুক্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য দেশ ট্রাম্পকে বোঝানোর চেষ্টা করেও এখন পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছেন। ফলে চুক্তিটির ভবিষ্যত্ নিয়ে কেবল যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানে নয়, বিশ্ব জুড়েই আশঙ্কার সৃষ্টি হয়েছে। চুক্তিটি বাতিল হলে নতুন করে আরেক যুদ্ধ শুরু হতে পারে বলেও বিশ্লেষকরা সতর্ক করেছেন। আবার এতে কেবল দুই দেশই ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। কারণ ইতোমধ্যে ইরানের ওপর অবরোধের আশঙ্কায় তেলের দাম বেড়ে গেছে।

হুমকি জাতীয়তাবাদ: প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কেন ইরান চুক্তি থেকে সরে দাঁড়াতে চান তা নিয়ে বহুদিন ধরেই বিশ্লেষণ চলছে। অনেকেই মূলত ইসরাইলকে দায়ী করছেন। তারা বলছেন, ইসরাইলকে রক্ষা করতেই ট্রাম্প ইরানের ওপর ক্ষোভ ঝাড়ছেন। কিন্তু এবার আরেকটি বিষয় প্রকাশ্যে এনেছেন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ। তিনি বলেছেন, জাতীয়তাবাদ অনেক সময় বিশ্ব শান্তির জন্য হুমকি। ট্রাম্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও মার্কিন কংগ্রেসের যৌথ অধিবেশনে দাঁড়িয়ে ম্যাক্রোঁ বারবার আক্রমণ করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্টের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির ওপর। তিনি বলেন, আমরা সারা বিশ্ব থেকে নিজেদের আলাদা করতে পারি। কট্টর জাতীয়তাবাদকে বেছে নিতে পারি। কিন্তু এসবই ভয় কাটানোর জন্য সাময়িক পদক্ষেপ। তার মতে, বিশ্বের জন্য দরজা বন্ধ রাখলেও তা বদলে যাবে না। ভয়-ভীতি সন্ত্রাস থেমে যাবে না। বরং চাপা দেওয়ার চেষ্টা করলে জমে থাকা ভয় আরো বেরিয়ে আসবে। ট্রাম্প নির্বাচনী প্রচারণার সময় থেকেই ইরানের সঙ্গে আন্তর্জাতিক পরমাণু চুক্তিকে বাজে এবং একপেশে বলে মন্তব্য করে আসছেন। ২০১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, রাশিয়া, চীন, ফ্রান্স এবং জার্মানির সঙ্গে ইরানের পরমানু চুক্তি হয়।

যে কারণে চুক্তির বিপক্ষে ট্রাম্প: চুক্তির আগেই ধারণা করা হয়েছিল, চুক্তির কারণে ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞার খড়্গ উঠে যাবে এবং এতে তার মধ্যপ্রাচ্যে ছায়াযুদ্ধ চালানো, ইরাকের উপদলীয় সরকারকে সমর্থন ও সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদের সরকারকে সমর্থনের সক্ষমতা বাড়বে। বরং এই চুক্তিতে এমন কিছু নেই, যার কারণে ইরানের সব ধরনের পরমাণু-সম্পর্কিত গবেষণা বন্ধ বা ক্ষেপণাস্ত্র বানানোর কাজ ব্যাহত হবে। ইরানের কাছে ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ক্ষেপণাস্ত্রের যন্ত্রপাতি বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে আট বছরের জন্য, আর প্রথাগত অস্ত্র বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে পাঁচ বছরের জন্য। আবার এমন বিপদও আছে যে, ইরান চুক্তির শর্তের অংশবিশেষ পালন করতে পারবে না এবং নিষিদ্ধ কাজ হাতে নেবে। একটা বড় সমস্যার প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে কম। তা হলো ইরান যদি চুক্তির শর্তাবলী মেনে চলে, তাহলে কী হবে। চুক্তির শর্তাবলী ভঙ্গ না করলেও তো একটা সময়ে সেগুলোর মেয়াদ শেষ হবে, তারপর সে তার পারমাণবিক সীমাবদ্ধতা ভেঙে বেরিয়ে পড়তে পারে। তখন একমাত্র পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তি (এনপিটি) ছাড়া ইরানের রাশ টেনে ধরার উপযোগী কিছু থাকবে না; কিন্তু এনপিটি একটা স্বেচ্ছাভিত্তিক চুক্তি। এই চুক্তি ভাঙার জন্য শাস্তির বিধান নেই। নিষেধাজ্ঞা উঠে যাওয়ার পর ইরানের প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যে বেড়ে গেছে। শিয়া ধর্মাবলম্বী শাসিত ইরান নতুন পরাশক্তি হয়ে উঠছে মধ্যপ্রাচ্যে। সৌদি আরব এবং ইসরাইলের এ নিয়ে মাথা ব্যথা শুরু হয়েছে। সৌদি যুবরাজও হুমকি দিয়েছেন, ইরান পরমাণু অস্ত্র বানাতে পারলে তারা কেন পারবেন না।

