রাণী ময়নামতি প্রাসাদ খননে মিলেছে বিশেষ পথের সন্ধান
২৩ ফেব্রুয়ারী, ২০১৮ ইং
রাণী ময়নামতি প্রাসাদ খননে মিলেছে বিশেষ পথের সন্ধান

সন্ধান মিলেছে প্রাগৈতিহাসিক যুগের হাতিয়ারসহ মূল্যবান প্রত্নবস্তু

প্রত্নবস্তু ও নিদর্শন প্রদর্শনীতে অংশ নিল দুই সহস্রাধিক শিক্ষার্থী

মো: লুত্ফুর রহমান, কুমিল্লা প্রতিনিধি

কুমিল্লার রাণী ময়নামতি প্রাসাদ খননে বিশেষ পথের সন্ধান পাওয়া গেছে। এ খননে আবিষ্কৃত হয়েছে প্রাগৈতিহাসিক যুগের হাতিয়ার, জীবাশ্ম কাঠ, কালির দোয়াত, কলস, হাড়ি, বাটি, পানির পাত্র, লোহার কাস্তে, ঘর নির্মাণ সামগ্রী, পেরেক, শাবলসহ মূল্যবান প্রত্ন সম্পদ। দুই মাসব্যাপী এ খনন কাজ শেষে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ কর্তৃক গত সোমবার রাণী ময়নামতি প্রাসাদ এলাকায় প্রত্নতাত্ত্বিক খননে উন্মোচিত নিদর্শন এবং আবিষ্কৃত প্রত্নবস্তুর অনসাইট প্রদর্শনীতে স্থানীয় এলাকার পাঁচটি স্কুল ও কলেজের দুই সহস্রাধিক শিক্ষার্থী অংশগ্রহণ করে। প্রদর্শনীতে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা প্রাচীন যুগের ইতিহাস ঐতিহ্যের প্রত্নবস্তু সম্পর্কে শিক্ষার্থীদের প্রত্নমনস্ক করে গড়ে তোলার জন্য সম্যক ধারণা দেন।

লালমাই-ময়নামতি পাহাড়ের ইতিহাস ও ঐতিহ্য হাজার বছরের পুরানো। সপ্তম থেকে ১২ শতকে এ অঞ্চলে একটি শিক্ষা শহর গড়ে উঠেছিল। প্রত্নতাত্ত্বিক খননে উন্মোচিত বিহারগুলো সেই সত্যতাই প্রমাণ করে। জেলার বুড়িচং উপজেলার ময়নামতি এলাকায় লালমাই ময়নামতি পাহাড় শ্রেণির সর্ব উত্তরের বিচ্ছিন্ন পাহাড়ে কুমিল্লা-সিলেট মহাসড়কের পাশে রাণী ময়নামতির প্রাসাদটি অবস্থিত। সমতল ভূমি হতে এর উচ্চতা ১৫.২৪ মিটার। বহুল প্রচলিত লোকগাঁথার চরিত্রে রাণী ময়নামতির নামানুসারে এ স্থানটি রাণী ময়নামতির প্রাসাদ নামে পরিচিত। ঊনিশ শতকের গোড়ার দিকে প্রাসাদটির মাঝামাঝি স্থানে আগরতলার মহারাজা কুমার কিশোর মানিক্য তার স্ত্রীর জন্য একটি বাগান বাড়ি নির্মাণ করেছিলেন। সেই সুবাদে এটি রাণীর বাংলো নামে পরিচিত।

প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, এ স্থানে ১৯৬৫-’৬৬ সালে জরিপ ও খনন কাজ শুরু করা হয়। পরে প্রাচীন সভ্যতার নির্দশন উন্মোচনে ১৯৮৮ সাল থেকে নিয়মিত খনন করা হয়। এতে এখানে ৫১০ ফুট দৈর্ঘ্য ও পাঁচশ’ ফুট আয়তনের বেষ্টনী প্রাচীর এবং বৌদ্ধ ধর্মীয় ক্রুশাকার মন্দিরসহ চারটি নির্মাণ যুগের স্থাপত্য নিদর্শন উন্মোচিত হয়। এছাড়া চারটি বসতি স্তরে পোড়ামাটির ফলক, মূল্যবান প্রত্নবস্তু, মাটির পাত্র ইত্যাদি আবিষ্কৃত হয়। ১০ একর আয়তনের রাণী ময়নামতি প্রাসাদ প্রত্নস্থলটি লালমাই-ময়নামতি এলাকার অন্যান্য পুরাকীর্তির সঙ্গে বৈসাদৃশ্যপূর্ণ। এই প্রত্নস্থলে ১৯৯৫-’৯৬ অর্থ বছর থেকে ২০০০-’০১ অর্থ বছর পর্যন্ত খনন করার ফলে একটি ক্রুশাকৃতির মন্দির এবং একটি সীমানা প্রাচীর উন্মোচিত হয়।

