আইন প্রয়োগের দুর্বলতায় বাড়ছে শব্দ দূষণ
ইত্তেফাক রিপোর্ট০১ ফেব্রুয়ারী, ২০১৭ ইং
শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণ আইন ও বিধি-বিধান থাকলেও সেগুলোর প্রয়োগ না থাকায় রাজধানীতে শব্দ দূষণের মাত্রা দিনদিন বাড়ছে। সেই সাথে জনগণের অসচেতনতা ও অবহেলাও শব্দ দূষণের জন্য দায়ী। আইন প্রয়োগের দুর্বলতা এবং জনসচেতনতার অভাবই শব্দ দূষণ মাত্রাতিরিক্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। গতকাল মঙ্গলবার পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পবা) মিলনায়তনে ‘ঢাকা মহানগরীতে শব্দ দূষণের বর্তমান চিত্র ও করণীয়’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য উঠে আসে।

সংবাদ সম্মেলনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাপার সাধারণ সম্পাদক প্রকৌশলী মো. আব্দুস সোবহান।

পবার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, ক্রমাগত শব্দ দূষণের ফলে কানের টিস্যুগুলো আস্তে আস্তে বিকল হয়ে পড়ে। তখন স্বাভাবিক শব্দ কানে শুনতে পাওয়া যায় না। শব্দ দূষণের কুফল বিষয়ে জনসচেতনতার অভাব এবং শব্দ দূষণ প্রতিরোধে যথাযথ প্রশাসনিক নজরদারি ও পদক্ষেপের ঘাটতির কারণেই এমনটি হচ্ছে।

পবা’র সাধারণ সম্পাদক প্রকৌশলী আব্দুস সোবহান বলেন, শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালা ২০০৬ এর আওতায় নীরব, আবাসিক, মিশ্র, বাণিজ্যিক বা শিল্প এলাকা চিহ্নিত করা হয়েছে। এ সব এলাকায় শব্দের মানমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে এবং কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান কোনো এলাকায় শব্দের সর্বোচ্চ মানমাত্রা অতিক্রম করতে পারবে না। নীরব এলাকা হচ্ছে হাসপাতাল, অফিস-আদালত ইত্যাদি এবং এর চারপাশের ১০০ মিটার পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকা। নীরব এলাকায় চলাচলকালে যানবাহনে কোনো প্রকার হর্ন বাজানো এবং মোটর, নৌ বা অন্য কোনো যানে অনুমোদিত শব্দের মানমাত্রা অতিক্রমকারী হর্ন ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কিন্তু শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণে আইন ও বিধি-বিধান থাকলেও সেগুলোর কোনো প্রয়োগ না থাকায় রাজধানীতে শব্দ দূষণের মাত্রা দিনদিন বাড়ছে।

বক্তারা বলেন, সিটি করপোরেশন, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ ও নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, পৌরসভা, ইউনিয়ন পরিষদ নিজ এলাকার মধ্যে নীরব, আবাসিক, বাণিজ্যিক, শিল্প বা মিশ্র এলাকা চিহ্নিত করে সাইনবোর্ড স্থাপন ও সংরক্ষণ করার জোর দাবি জানান।

তারা বলেন, শব্দ দূষণের ফলে মানুষের মানসিক ও শারীরিক সমস্যা ঘটতে পারে। উচ্চ শব্দ শিশু, গর্ভবতী মা এবং হূদরোগীদের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। শিশুদের মানসিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত করছে। আকস্মিক উচ্চ শব্দ মানবদেহে রক্তচাপ ও হূদকম্পন বাড়িয়ে দেয়। মাংসপেশির সংকোচন করে এবং পরিপাকে বিঘ্ন ঘটায়।

