তিস্তা নির্ভর নদ-নদী মৃত্যুমুখে
অস্তিত্ব সংকটে রংপুরের ১৪ নদী
৩০ এপ্রিল, ২০১৮ ইং
অস্তিত্ব সংকটে রংপুরের ১৪ নদী

আমিনুল ইসলাম জুয়েল, পীরগাছা (রংপুর) সংবাদদাতা

দুই পাশে ধানের ক্ষেত আর মাঝ দিয়ে বয়ে যাওয়া নালার মতো এই গো-চারণ ভূমি দেখে বোঝার উপায় নেই এটিই মাষাণ কুড়া নদী। এক সময় এই নদী দিয়েই চলতো পাল তোলা নৌকা, জেলেরা সংসার চালাতো মাছ ধরে। তবে বেদখল এবং বছরের পর বছর ড্রেজিং না করায় পলি জমে কমবেশি এমনই অবস্থা রংপুরের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া তিস্তা, বুড়ি তিস্তা, আখিরা, যমুনেশ্বরী, ঘাঘট নদ, খোকসা ঘাঘট, মানাস, ইছামতি, আলাই কুমারী, বুড়াইল, বুল্লাই, টেপা, ধুম নদী ও মাষাণ কুড়ার। তিস্তা নির্ভর নদ-নদীগুলো এখন মৃত্যু মুখে পতিত হচ্ছে।

রংপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তথ্য অনুযায়ী, রংপুরের ওপর দিয়ে প্রবাহিত ছোট-বড় নদ-নদীর সংখ্যা ১৪টি। এগুলো হলো তিস্তা, বুড়ি তিস্তা, আখিরা, যমুনেশ্বরী, ঘাঘট নদ, খোকসা ঘাঘট, মানাস, ইছামতি, আলাই কুমারী, বুড়াইল, বুল্লাই, টেপা, ধুম নদী ও মাষাণ কুড়া নদী। বর্ষা মৌসুমে নদ-নদীগুলোতে পানি থাকলেও বছরের বাকি সময় থাকে শুকনা।

তিস্তা নদী রংপুরের গঙ্গাচড়া, কাউনিয়া ও পীরগাছার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। তিস্তা ব্যারাজের ভাটিতে নদীর দেড়শ কিলোমিটার এলাকা এখন মরা গাঙ্গে পরিণত হয়েছে। যৌবন হারা তিস্তার বুকে জেগে উঠেছে বড় বড় চর। যতদূর চোখ যায় শুধু ধু-ধু বালুচর। তিস্তার বুক চিরে এখন নৌকার পরিবর্তে নানা রকমের যানবাহন চলাচল করছে। চরে বিভিন্ন ধরনের ফসলেরও আবাদ হচ্ছে। নাব্য সংকট ও দখলের কারণে বুল্লাই, টেপা, ধুম ও ইছামতি নদী রংপুরের মানচিত্র থেকে হারিয়ে গেছে। অস্তিত্ব হুমকিতে রয়েছে তিস্তা, বুড়াইল নদী ও ঘাঘট নদ। আলাই কুমারী ও মাষাণ কুড়া মানচিত্র থেকে হারিয়ে যেতে বসেছে।

রংপুরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে ঘাঘট নদ। দখল হয়ে যাওয়ায় ৫০ ফুট প্রশস্ত ঘাঘট নদ এখন ১০ ফুটে এসে ঠেকেছে। ঘাঘট নদী নীলফামারী জেলার জলঢাকা উপজেলার তিস্তা নদী থেকে উত্পত্তি লাভ করেছে। উত্তর থেকে দক্ষিণ-পূর্ব দিকে নদীটি সর্পিল গতিতে রংপুর দিয়ে গাইবান্ধা শহরে প্রবাহিত হয়ে ফুলছড়িঘাট থেকে কয়েক কিলোমিটার উত্তরে ব্রহ্মপুত্র নদের সঙ্গে মিলিত হয়েছে। ঘাঘট আঁকাবাঁকা পথে ১২০ কিলোমিটার জুড়ে শুকিয়ে গেছে। এক সময় দূর-দূরান্ত থেকে ব্যবসায়ীরা আসত ব্যবসা করার জন্য। ঘাঘটের ঘাটে ভিড়ত অসংখ্য বাণিজ্য তরী। নদীপথে বিভিন্ন পণ্য সরবরাহ করত লোকজন। শুকনা মৌসুমে পানি প্রবাহ এখন শূন্যের কোটায়।

রংপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-সহকারী প্রকৌশলী ফজলুল হক জানান, ভারত একতরফাভাবে পানি প্রবাহ প্রত্যাহার করে নেওয়ায় নদটির এখন এই দশা। সরকার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে নদীটি খনন করলে এলাকার মানুষের অনেক উপকারে আসবে।

বুড়াইল নদী রংপুর জেলার একটি নদী। রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার সরাই ইউনিয়নের বিলাঞ্চলে বুড়াইল নদীর উত্স। নদীটির দৈর্ঘ্য ৫৪ কিলোমিটার, গড় প্রস্থ ৩৬ মিটার এবং নদীটির প্রকৃতি সর্পিলাকার। রংপুরের পীরগাছা উপজেলার ছাওলা ও তাম্বুলপুর ইউনিয়নের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে তিস্তায় মিলিত হয়েছে।

আলাইকুমারী নদী রংপুর জেলা সদর ও পীরগাছা উপজেলার বিস্তৃত নিম্নাঞ্চল থেকে নদীটি উত্পত্তি হয়ে পীরগাছা উপজেলার ঘাঘট নদে মিলিত হয়েছে। স্থানীয়ভাবে নদীটি আলাইকুড়ি নামে পরিচিত। নদীটিতে বর্ষা মৌসুমেই শুধু পানি প্রবাহিত হয়। ফেব্রুয়ারি মাসে নদীতে পানি থাকে না। বর্তমানে মৃত নদীতে পরিণত হয়েছে।

মাষাণ কুড়া নদী উপজেলার কৈকুড়ী ইউনিয়নে ঘাঘট নদ থেকে উত্পত্তি হয়ে কান্দি ইউনিয়নের ওপর দিয়ে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় গিয়ে তিস্তায় মিলিত হয়েছে। এই নদীটিও নাব্য সংকটে পড়েছে।

রিভাইন পিপলের পরিচালক ও নদী গবেষক ড. তুহিন ওয়াদুদ বলেন, নদী দখল করে স্থাপনা তৈরির পাশাপাশি ফসলের আবাদ করায় নদ-নদীগুলো অস্তিত্ব হারাতে বসেছে।

রংপুর পাউবোর পানি বিজ্ঞান শাখার (হাইড্রোলজি বিভাগ) ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা উপ-সহকারী প্রকৌশলী আমিনুর রশীদ বলেন, দেশের নদ-নদীগুলোতে প্রতি বছর প্রায় সাড়ে তিন কোটি টন (৫৫২ লাখ ঘনমিটার) পলি-বালি জমে। নদ-নদীগুলোকে ব্যবহার উপযোগী রাখতে হলে প্রতি বছর ৫১৮ ঘনমিটার পলি-বালি ড্রেজিং করা দরকার। করা হয় মাত্র ৯০ লাখ ঘনমিটারের মতো। কিন্তু গত ৪৭ বছরে রংপুরের কোনো নদ-নদী ড্রেজিং করা হয়নি।

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
৩০ এপ্রিল, ২০২১ ইং
ফজর৪:০৪
যোহর১১:৫৬
আসর৪:৩২
মাগরিব৬:২৯
এশা৭:৪৭
সূর্যোদয় - ৫:২৫সূর্যাস্ত - ০৬:২৪
পড়ুন