বিচারহীনতায় বাড়ছে কিশোরী হত্যার ঘটনা
২১ ডিসেম্বর, ২০১৭ ইং
রাবেয়া বেবী

গত ১৬ ডিসেম্বর রাতে সুনামগঞ্জের দিরাই পৌর শহরে বখাটে যুবকের ঘোষণা দিয়ে সুমাইয়া আক্তার মুন্নী নামে এক এসএসসি পরীক্ষার্থীকে হত্যার ঘটনায় উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মানবাধিকার কর্মী ও নারী নেত্রীরা। তারা বলছেন, বিচারহীনতা, শাস্তির দৃষ্টান্ত না থাকা , অপরাধ করে পার পেয়ে যাওয়া, পেশিশক্তির প্রভাব, রাজনৈতিক ক্ষমতা এবং টাকার কাছে বিচার ব্যবস্থা জিম্মি বলেই এমন নৃশংস ঘটনা বারবার ঘটছে। এ অবস্থার অবসান হওয়া দরকার। আর এজন্য আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন জরুরি।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের প্রতিবেদন মতে, গত মাসে উত্ত্যক্তের শিকার ১৭ জন নারী ও কন্যা শিশু, তার মধ্যে উত্ত্যক্তের কারণে আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছে ৪ জন। অন্যান্য কারণে ৪৯ জন আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছে এবং ২৯ জনের রহস্যজনক মৃত্যু হয়েছে। একই সময় ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে মোট ১০৭টি । তার মধ্যে গণধর্ষণের শিকার হয়েছে ১৩ জন। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ২ জনকে। এছাড়া ধর্ষণের চেষ্টা করা হয়েছে ১১ জনকে। শ্লীলতাহানির শিকার হয়েছে ৪ জন। যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে ৩ জন।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘ভায়োলেন্স অ্যাগেইনেস্ট উইমেন সার্ভে ২০১৫’ শীর্ষক জরিপ অনুযায়ী দেশের এক-চতুর্থাংশের বেশি নারী বিভিন্ন সময় ঘরের বাইরে নানাভাবে যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। কিশোরীদের ক্ষেত্রে এ নির্যাতনের মাত্রা ৩০ শতাংশেরও বেশি। ১৫ থেকে ১৯ বছর বয়সী কিশোরী-নারীদের প্রায় ৪০ শতাংশ যৌন নির্যাতনের শিকার হন পথেঘাটে।

আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে উত্ত্যক্তের মাধ্যমে যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটেছে ১৭৬টি। অপমানে আত্মহত্যা করেছেন ৬ নারী। উত্ত্যক্তের প্রতিবাদ করতে গিয়ে পাঁচ নারী, এমনকি ছয় পুরুষকেও প্রাণ দিতে হয়েছে।

এ অবস্থা পরিবর্তনে বিচারের দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে বলে উল্লেখ করেছেন মানবাধিকার আইনজীবী অ্যাডভোকেট সালমা আলী। তিনি বলেন, আমাদের এই সকল ঘটনা প্রতিহত করার জন্য আইন আছে, নির্দেশনা আছে, তারপরও একের পর এক ঘটনা ঘটে যাচ্ছে। আগে থেকে নিরাপত্তা চেয়ে কেন মুন্নীর পরিবার নিরাপত্তা পেল না, সেটা আমার প্রশ্ন। কারণ আমাদের সামনে কোনো বিচারের দৃষ্টান্ত নেই। ছেলেরা বিভিন্নভাবে পথভ্রষ্ট হচ্ছে। তাদের সামলে রাখতে সামাজিক ও পারিবারিকভাবে আমরা আমাদের দায়িত্ব পালন করছি কিনা তাও খতিয়ে দেখতে হবে। তিনি বলেন, কোর্টে নারীবান্ধব পরিবেশ নেই। ধর্ষণের শিকার হয়ে কেউ আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে প্রতিকার চাইতে গেলে নানাভাবে হয়রানি হতে হয়। তার চেয়ে বড় কথা, তারা কেন আপোষের পরামর্শ দেন? বস্তুত সংশ্ল্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান নারীবান্ধব হতে পরেনি। এসব ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী ও সাক্ষী সুরক্ষা একটি বড় বিষয়। সুরক্ষা ও নিরাপত্তাহীনতার জন্য মেয়েরা বারবার এমন হত্যার শিকার হচ্ছে। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে চার্জশিট দেয়া, আসামির আদালতে হাজির হওয়া, বিচার হওয়া সব কিছুরই নির্দিষ্ট সময় দেয়া আছে। কেন সেই সময় অনুযায়ী বিচার হয় না। স্বচ্ছতা জবাবাদিহিতার জায়গাগুলো ঠিক না হলে আমরা সুবিচার পাব না। বলতে হয়, বিচারহীনতায় বাড়ছে বখাটেদের দৌরাত্ম্য ।

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ সাধারণ সম্পাদক ডা. মালেকা খানম বলেন, পেশিশক্তির কাছে আমরা বার বার করে হেরে যাচ্ছি। খুনি বখাটে ইয়াহিয়া সর্দার মুন্নীকে উত্ত্যক্ত করার কথা আগেই র্যাবসহ পুলিশকে আগেভাগে জানালেও কেন নিরাপত্তা পেল না। মূলকথা রাজনৈতিক শক্তি, পেশিশক্তি এবং টাকার কাছে আমাদের সুবিচার জিম্মি হয়ে আছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় উইমেন এন্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক তানিয়া হক বলেন, বখাটে ইয়াহিয়া সর্দার মুন্নীকে সবার সামনে খুন করেছে, তাই তাকে ধরে তাত্ক্ষণিক দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দিতে হবে। যাতে অন্য কেউ আর এমন ঘটনা ঘটাতে সাহস না পায়। আমরা সামাজিকভাবে বিকৃত এক মানসিক অবস্থার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি। এখন যেমন বিকৃত সম্পর্ক এবং নৃশংসতা আমরা দেখতে পাই তা কিছু দিন আগে ছিল না। তাই পরিবারকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে হবে। মা-বাবা আর স্কুলই পারে শিশুকে ভালো মানুষ বানাতে। তাই এই দুই প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব নিতে হবে।

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
২১ নভেম্বর, ২০২১ ইং
ফজর৫:১৬
যোহর১১:৫৭
আসর৩:৪১
মাগরিব৫:২০
এশা৬:৩৭
সূর্যোদয় - ৬:৩৬সূর্যাস্ত - ০৫:১৫
পড়ুন