সুনামগঞ্জে আওয়ামী লীগের দুর্গে হানা দিতে চায় বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট
১১ সেপ্টেম্বর, ২০১৭ ইং
সুনামগঞ্জ-১:(তাহিরপুর-ধর্মপাশা-জামালগঞ্জ-মধ্যনগর)

তাহিরপুর-ধর্মপাশা-জামালগঞ্জ-মধ্যনগর নিয়ে সুনামগঞ্জ-১ আসন গঠিত। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার মোয়াজ্জেম হোসেন রতন বর্তমান সংসদ সদস্য নির্বাচিত। এবারো তিনি দলের মনোনয়ন প্রত্যাশী। ঐ বছর ডা. রফিক বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছিলেন। কিন্তু নজির হোসেন বিদ্রোহী প্রার্থী হলে ফল উঠে আওয়ামী লীগ প্রার্থী মোয়াজ্জেম হোসেন রতনের ঘরে। তবে ২০০১ সালের নির্বাচনে প্রখ্যাত পার্লামেন্টারিয়ান সুরঞ্জিত সেনকে হারিয়ে বিএনপির টিকিটে নজির হোসেন জয়লাভ করেছিলেন। অন্যদিকে বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশায় রয়েছেন তাহিরপুর উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান আনিসুল হক, সাংবাদিক ওমর ফারুক আল হাদী, উপজেলা চেয়ারম্যান কামরুজ্জামান। আসনটিতে ’৭৩ সালে আওয়ামী লীগের আবদুল হাকিম চৌধুরী, ’৭৯ সালে বিএনপি প্রার্থী সৈয়দ রফিকুল হক, ’৮৬ সালে কমিউনিস্ট পার্টির কমরেড বরুণ রায়, ’৯১ সালে ১৪ দল প্রার্থী কমিউনিস্ট পার্টির নজির হোসেন, ’৯৬ সালের ১২ জুনের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী সৈয়দ রফিকুল হক সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। বলা হয়ে থাকে আসনটি আওয়ামী লীগের জন্য উর্বর। তাই এ আসনে এবার আওয়ামী লীগ থেকে ডজনখানেক নেতা মনোনয়ন প্রত্যাশী। এদের বেশিরভাগ তরুণ ও ত্যাগী। অনেকের ইমেজও প্রশংসনীয়। প্রবীণদের মধ্যে এবার প্রার্থী রয়েছেন সাবেক এমপি অ্যাডভোকেট সৈয়দ রফিকুল হক, বিনয় ভূষণ তালুকদার, ডা. রফিকুল ইসলাম চৌধূরি। তরুণদের মধ্যে জেলা আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক ও সাবেক জেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট হায়দর চৌধুরী, সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের যুব ও ক্রীড়া বিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট রনজিত সরকার, জামালগঞ্জ উপজেলার সাবেক ভাইস চেয়ারম্যন অ্যাডভোকেট শামীমা শাহরিয়ার, উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতা শামীম আহমদ, সুনামগঞ্জ জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট আক্তারুজ্জামান সেলিম প্রমুখ।

সুনামগঞ্জ ২:(দিরাই-শাল্লা)

দিরাই-শাল্লা নিয়ে সুনামগঞ্জ-২ আসনটি গঠিত। এ আসনে প্রয়াত নেতা সুরঞ্জিত সেন ও নাসির বলয়েই ঘুরপাক খাচ্ছে। সুরঞ্জিতের মুত্যুর পর উপ-নির্বাচনে নির্বাচিত হন সুরঞ্জিতের স্ত্রী ড. জয়া সেন। ২০০৮ সালে বিএনপি প্রার্থী নাসির উদ্দিন চৌধুরীকে ১৭ হাজার ৪০৪ ভোটে হারিয়েছিলেন। এ আসনের বাসিন্দারা যেন সুরঞ্জিত-নাসির বলয়ের প্রতিযোগিতা দেখতে অনেকটা প্রস্তুত। আগামী সংসদ নির্বাচনে বর্তমান এমপি ড. জয়া সেন বা সুরঞ্জিত পুত্র দলের মনোনয়ন পাবেন। অন্যদিকে নাসির চৌধুরী দলের মনোনয়ন পাবেন বলে কর্মী ও এলাকাবাসীর দৃঢ় বিশ্বাস। ’৭৩ সালে এ আসনে সংসদ সদস্য ছিলেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী আব্দুস সামাদ আজাদ। তখন ন্যাপের (মোজাফফর) প্রার্থী হিসাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ছিলেন সুরঞ্জিত সেন। ’৭৯ সালে সুরঞ্জিত মাত্র ৪ ভোটে ও ’৮৬ সালে ৭ হাজার ৫২৮ ভোটে একই দল থেকে পাস করেন গোলাম জিলানী চৌধুরীকে হারিয়ে। ’৯১ সালে তার নিজের গণতন্ত্রী পার্টি থেকে আবারো নির্বাচিত হন। ’৯৬ সালের ১২ জুনের নির্বাচনে জাতীয় পার্টির নাসির চৌধুরী জয় লাভ করেন সুরঞ্জিত সেনকে হারিয়ে। তবে ঐ সময়ে তিনি আবার উপ-নির্বাচনে জয় পান হবিগঞ্জের একটি আসন থেকে। পরে ২০০১ সালে বিএনপি প্রার্থী নাসির চৌধুরীকে হারিয়ে আওয়ামী লীগ প্রার্থী সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত জয় লাভ করেন। মাওলানা শুয়াইব আহমদ জমিওতে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশের মনোনয়ন প্রত্যাশী। এ আসনে জাতীয় পার্টি থেকে মনোনয়ন দৌড়ে এগিয়ে রয়েছেন উপজেলা জাতীয় পার্টির সভাপতি শেখ মোহাম্মদ জহির আলী। শাল্লা উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট অবনিমোহন দাস, সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের দফতর সম্পাদক অ্যাডভোকেট শামসুল ইসলাম ও পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক মেয়র আজিজুর রহমান বুলবুল। দিরাই উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক ও পৌর মেয়র মোশারফ মিয়া বলেন, দিরাই-শাল্লার মানুষ নৌকা প্রতীকেই বিশ্বাসী। 