ক্ষুব্ধ ইরান: খেপে উঠছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি। তার দেশের সঙ্গে করা পরমাণু চুক্তি নিয়ে আমেরিকা এবং ইউরোপীয় জোটের সক্রিয়তা দেখে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন তিনি। রুহানি বলেছেন, এই চুক্তিতে পরিবর্তন আনার কোনো এখতিয়ার রাষ্ট্রনেতাদের নেই। ট্রাম্প এবং ম্যাক্রোঁ জানিয়েছেন, তারা নতুন পরমাণু চুক্তি নিয়ে কাজ করছেন।

ক্ষতিগ্রস্ত হবে যুক্তরাষ্ট্রও: শুক্রবার ট্রাম্প এবং জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঞ্জেলা মার্কেল সংবাদ সম্মেলনে আন্তঃপ্রশান্তমহাসাগরীয় ঐক্য অটুট রাখার ওপর জোর দেন। ইরান, বাণিজ্য ও প্রতিরক্ষা প্রসঙ্গ অগ্রাধিকার পেয়েছে তাদের আলোচনায়। ফরাসি প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোঁর পর জার্মান চ্যান্সেলর ওয়াশিংটন সফর করলেন। মূলত ইরানের সঙ্গে পরমাণু চুক্তি বহাল রাখা এবং ইউরোপের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়ে আনাই এ সব সফরের মূল লক্ষ্য। ইরান প্রসঙ্গে ট্রাম্প বলেন, এই খুনি শাসকদের কাছে যেন পারমাণবিক অস্ত্র না থাকে তা আমাদের নিশ্চিত করতে হবে। মার্কেল বলেন,  ২০১৫ সালে ইরানের সঙ্গে যে চুক্তি করা হয়েছিল তা মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের প্রভাব কমানোর প্রথম পদক্ষেপ। তবে এটাও ঠিক যে, ইরানের উচ্চাকাঙ্খায় সীমা নির্ধারণ করতে এই উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। এর আগে আসছে ১২ মে’র মধ্যে চুক্তিতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন না আনলে ট্রাম্প তা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে সরিয়ে আনার ঘোষণা দিয়েছেন। মার্কেল, ম্যাক্রোঁ ও ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে চান চুক্তি বাতিল না হোক।

ইরান চুক্তি মানছে কিনা তা নিয়ে জার্মানির মাথা ব্যথা কম।   মূলত তাদের মাথা ব্যথা বাণিজ্য নিয়ে। এক হিসেবে দেখা গেছে, জার্মানি গত বছর ইরানে চার বিলিয়ন ডলারের বেশি পণ্য রপ্তানি করেছে। এর আগের বছরের চেয়ে দুই-তৃতীয়াংশ বেশি। শোনা গেছে, সিরিয়ায় রাসায়নিক অস্ত্রের উপাদান গেছে ইরান থেকে। আর সেটি সরবরাহ করেছে জার্মানির একটি কোম্পানি। ফলে মার্কেল দেশের স্বার্থেই পরমাণু চুক্তি বহাল রাখার কথা বলছেন। ফোর্ডহ্যাম ল’ স্কুলের জাতীয় নিরাপত্তা ইস্যু সম্পর্কিত বিশেষজ্ঞ ডেভিড এ অ্যান্ডেলম্যান মনে করেন, চুক্তি বাতিল করলেই যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থেও আঘাত লাগবে। সেটা হলো আন্তর্জাতিক স্বার্থ। মার্কিন মিত্ররা দূরে সরে যেতে পারে। রাশিয়া এবং চীন নতুন করে আরো শক্তি ফিরে পাবে। দেশ দুটি এখন সবচেয়ে বেশি চেষ্টা করছে যাতে চুক্তিটি বহাল থাকে। ইউরোপের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরাও চুক্তিটি বহাল রাখার আহবান জানিয়েছেন। ফলে বিশ্বে একা হয়ে পড়তে পারে যুক্তরাষ্ট্র।

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
৩০ এপ্রিল, ২০২১ ইং
ফজর৪:০৪
যোহর১১:৫৬
আসর৪:৩২
মাগরিব৬:২৯
এশা৭:৪৭
সূর্যোদয় - ৫:২৫সূর্যাস্ত - ০৬:২৪
পড়ুন