এ ছাড়াও শ্রবণশক্তি কমে আসে। বধির হওয়ার মত অবস্থার সৃষ্টি হয়। মাথা ব্যথা, বদ হজম, অনিদ্রা, মনোসংযোগ কমে যাওয়া, খিটখিটে মেজাজ, বিরক্তিবোধ, এমনকি অস্বাভাবিক আচরণ করার মত মনোদৈহিক নানা সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। হঠাত্ বিকট শব্দ যেমন— যানবাহনের তীব্র হর্ন বা পটকা ফাটার আওয়াজ মানুষের শিরা ও স্নায়ুতন্ত্রের উপর প্রচণ্ড চাপ দেয়। এ ধরনের শব্দের প্রভাবে সাময়িকভাবে রক্ত প্রবাহে বাধার সৃষ্টি হয়। রক্তনালী সংকুচিত হয়, রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। উচ্চ শব্দ সৃষ্টিকারী হর্ন মোটরযানের চালককে বেপরোয়া ও দ্রুত গতিতে যান চালাতে উত্সাহিত করে। ফলে সড়ক দুর্ঘটনার আশঙ্কাও বৃদ্ধি পায়।

পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন (পবা) চলতি জানুয়ারি মাসে ঢাকা মহানগরীর ৪৫টি স্থানে শব্দের মাত্রা পরিমাপ  করে। স্থানগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- এয়ারপোর্ট, কুড়িল বিশ্ব রোড, মহাখালী, ফার্মগেট, বাংলামোটর, শাহবাগ, জাতীয় প্রেসক্লাব, পল্টন, গুলিস্তান, মতিঝিল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, নীলক্ষেত, আজিমপুর, নিউ মার্কেট, সাইন্স ল্যাব, কলাবাগান, ধানমন্ডি, পান্থপথ, ধানমন্ডি ২৭, কলেজ গেইট, শ্যামলী, টেকনিক্যাল, মিরপুর। জরিপকৃত স্থানগুলো নীরব, আবাসিক, মিশ্র ও বাণিজ্যিক এলাকা।

নীরব এলাকায় দিবাকালীন শব্দের মাত্রা ৮৩ দশমিক ৩ থেকে ১০৪ দশমিক ৪ ডেসিবল। আবাসিক এলাকায় দিবাকালীন ৯২ দশমিক ২ থেকে ৯৭ দশমিক ৮ ডেসিবল এবং রাত্রিকালীন ৬৮ দশমিক ৭ থেকে ৮৩ দশমিক ৬ ডেসিবল। মিশ্র এলাকায় দিবাকালীন ৮৫ দশমিক ৭ থেকে ১০৫ দশমিক ৫ ডেসিবল এবং রাত্রিকালীন ৮৫ দশমিক ৭ থেকে ১০৬ দশমিক ৪ ডেসিবল। বাণিজ্যিক এলাকায় দিবাকালীন শব্দের মাত্রা ৯৪ দশমিক ৩ থেকে ১০৮ দশমিক ১ ডেসিবল। বাসের ভিতর শব্দের মাত্রা সামনে ৯৩ দশমিক ৬ থেকে ৯৫ দশমিক ২ ডেসিবল ও পিছনে ৮৪ দশমিক ৬ থেকে ৮৫ দশমিক ৪ ডেসিবল। বাংলামটরে অ্যাম্বুলেন্স এর সাইরেন বাজানোকালে শব্দের মাত্রা ১১০ দশমিক ১ ডেসিবল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় শব্দের মাত্রা ৯৫ দশমিক ৮ থেকে ৯৬ দশমিক ৭ ডেসিবল।

পবা’র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ডা. লেলিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন মডার্ন ক্লাবের সভাপতি আবুল হাসানাত, পবা’র সহ-সম্পাদক স্থপতি শাহীন আজিজ, সদস্য ক্যামেলিয়া চৌধুরী, বিসিএইচআরডি-এর সভাপতি মাহবুবুল হক, ডাব্লিউবিবি ট্রাস্ট-এর প্রকল্প কর্মকর্তা আতিকুর রহমান, বাংলাদেশ সাইকেল লেন বাস্তবায়ন পরিষদ-এর উপদেষ্টা মুহাম্মদ আবদুল ওয়াহেদ প্রমুখ।

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
১ ফেব্রুয়ারী, ২০২১ ইং
ফজর৫:২১
যোহর১২:১৩
আসর৪:০৯
মাগরিব৫:৪৮
এশা৭:০৩
সূর্যোদয় - ৬:৩৯সূর্যাস্ত - ০৫:৪৩
পড়ুন