নাগেশ্বরীতে কাগজে-কলমে সচল থাকলেও কার্যক্রম নেই ৭৪ আনন্দ স্কুলের!
১১ মার্চ, ২০১৮ ইং
নাগেশ্বরীতে কাগজে-কলমে সচল থাকলেও কার্যক্রম নেই ৭৪ আনন্দ স্কুলের!

নাগেশ্বরী (কুড়িগ্রাম) সংবাদদাতা

নাগেশ্বরীতে কাগজে-কলমে সচল দেখানো হলেও কার্যক্রম নেই ৭৪ আনন্দ স্কুলের। ফলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বরাদ্দের টাকা ভাগ-বাটোয়ারা করে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

হতদরিদ্র ও ঝরে পড়া শিশুদের স্কুলমুখী করতে ‘রিচিং আউট অব স্কুল চিলড্রেন’ (রস্ক) প্রকল্প-২-এর আওতায় ২০১১ সালে পাঁচ বছর মেয়াদে নাগেশ্বরী উপজেলায় ১ম দফা ৩৯৫টি আনন্দ স্কুল চালু হয়। স্কুলগুলোর মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে ২০১৪ সালে উপজেলার চরাঞ্চলগুলোতে স্থাপন করা হয় আরো ৮৪টি আনন্দ স্কুল। এর মধ্যে ১০টি স্কুল কয়েক দিনের মধ্যে বন্ধ হয়ে যায়। এখনো কাগজে-কলমে সচল দেখানো হয়েছে কেদার ইউনিয়নে ১২টি, কচাকাটায় ৫, নারায়ণপুরে ৯, নুনখাওয়ায় ১৫, বল্লভেরখাসে ১৬, বেরুবাড়ী ইউনিয়নে ৭, কালিগঞ্জে ৩, রায়গঞ্জে ১ এবং বামনডাঙ্গা ইউনিয়নে ৩টি। বাকি ৩টি স্কুল কোথায় তা খুঁজে পাওয়া যায়নি।

এসব স্কুল পরিদর্শন ও সমন্বয়ের জন্য উপজেলায় একজন ট্রেনিং কো-অর্ডিনেটরের পাশাপাশি গত বছরের শেষে ৭ জন পুল শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়। তাদের পরিদর্শন রিপোর্ট অনুযায়ী স্কুলগুলো এখনো সচল। অথচ বাস্তবে এর চিত্র ভিন্ন রকম।

কেদার ইউনিয়নের সাহেবের খাস আনন্দ স্কুলে গিয়ে দেখা গেছে, ঘরে বেড়া থাকলেও ছাউনি নেই। ভিতরে কোনো আসবাবপত্র নেই। এর পাশেই সাইনবোর্ড বিহীন হাজীপাড়া আনন্দ স্কুল। ভিতরে খড়ের স্তূপ। একই অবস্থা সব আনন্দ স্কুলের। সাইনবোর্ড আছে, কিন্তু ঘরগুলো ব্যবহূত হচ্ছে অন্য কাজে। কোথাও ঘর পর্যন্ত নেই। কোথাও শিক্ষক ও শিক্ষার্থী কেউই নেই। কাগজে-কলমে থাকলেও পড়ালেখা নেই। অথচ শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি, উপকরণ, পোশাক, শিক্ষকের বেতন, ঘরভাড়ার টাকা তোলা হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

এসব স্কুলে নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকের অধিকাংশই মেয়ে। সাহেবের খাস আনন্দ স্কুলের শিক্ষক নারজুমান আক্তার। বিয়ে হয়ে তিনি শ্বশুরবাড়িতে থাকায় তার বাবা আব্বাস উদ্দিন ওই স্কুল চালান বলে দাবি করেছেন। তবে শিক্ষার্থী হাজিরা খাতা দেখতে চাইলে তিনি তা দেখাতে পারেননি।

