দ্রুত ছুটছে মিয়ানমার!
৩০ এপ্রিল, ২০১৮ ইং
দ্রুত ছুটছে মিয়ানমার!

শফিকুর রহমান রয়েল

 

ইয়াঙ্গুনের নবনির্মিত শপিং মলগুলো এখন মধ্যবিত্ত শ্রেণির লোকেদের ভিড়ে গমগম করে। এখন তাদের প্রধান পছন্দ হ্যামবার্গার ও ফ্রেন্স ফ্রাই। অথচ কয়েক বছর আগেও এ দুটি খাবারের খদ্দের ছিল কেবল পশ্চিমা পর্যটকেরা। এমন অনেক ব্যবসাই ফুলেফেঁপে উঠছে বর্তমান মিয়ানমারে। যে সুযোগ ছিল না দীর্ঘ পঞ্চাশ বছর। সামরিক সরকার ২০১০ সালে গণতান্ত্রিক সংস্কার শুরুর পর থেকেই পাল্টে যেতে শুরু করে দেশটি এবং পরিবর্তন ঘটছে খুব দ্রুত। পশ্চিমা সরকারগুলোর প্রায় সকল অবরোধ উঠে যাওয়াতেই পরিবর্তন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে দেশটিতে। বাণিজ্যিক রাজধানী ইয়াঙ্গুনে সব ভাড়াই বাড়ছে রকেটের গতিতে। জাগুয়ার, ল্যান্ড রোভার ও মার্সেডিজ-এর মতো বিলাসবহুল গাড়ির ডিলারশিপ বিক্রি সূচিত হয়েছে। হিল্টন ওয়ার্ল্ডওয়াইড সেখানে তাদের প্রথম হোটেলটি চালু করার আশা করছে এ বছরের শেষ নাগাদ। কোকা-কোলা ফিরে এসেছে ৬০ বছর পর। বেড়ে গেছে লোকজনের দৈনন্দিন চাহিদা।

চলতি অর্থবছরে মিয়ানমারের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দাঁড়াতে পারে ৮ দশমিক ৫ শতাংশ, যা কিনা আগের পূর্বাভাষের চেয়ে বেশি। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল-এর আগে বছরের মাঝামাঝি সময়ে জানিয়েছিল, প্রবৃদ্ধি হতে পারে বড়জোর ৭ দশমিক ৭ শতাংশ। গ্যাস উত্পাদন ও বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাওয়াতেই প্রত্যাশার চেয়ে প্রবৃদ্ধি বেশি ঘটবে বলে জানিয়েছে তারা। সেই সঙ্গে মুদ্রাস্ফীতি থাকবে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। চলতি অর্থবছর শেষ হবে আগামী মার্চে। আইএমএফ মিয়ানমারে তাদের মনিটরিং প্রোগ্রাম চালু করে গত বছর। তারা সেখানে কারিগরি সহযোগিতা আরো প্রগাঢ় করতে পারে। তাদের মূল্যায়ণ হচ্ছে— প্রায় আধা শতাব্দীর সামরিক শাসনের পর ২০১১ সালে মিয়ানমারে ক্ষমতা যায় কোয়াসি-সিভিলিয়ান সরকারের কাছে। আর তখন থেকেই অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংস্কার সাধিত হচ্ছে। আর এর প্রভাব পড়ছে সমাজ জীবনে।

বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে সরকার। হাত দিয়েছে চাকরি সৃষ্টি ও দুর্বল অবকাঠামোকে সবল করার কাজে। আইএমএফ-এর তথ্যানুসারে, ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় ব্যাংকে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছ থেকে স্বাধীনতা পাওয়ার পর থেকে তারা একের পর এক ইতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। বিনিময় হার এখন পুরোপুরিভাবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণে। গত সেপ্টেম্বরে কয়েকটি বিদেশি ব্যাংক লাইসেন্স প্রাপ্তির পর সীমিতভাবে তাদের কার্যক্রম চালুর অনুমতি পেয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, ম্যানুফ্যাকচারিং, তথ্যযোগাযোগ ও প্রাকৃতিক সম্পদ খাতে বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ বর্তমান অর্থবছরের তুলনায় আগামী অর্থবছরে অনেক বেড়ে যাবে। গত বছর মিয়ানমার টেলিকমিউনিকেশান লাইসেন্স প্রদান করে কাতারের ওরেদু ও নরওয়ের টেলিনরকে। উভয় কোম্পানিই দেশব্যাপী তাদের নেটওয়াক নির্মাণ করছে। আশা করছে, বড় শহরগুলোয় দু’-এক মাসের মধ্যেই তারা তাদের সেবা চালু করবে। তেল ও গ্যাস ব্লকগুলোতে অনুসন্ধান ও কার্যক্রম চালুর ব্যাপারে এ বছরের মার্চে মিয়ানমার চুক্তি স্বাক্ষর করে রয়েল ডাচ শেল, স্টাটইল, কনকোফিলিপস এবং টোটাল-এর সঙ্গে। গত অর্থবছরে মিয়ানমার গ্যাস রপ্তানি করেছিল ৩.৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের, যা আগের বছরের চেয়ে দশ গুণ বেশি। তাদের বেশিরভাগ গ্যাস গেছে প্রতিবেশী থাইল্যাান্ডে।

প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ বলেই মিয়ানমারের উজ্জ্বল ভবিষ্যত্ দেখছেন বিশ্লেষকরা। ড্রাই জোনের আয়েয়ারওয়াদি নামক স্থানে পাওয়া গেছে পেট্রোলিয়াম। কায়াহ রাজ্যে উত্তোলিত হচ্ছে টিন ও টাংস্টেন। সীসা, রুপা ও জিংক উত্তোলিত হচ্ছে শান রাজ্যের বিভিন্ন খনি থেকে। কয়লা, তামা, প্রাকৃতিক গ্যাস ও লোহারও বিপুল মজুদ রয়েছে। দামি পাথরের জন্যও মিয়ানমার বিখ্যাত। তবে এখন পর্যন্ত কৃষিনির্ভর। ৭০ শতাংশ লোকের জীবিকা কৃষি ও বনের উপর নির্ভরশীল। কৃষি উত্পাদনের অর্ধেকেরও বেশি স্থান দখল করে রয়েছে ধান। চীন, লাওস ও থাইল্যান্ড সীমান্তবর্তী এলাকায় উত্পন্ন হয় অবৈধ আফিম। গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গলের অংশ হিসেবে হেরোইন উত্পাদনের জন্য মিয়ানমারের একসময় বেশ নামডাক ছিল। তবে সেখানে এখন এই নিষিদ্ধ বস্তুটির উত্পাদন অনেক কমে এসেছে। মিয়ানমারের বাণিজ্যিক অংশীদার মূলত চীন, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর ও ভারত।

মিয়ানমারের প্রাকৃতিক সম্পদের দিকে নজর রয়েছে বহু দেশের। এর বাজার ধরতেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা জমে উঠেছে। যার বড় প্রমাণ কিছুদিনের ব্যবধানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার দ্বিতীয় বারের মতো মিয়ানমার ঘুরে যাওয়া। সফরের মূল উদ্দেশ্য রাজনৈতিক, এমন প্রচার পেলেও বোদ্ধারা ঠিকই বুঝতে পেরেছেন, অর্থনৈতিক স্বার্থ হাসিল করাটাই ছিল প্রকৃত লক্ষ্য।   —নিউ ইয়র্ক টাইমস অনুসরণে

 

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
৩০ এপ্রিল, ২০২১ ইং
ফজর৪:০৪
যোহর১১:৫৬
আসর৪:৩২
মাগরিব৬:২৯
এশা৭:৪৭
সূর্যোদয় - ৫:২৫সূর্যাস্ত - ০৬:২৪
পড়ুন