দেশে স্তনক্যান্সারে বছরে ৩৬ হাজার রোগীর মৃত্যু
রাবেয়া বেবী২৩ অক্টোবর, ২০১৪ ইং
দেশে স্তনক্যান্সারে বছরে ৩৬ হাজার রোগীর মৃত্যু
সঠিক খাদ্যাভ্যাস ও জীবন-যাপন প্রণালীর অভাবে উন্নত বিশ্ব অপেক্ষা দেশে অধিক সংখ্যক তরুণী স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছে। দেশের স্তন ক্যান্সার রোগীর মধ্যে ১০ থেকে ১৫ শতাংশই তরুণী। ধারণা করা হয়, ফাস্ট ফুডের অতিরিক্ত আসক্তি, শাক-সবজি ও ফল-মূল খাওয়ায় অনীহা, ভেজাল খাদ্য গ্রহণ ও নিয়মিত ব্যায়াম বা হাঁটার অভ্যাস না থাকায় এই শ্রেণির মেয়েরা স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হচ্ছে।

জাতীয় ক্যান্সার ইনস্টিটিউটে সরেজমিনে গেছে, ২১ বছর বয়সের এক তরুণী স্তন ক্যান্সার আক্রান্ত। তিনি বুকে একটি বড় চাকা নিয়ে এখানে চিকিত্সার জন্য আসেন। কয়েক মাস হলো তার বিয়ে হয়েছে। পরিবারের সবাই এখন তাকে নিয়ে চিন্তিত। শাক-সবজির প্রতি তার সব সময় অনীহা ছিল। চিকিত্সক জানান, ক্যান্সার তার স্তন থেকে ফুসফুসেও সংক্রমিত করেছে। ফুসফুসেও একটি চাকা তৈরি হয়েছে। তার প্রথমে বুকে এবং পরে ফুসফুসে অপারেশন করা হবে। আর এক তরুণী মাত্র ১৮ বছর বয়সে স্তনে একটি চাকা অনুভব করে মাকে জানায়। মা তাকে জাতীয় ক্যান্সার ইনস্টিটিউটে নিয়ে আসেন। পরীক্ষা করে নিশ্চিত হওয়া যায় তারও ক্যান্সার হয়েছে। তার মা জানান, মেয়ে ফাস্ট ফুড বেশি খেতো। এমন অনেক তরুণী জাতীয় ক্যান্সার ইনস্টিটিউটে স্তন ক্যান্সার চিকিত্সা নিচ্ছেন।

উন্নত দেশগুলোতে ত্রিশ বছর পরে এমনকি চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ বছর বয়সে স্তন ক্যান্সার ঝুঁকি থাকে। আমাদের দেশে উল্লেখিত বয়সের নারীদের স্তন ক্যান্সার হলেও তরুণীদের মধ্যেও স্তন ক্যান্সার বেড়ে চলেছে বলে জানান সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। ত্রিশের পরে বা চল্লিশ কিংবা পঞ্চাশ বছরে হওয়া স্তন ক্যান্সারের চেয়ে তরুণীদের স্তন ক্যান্সার বেশি আক্রমণাত্মক হয়ে থাকে। যত কম বয়সে স্তন ক্যান্সার ধরা পড়ে, রোগীর জন্য তা তত বেশি ঝুঁকিপূর্ণ বলে মন্তব্য করেন চিকিত্সকরা।

এই বিষয়ে জাতীয় ক্যান্সার ইনস্টিটিউটের স্টো প্যাথলজি বিভাগের অধ্যাপক মোঃ গোলাম মোস্তফা ইত্তেফাককে বলেন, টিনএজ ক্যান্সার রোগী গ্রাম শহর সব জায়গায় দেখা যাচ্ছে। এর কারণ হিসেবে বর্তমানের ভেজাল খাদ্য গ্রহণ অন্যতম কারণ। তিনি বলেন, বংশগত ক্যান্সার ছাড়াও শহরে এই বয়সের মেয়েদের মধ্যে ফাস্ট ফুড প্রীতি স্তন ক্যান্সার ঝুঁকি বাড়ায়। তাছাড়াও দুই এক তলার জন্য সিঁড়ি না ব্যবহার করে লিফট ব্যবহার, হাঁটার অভ্যাস কম, নিয়মিত ব্যায়াম না করা ও কায়িকশ্রম কম করা টিনএজ ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়। তারা মাদকাসক্ত কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মাদক গ্রহণ স্তন ক্যান্সারের একটি কারণ বটে, তবে আমরা তাদের কাছে এই বিষয় প্রশ্ন করি না।

তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক ক্যান্সার গবেষণা সংস্থা গ্লোবক্যান পরিসংখ্যান মতে, দেশে প্রতিবছর স্তন ক্যান্সারে ১৭ হাজার ৭শ’ ৮১ জন নারী আক্রান্ত হন এবং এই কারণে অন্তত আট হাজার ৩শ’ ৯৬ জনের মৃত্যু ঘটে। তবে প্রকৃত সংখ্যা আরও অনেক বেশি হতে পারে।