প্রত্নস্থলের উত্তর-পশ্চিম অংশে সীমিত আকারে খনন করা হয়। ফলে এ স্থান সম্পর্কে প্রত্ন অনুসন্ধিত্সুকদের মধ্যে একটি কৌতূহল থাকায় এই পুরাকীর্তির উত্তর-পশ্চিমে উঁচু ঢিবিতে কোনো স্থাপনা আছে কি-না তা পর্যবেক্ষণের জন্য ২০১৬-’১৭ অর্থ বছর থেকে পুনরায় খনন শুরু হয়ে ২০১৭-’১৮ অর্থ বছরেও সেই প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখা হয়।

গত বছরের ১২ নভেম্বর হতে মাঠ পর্যায়ে খনন কাজ শুরু করা হয় এবং চলতি বছরের গত ১২ জানুয়ারি পর্যন্ত তা অব্যাহত থাকে। সংশ্লিষ্টরা জানান, এ প্রত্নস্থলে খননের ফলে মন্দির কমপ্লেক্সের প্রথম যুগের সীমানা প্রাচীর এবং দ্বিতীয় নির্মাণ যুগের দ্বিতীয় সীমানা প্রাচীরের ধ্বংসপ্রাপ্ত অংশ উন্মোচিত হয়েছে। এছাড়া সারফেস লেভেলে পরবর্তী যুগের একটি চলাচলের পথ এবং সিঁড়ি উন্মোচিত হয়েছে। এর ফলে ধারণা করা হচ্ছে,  এ ঢিবির পশ্চিম-উত্তর কোণে এমন কোনো স্থাপনা ছিল যেখানে যাতায়াতের সুবিধার জন্য মানুষ এ সিঁড়ি পথটি ব্যবহার করত। এ পথের চিহ্ন টিকিয়ে রাখার জন্য এখানে সংস্কার কাজ করে বিশেষ পথটি টিকিয়ে রাখা হয়েছে। গোমতি নদীর সঙ্গে এই বিশেষ পথের সংযোগ ছিল বলে ধারণা করা হয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, এ বছর চার লাখ টাকা ব্যয়ে খনন করা হয় এবং খননে উন্মোচিত স্থাপনা তাত্ক্ষণিকভাবে সংস্কার করা হয়। মোট ২৬টি বর্গে খনন করা হয়। সর্বোচ্চ ২২ থেকে ১৫ জন দৈনিক শ্রমিক খনন কাজে সম্পৃক্ত ছিল, তাদের মধ্যে অধিকাংশ ছিলেন মহিলা শ্রমিক। এ খননে আবিষ্কৃত হয়েছে প্রাগৈতিহাসিক যুগের হাতিয়ার, জীবাশ্ম কাঠ, কালির দোয়াত, কলস, হাঁড়ি, বাটি, পানির পাত্র, লোহার কাস্তে, ঘর নির্মাণ সামগ্রী, পেরেক, শাবলসহ মূল্যবান প্রত্নবস্তু। গত সোমবার আনুষ্ঠানিকভাবে রাণী ময়নামতি প্রাসাদ এলাকায় প্রত্নতাত্ত্বিক খননে উন্মোচিত স্থাপনা ও আবিষ্কৃত প্রত্নবস্তুর অনসাইট প্রদর্শনীর আয়োজন করে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ। এতে ময়নামতি রুফিয়া খাতুন স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ময়নামতি উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ, ময়নামতি মিশন স্কুল, কনফিডেন্স স্ট্যান্ডার্ড স্কুল ও ময়নামতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দুই সহস্রাধিক শিক্ষার্থী অংশ নেয়। এ সময় তাদেরকে প্রত্নতত্ত্ব নিদর্শন ও স্থাপনা এবং আবিষ্কৃত মূল্যবান প্রত্নবস্তু সম্পর্কে ধারণা দেওয়া হয়।

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
২৩ ফেব্রুয়ারী, ২০২১ ইং
ফজর৫:১০
যোহর১২:১৩
আসর৪:২১
মাগরিব৬:০১
এশা৭:১৪
সূর্যোদয় - ৬:২৬সূর্যাস্ত - ০৫:৫৬
পড়ুন