সুনামগঞ্জ-৪:(সুনামগঞ্জ সদর-বিশ্বম্ভরপুর)

সুনামগঞ্জ সদর-বিশ্বম্ভরপুর নিয়ে সুনামগঞ্জ-৪ আসনটি গঠিত। বর্তমানে এই আসনের এমপি জাতীয় পার্টির পীর ফজলুর রহমান। তিনি এলাকায় ব্যাপক জনসংযোগ করছেন। ২০০৮ সালের নির্বাচনে মহাজোটের প্রার্থী জাপার মমতাজ ইকবাল, বিএনপির সাবেক হুইপ ফজলুল হক আছপিয়াকে হারিয়ে জয়লাভ করেন। কিছুদিন পর মমতাজ ইকবাল ইন্তেকাল করলে উপ-নির্বাচনে জয় পান মতিউর রহমান। তিনি এবারও প্রার্থী হবেন বলে জনসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। এবার এই আসনে মনোনয়ন প্রত্যাশী জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আলহাজ মতিউর রহমান, সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার এনামুল কবীর ইমন, মেয়র আয়ূব বখত জগলু, সহ-সভাপতি অ্যাডভোকেট আফতাবউদ্দিন। তবে জোটবদ্ধ নির্বাচন হলে চিত্র পাল্টে যাবে বলে মনে করা হচ্ছে। এদিকে বিএনপির সাবেক হুইপ ফজলুল হক আছপিয়া এবারও প্রার্থী হবেন। দলের হাইকমান্ডের নিকট তার পরিচিতি ভিন্ন মাত্রার। তিনি দলের আস্থাভাজন ব্যক্তিত্ব। এই আসনে প্রার্থী হতে সদর উপজেলা চেয়ারম্যান দেওয়ান জয়নুল জাকেরীনেরও নাম শুনা যায়।

’৭৯ সালে আওয়ামী লীগ প্রার্থী আব্দুজ জহুরকে হারিয়ে বিএনপি প্রার্থী মেজর (অব.) ইকবাল হোসেন জয়লাভ করেন। ’৮৬ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে ইকবাল হেসেন চৌধুরী আবারো নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগ প্রার্থী আব্দুস সামাদ আজাদকে হারিয়ে। পরে ’৯১ সালে জয়লাভ করেন আওয়ামী লীগ প্রার্থী আব্দুস সামাদ আজাদ। ’৯৬ সালে ১২ জুনের নির্বাচনে বিএনপির  ফজলুল হক আছপিয়া জয়লাভ করেন আব্দুজ জহুর মিয়া ও মেজর ইকবাল হোসেন চৌধুরীকে হারিয়ে। ২০০১ সালে মমতাজ ইকবাল ও দেওয়ান শামসুল  আবেদীনকে হারিয়ে  আবারো জয়লাভ করেন ফজলুল হক আছপিয়া।

সুনামগঞ্জ-৩:(দক্ষিণ সুনামগঞ্জ-জগন্নাথপুর)

দক্ষিণ সুনামগঞ্জে-জগন্নাথপুর নিয়ে সুনামগঞ্জ-৩ আসনটি গঠিত। বর্তমান এমপি অর্থ প্রতিমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ নেতা এমএ মান্নান। তিনি এলাকায় সুনামের সঙ্গে কাজ করছেন। মান্নান মানোয়ন প্রত্যাশী হলেও তিনি বলেন যেই নৌকা প্রতীক নিয়ে আসবে আমরা তার পক্ষে কাজ করব। তিনি গত নির্বাচনে চারদলীয় প্রার্থী জমিয়ত নেতা সাবেক এমপি শাহিনুর পাশা চৌধুরীকে পরাজিত করেন। আসনটিতে মনোনয়ন পেতে আগ্রহী সাবেক পররাষ্ট্র মন্ত্রী মরহুম আবদুস সামাদ আজাদের পুত্র আওয়ামী লীগ নেতা আজিজুস সামাদ ডন, জাতীয় পার্টির (জেপি) প্রার্থীর কেন্দ্রীয় যুগ্ম সম্পাদক ও সিলেট জেলা সভাপতি ইফতেখার আহমদ লিমন, দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগ নেতা আলহাজ আবুল কালাম। 