সংশ্লিষ্ট চিকিত্সকের হিসাব মতে, প্রতিবছর ৩৬ হাজার রোগী স্তন ক্যান্সারের কারণে মারা যায়। এদের মধ্যে টিনএজদের সংখ্যা প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার। তবে সঠিক পরিসংখ্যান নেই বলে তাদের ধারণার উপর ভিত্তি করে কাজ করতে হয়।

টিনএজ স্তন ক্যান্সার আক্রান্ত হলে তা কতটুকু নিরাময়যোগ্য এমন এক প্রশ্নে জবাবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের গাইনি ক্যান্সার বিভাগের প্রধান অধ্যাপক সাবেরা খাতুন বলেন, স্তন ক্যান্সারের চারটি স্তর নির্ধারণ করে আমরা চিকিত্সা করি। প্রথম ধাপে ধরা পড়লে এর সম্পূর্ণ নিরাময় সম্ভব। আর অন্য স্তরগুলোতে পর্যায়ক্রমে জটিল থেকে জটিলতর অবস্থা থাকে। ফলে রোগীকে বাঁচানো তখন কঠিন হয়ে পড়ে। টিনএজ স্তন ক্যান্সার রোগীদের চিকিত্সা সম্পর্কে তিনি বলেন, দুই ভাবে আমরা রোগীদের চিকিত্সা করি। প্রথমে ক্যামোথ্যারাপি দিয়ে চাকাটা ছোট করে অপারেশন করি। ক্যান্সারের প্রার্দুভাবের প্রকোব থেকে রোগীকে রক্ষা করি। পরে প্রয়োজন বোধে রেডিও থ্যারাপিও দেয়া হয়। এক্ষেত্রে রোগী নিজে চাকা অনুভব করে পরে অভিভাবকদের জানান। অভিভাবক চিকিত্সকের কাছে আনতে আনতে রোগ শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে বেশিরভাগ সময়ে অভিভাবকরা দ্বিতীয়, তৃতীয় এবং ক্ষেত্র বিশেষে চতুর্থ পর্যায়ে চিকিত্সকের কাছে আসে।

সাবেরা খাতুন আরও বলেন, আমি অনেক নারীকে দেখেছি স্তনে চাকা দেখা দিলে তারা শুরুতে হোমিওপ্যাথি চিকিত্সকের শরণাপন্ন হন। এতে ঝুিঁক আরও বেড়ে যায়। টিভিতে আয়ুর্বেদিক চিকিত্সার নামে ক্যান্সার নিরাময়ের অনেক রকম বিজ্ঞাপন দেখানো হয়। তিনি এই সকল প্ররোচণা থেকে সকলকে দূরে থাকতে পরামর্শ দেন।

অধ্যাপক মোঃ গোলাম মোস্তাফা বলেন, যত কম বয়সে স্তন ক্যান্সার, ক্ষতির পরিমাণ তত বেশি হয়। চল্লিশ পঞ্চাশ কিংবা ষাট ঊর্ধ্ব স্তন ক্যান্সার নিরাময় সহজ। এই বয়সের রোগীরা অনেকদিন ক্যান্সার সারভাইবাল হিসাবে বেঁচে থাকতে পারে। যা অল্প বয়সে স্তন ক্যান্সার আক্রান্তদের ক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবে সম্ভব হয় না। চিকিত্সা করেও পাঁচ বছরের অধিক সময় তাদের বাঁচিয়ে রাখা যায় না।

এদিকে বুধবার জাতীয় প্রেসক্লাবে বিশ্ব স্তন ক্যান্সার সচেতনতা মাস উপলক্ষে আয়োজিত মহিলা সমিতির কাউন্সিলিং সভা অনুষ্ঠিত হয়। সমিতির সভাপতি সিতারা আহসানউল্লাহর সভাপতিত্বে ‘ভয় নয় ক্যান্সার জয়’ শীর্ষক এই কাউন্সিলিং উদ্বোধন করেন কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন। আরও বক্তব্য রাখেন মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক শাহীন আনাম, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব প্রিয়া সর্বজয়া, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের রেডিয়েশন অনকোলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক গোলাম মহিউদ্দিন ফারুক, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অনকোলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক সারওয়ার আলম, বাংলাদেশ ক্যান্সার সোসাইটির মহাসচিব অধ্যাপক শেখ গোলাম মোস্তফা প্রমুখ।

পরে বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা বিভিন্ন স্তরের স্তন ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীদের কাউন্সিলে অংশ নেন।

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
২৩ অক্টোবর, ২০২১ ইং
ফজর৪:৪৩
যোহর১১:৪৩
আসর৩:৪৯
মাগরিব৫:২৯
এশা৬:৪২
সূর্যোদয় - ৫:৫৯সূর্যাস্ত - ০৫:২৪
পড়ুন