বরাদ্দ অনুযায়ী বছরের শুরুতে শিক্ষার্থীদের পোশাক তৈরিতে ৪০০, প্রতি মাসে শিক্ষা উপকরণ বাবদ ১ম-৩য় শ্রেণি ২শ, ৪র্থ-৫ম শ্রেণি ৩শ ও পরীক্ষা বাবদ ১০০ টাকা পাওয়ার কথা। প্রতিমাসে শিক্ষকের সম্মানী ৩ হাজার, স্কুলঘর ভাড়া ৪০০ এবং ঘর মেরামতের জন্য বছরে দেওয়া হয় এক হাজার টাকা।

হাজীপাড়া আনন্দ স্কুলের শিক্ষার্থী হিসেবে নাম আছে এমন শিক্ষার্থী মাজেদা খাতুন মিনা বলল, ‘ক্লাস ওয়ান থেকে ফাইভে উঠেছি। বছরের ২ মাস পেরিয়ে গেলেও ফাইভের বই এখনো পাইনি। ক্লাস টুতে পড়ার সময় একবার পোশাক পাইছি। ওই বার ১০০ এবং আর একবার ২০০ টাকা পাই।’ একই কথা বলেছে পঞ্চম শ্রেণির আতাউর রহমান। চতুর্থ শ্রেণির সাহিদা বলল, ‘আমি একবারও পোশাক পাইনি।’

কেদার ইউনিয়ন পুল শিক্ষক নুর মোহাম্মদ, হাজীপাড়া স্কুলে গিয়ে তার সঙ্গে কথা হয়। তিনি বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে সংবাদ পরিবেশন করলে আমারসহ শিক্ষকদের বেতন বন্ধ হতে পারে। এবারের মতো বিষয়টি ছেড়ে দিন।’ এদিকে, খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কেদারের সাতানা আনন্দ স্কুলে কোনো শিক্ষার্থী নেই।

স্থানীয়রা জানান, শুরুতে এসব স্কুল টাকার বিনিময়ে দেওয়া হয়। শিক্ষক নিয়োগেও টাকা নেওয়া হয়। প্রথম দিকে সাইনবোর্ড টাঙানো হলেও ধীরে ধীরে সেগুলো হারিয়ে যায়। তবে এসব স্কুলে কাগজে-কলমে দেখানো আছে ১০ থেকে ১৫ জন শিক্ষার্থী।

শিবেরহাটের ইসমাইল হোসেন বলেন, ‘স্কুল খোলে না। টাকা আসলে দুই চারজনকে টাকা দেওয়া হয়। যাদের নাম আছে, তারা গেলে বলা হয় নাম কাটা পড়েছে। অভিভাবক গেলে ১০০ টাকা হাতে ধরিয়ে দেওয়া হয়। চার বছরে তার ভাগিনা উপবৃত্তির টাকা পায়নি একবারও।’

অভিভাবক কুলছুম আক্তার বলেন, ‘ছেলেটাকে আনন্দ স্কুলত দিছি পড়া পড়বে, উপবৃত্তিও পাইবে। কয়দিন স্কুল চলিল। পরে স্কুল খোলে না। অফিসার আসলে ডেকে নেয়। পোশাকও দেয় না, টাকাও দেয় না। এ জন্য মাদ্রসাতে ভর্তি করি দিছি।’

রস্ক প্রকল্পের উপজেলা ট্রেনিং কো-অর্ডিনেটর (টিসি) মো. আল মামুন বলেন, ‘অমার কাছে তেমন কোনো অভিযোগ নেই। আমি টাকা নিই—এটা কেউ বলতে পারবে না।’

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শংকর কুমার বিশ্বাস বলেন, ইতোমধ্যে বিষয়টি আমার নজরে এসেছে। আমি ঐ বিদ্যালয়ের পরিদর্শককে টেকে বিদ্যালয়গুলো পরিদর্শন করে প্রতিবেদন দিতে বলেছি। আমি এ ব্যাপারে কোন অনিয়ম বরদাস্ত করবো না। যারা অনিয়ম করবে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
১১ মার্চ, ২০১৯ ইং
ফজর৪:৫৬
যোহর১২:০৯
আসর৪:২৭
মাগরিব৬:০৯
এশা৭:২১
সূর্যোদয় - ৬:১১সূর্যাস্ত - ০৬:০৪
পড়ুন