ভয়াল ১২ নভেম্বর আজ
১২ নভেম্বর, ২০১৮ ইং
ইত্তেফাক ডেস্ক

আজ সোমবার, ভয়াল ১২ নভেম্বর। ৪৮ বছর আগের এই দিনের বেদনা বিধূর ইতিহাস বাঙালি জাতি আজো ভুলতে পারেনি। ১৯৭০ সালের এই দিনে সমগ্র উপকূল জুড়ে বয়ে যায় মহা প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঘড় ও জলোচ্ছ্বাস। ১০ নম্বর মহাবিপদ সংকেত বুঝতে না পারার খেসারত দিতে হয়েছে উপকূলের ১০ লক্ষাধিক নিরক্ষর মানুষের প্রাণ বিসর্জনের মধ্য দিয়ে। ভেসে যায় গবাদিপশু, হাঁস-মুরগি আর ক্ষতিগ্রস্ত হয় মাঠ ফসল এবং অসংখ্য গাছপালা, পশু-পাখি। পুরো উপকূল মুহূর্তেই ধ্বংসযজ্ঞে পরিণত হয়। চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে লাশ আর লাশ। লাশের গন্ধ আর স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে এলাকার আকাশ-বাতাস। ভোলা, পটুয়াখালী, বরগুনা, নোয়াখালী ও চট্টগ্রামের ওপর দিয়ে বয়ে যায় এই ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস গোর্কি।

মনপুরা (ভোলা): ১২ নভেম্বরের মহাপ্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উপজেলা মনপুরা। মনপুরার কোথাও বেড়িবাঁধ কিংবা সাইক্লোন শেল্টার তখনো গড়ে ওঠেনি। গাছপালা তেমন একটা লম্বা বা মোটা ছিল না। সাগর মোহনার ২৫-৩০ ফুট উঁচু ঢেউ ও জলোচ্ছ্বাসে মনপুরার ৩০ সহস্রাধিক মানুষ ও গবাদিপশু সমূলে নিমিষেই স্রোতের টানে ভেসে গেছে উত্তাল সাগরে। প্রকৃতি শান্ত হলে দেখা যায়, গাছে গাছে ঝুলে আছে লাশ আর লাশ। যেখানে সেখানে লাশ আর লাশ। সাপ আর মানুষের একসঙ্গে জীবন বাঁচানোর শেষ চেষ্টার নিদর্শন দেখে মানুষ যেমন হয়েছে আতঙ্কিত তেমনি হয়েছে অভিভূত। মনপুরায় বেঁচে ছিল মাত্র ৮ হাজার স্বজন হারানো ব্যথাতুর মানুষ।

দিনটির স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে মনপুরা উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মিসেস শেলিনা আকতার চৌধুরী বলেন, সেই দিনের স্মৃতি আজো আমি ভুলতে পারিনি। আমার শ্বশুর বাড়িতে দোতলা টিনের ঘর ছিল। প্রচণ্ড ঢেউ ও বাতাসের তীব্র গতিতে জোয়ারের পানি বাড়তে থাকলে আশেপাশের এলাকার লোকজন ছুটে আসে আমাদের দোতলায় উঠে। অনেক লোকজনের আর্তনাদ সেইদিন শুনতে পেয়েছি।

বাঁচার জন্য আকুতি। অনেক লাশ ভেসে যেতে দেখেছি। আশ্রয় নেয় মানুষের পাশাপাশি সাপ থেকে শুরু করে বিভিন্ন প্রজাতির হিংস্র জীবজন্তু। পানি কমলে দেখতে পাই দোতলার একটি কক্ষে অনেক বিষধর সাপ। কিন্তু সেই দিন সেই সাপ কাউকে আঘাত করেনি। সেই দিন দেখেছি বিপদে বিষধর সাপ মানুষের বন্ধু হিসেবে পাশে থাকতে। আস্তে আস্তে তারা তাদের নিরাপদ স্থানে চলে যায়।

১২ নভেম্বরে নিহত স্বজনদের স্মরণ করে আজো বিভিন্ন সংগঠন মসজিদ ও মন্দিরে দোয়া, মিলাদ ও বিশেষ প্রার্থনা করে। উপকূলবাসী এই দিনটি উপকূল দিবস হিসেবে পালন করছে।

হাতিয়া (নোয়াখালী): ১৯৭০ সালের প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে শুধু হাতিয়া দ্বীপে মারা যায় প্রায় ১২ হাজার লোক। দ্বীপাঞ্চলের লোকদের ভাষায় এটি ছিল কেয়ামতের দিন। সেই স্মৃতি মনে পড়লে হাতিয়াসহ উপকূলবাসীর অন্তর আতঙ্কে কেঁপে উঠে।

তজুমদ্দিন (ভোলা): ১৯৭০-এর ঘূর্ণিঝড়ে উপকূলের সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর মধ্যে একটি দ্বীপ জেলা ভোলার তজুমদ্দিন উপজেলা। তজুমদ্দিন ও মনপুরা নিয়ে গঠিত ছিল তত্কালীন ওই উপজেলাটি। মনপুরা ছিল একটি মাত্র ইউনিয়ন। তজুমদ্দিনে মেঘনা তীরে বেড়িবাঁধ থাকলেও মনপুরা ছিল বেড়িবাঁধ বিহীন। গোটা তজুমদ্দিন উপজেলায় ১ লাখ ৬৭ হাজার মানুষের মধ্যে বেঁচে ছিলেন মাত্র ৭৭ হাজার। প্রায় ৪৬ শতাংশ মানুষ প্রাণ হারান। প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়টির নাম ছিল ‘ভোলা সাইক্লোন’।

উপকূলবাসীর দাবি, উপকূলীয় এলাকার মানুষদের ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের ছোবল থেকে বাঁচাতে অন্তত ১৫ ফুট উঁচু শক্ত বেড়িবাঁধ প্রয়োজন। বর্তমানে তজুমদ্দিনের ভাঙন কবলিত এলাকায় বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হলেও বেড়িবাঁধের বাইরে রয়েছে অনেক মানুষ। অন্তত প্রতিটি গ্রামে একটি করে আশ্রয়কেন্দ্র নির্মিত হলে অনেকের আশ্রয়ের ব্যবস্থা হবে। ঘূর্ণিঝড় সতর্কীকরণ সম্পর্কে মানুষের মাঝে আরও সচেতনতা বাড়াতে হবে।

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
১২ নভেম্বর, ২০১৯ ইং
ফজর৪:৫৩
যোহর১১:৪৩
আসর৩:৩৯
মাগরিব৫:১৭
এশা৬:৩২
সূর্যোদয় - ৬:১১সূর্যাস্ত - ০৫:১২
পড়ুন