এ দিকে এ আসনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের মনোনয়ন প্রত্যাশী সাবেক এমপি জমিয়ত নেতা সৈয়দ শাহীনুর পাশা চৌধুরী। বিএনপির কর্নেল (অব.) সৈয়দ আলী আহমদ, দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান ফারুক আহমদ, মালেক খান, জাতীয় পার্টির (এ) মাহবুবুর রহমান মকু, আনসার উদ্দিন। এখানে বেশ কয়েকজন প্রবাসীও নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন। ’৭৩ সালে এ আসনে আওয়ামী লীগের এমপি ছিলেন অ্যাডভোকেট আব্দুর রইছ, ’৭৯ সালে বিএনপির দেওয়ান শামসুল আবেদীন, ’৮৬ সালে জাতীয় পার্টির হুমায়ুন রশিদ চৌধুরী নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগ প্রার্থী আব্দুস সামাদ আজাদকে হারিয়ে। ৯১, ৯৬ ও ২০০১ সালে আব্দুস সামাদ আজাদ এ আসনে এমপি ছিলেন মৃত্যুর আগ পর্যন্ত।

সুনামগঞ্জ-৫:(ছাতক-দোয়ারা)

ছাতক-দোয়ারা নিয়ে সুনামগঞ্জ-৫ আসন গঠিত। এ আসনে বর্তমান সংসদ সদস্য মুহিবুর রহমান মানিকই একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী থাকছেন এটা প্রায় নিশ্চিত। দলের শক্তিশালী প্রার্থী না থাকায় তিনবারের নির্বাচিত সংসদ সদস্য মানিকের সামনে এখন জয়ের হ্যাটট্রিকের সুযোগ। ১৯৯৬, ২০০৮ ও ২০১৪ সালে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। তবে তাকে চ্যালেঞ্জ করে দলীয় মনোনয়ন লাভে জোর লবিং চালিয়ে যাচ্ছেন যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগ নেতা আয়ুব করম আলী, দোয়ারাবাজার আওয়ামী লীগ নেতা ফরিদ আহমদ তারেক ও কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক নেতা শামীম আহমদ চৌধুরী। জাতীয় পার্টির (এ) অ্যাডভোকেট আব্দুল মজিদ ও জাহাঙ্গীর আলম। এদিকে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী হিসেবে প্রার্থী হবেন কেন্দ্রীয় বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক ও জেলা বিএনপির সভাপতি কলিমউদ্দিন মিলন। তিনটি ভিন্ন পরিবেশে নির্বাচিত তিনবারের সংসদ সদস্য তিনি। ১৯৮৮ সালে জাতীয় পার্টির সহযোগিতায় জাসদের প্রার্থী হিসেবে এবং ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারিতে স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন মিলন। ২০০১ সালে বর্তমান সংসদ সদস্য মুহিবুর রহমান মানিককে হারিয়ে সংসদে যান মিলন। এবার দলীয় মনোনয়ন লাভে তার প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড়িয়েছে কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাবেক সহ-সভাপতি ও ছাতক উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা মিজানুর রহমান চৌধুরী মিজান।

আওয়ামী লীগের বর্তমান এমপি মানিকের প্রতিপক্ষ হিসেবে যে তিনজন মাঠে রয়েছেন, তাদের মধ্যে প্রচারে এগিয়ে শামীম আহমদ চৌধুরী। শামীম পৌর মেয়র আবুল কালাম চৌধুরীর ভাই। নির্বাচনে শামীম এ সুুযোগ কাজে লাগাতে চাচ্ছেন। তবে এর আগে ছাতক উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান পদে ভোটে লড়াই করে শামীম চৌধুরী বিএনপি প্রার্থী মিজানুর রহমান চৌধুরীর কাছে হেরে যান। সার্বিক দিক বিবেচনায় ছাতক-দোয়ারা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা আস্থা রাখতে চান বর্তমান সংসদ সদস্য মুহিবুর রহমান মানিকের ওপরই।

 

 

 

 

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
১১ সেপ্টেম্বর, ২০২১ ইং
ফজর৪:২৭
যোহর১১:৫৬
আসর৪:২৩
মাগরিব৬:১০
এশা৭:২৩
সূর্যোদয় - ৫:৪৪সূর্যাস্ত - ০৬:০৫
পড়ুন