শহীদ বালাকোট সায়্যিদ আহমদ বেরেলভী (রহ)
শহীদ বালাকোট সায়্যিদ আহমদ বেরেলভী (রহ)
উনবিংশ শতাব্দীর মহান মুজাদ্দিদ হযরত সায়্যিদ আহ্মদ বেরেলভী (রহ) মুহম্মদীয়া তরীকার ইমাম ছিলেন। মুহম্মদিয়া তরীকার ইমাম হযরত সায়্যিদ আহমদ বেরেলভী (রহ) ১৭৫৭ খ্রিষ্টাব্দে ২৩ জুন পলাশী বিপর্যয়ের ২৮ বছর পর ১৭৮৬ খ্রিষ্টাব্দে ২৮ নভেম্বর অযোদ্ধার রায়বেরেলীতে এক ঐতিহ্যবাহী সায়্যিদ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। হযরত ইমাম হাসানের (রা) বংশের ৩৫তম ধাপে তাঁর এক পূর্বপুরুষ সুলতান শামছুদ্দীন ইলতুতমিশের শাসনামলে ভারত বর্ষে এসে স্থায়ী বসত স্থাপন করেন। এ বংশধারা রায়বেরেলীর অত্যন্ত বুযুর্গ বংশধারা হিসেবে খ্যাতি অর্জন করে। সায়্যিদ আহমদ বেরেলভী (র) ছোট বেলায় খুব ভাবুক প্রতৃতির ছিলেন। তিনি কিশোর বয়স থেকেই স্বাস্থ্য সচেতন হয়ে ওঠেন। তিনি তখন থেকেই শরীর চর্চা করতেন। নানা ধরনের ব্যায়াম ও সাঁতারের নানাধরনের কসরতে তিনি পারদর্শী হয়ে ওঠেন। তিনি ১৬ বছর বয়সে পিতৃহারা হন। তিনি জাহিরী ইলমে যতটুকু ব্যুত্পত্তি লাভ করেন তার থেকে বেশি ইলমে লাদুন্নী লাভে ধন্য হন। ২১ বছর বয়সে অর্থাত্ ১৮০৭ খ্রিষ্টাব্দে হযরত সায়্যিদ আহমদ বেরেলভী (রহ) দিল্লিতে এসে সেই সময়কার মশহুর পীর হযরত মাওলানা শাহ্ আবদুল আযীয দেহলভীর (রহ) হাতে কাদিরীয়া, চিশতিয়া, নকশবন্দীয়া তরীকায় বায়‘আত হন। এবং অল্প সময়ের মধ্যে পীরের তাওয়াজ্জুহ ও ফয়েযের তাসীরে কঠোর রিয়াযতের মাধ্যমে প্রত্যেক তরীকার উচ্চতর মকামে উন্নীত হয়ে কামালিয়াত অর্জন করেন এবং খিলাফতের সনদ ও খিরকা লাভ করেন। তিনি রুহানিয়াত ইলমে এতোই ব্যুত্পত্তি অর্জন করেন যেন সামান্য ফয়েযেই রুহানী উচ্চ মাকাম উপলব্ধি করতে পারঙ্গম হন এবং দশ লতীফার সামগ্রিক নূর অবলোকন করেন। এই সামগ্রিকতায় তরীকাসমূহের ঐক্যবোধ জাগ্রত করে; যার থেকে বিন্যাসিত হয় তরীকায়ে মুহাম্মদিয়া। এই তরীকার সব অনুশীলন অধ্যায় নকশবন্দীয়া তরীকার ধারাবাহিকতা বজায় রেখেছে। তবে কিছু কিছু মুরাকাবা স্তরে বেশি অনুশীলন করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছে। মূলত হযরত সায়্যিদ আহমদ বেরেলভী (রহ) হযরত মুজাদ্দিদে আলফে সানী (রহ) ও হযরত শাহ্ ওয়ালী উল্লাহ্র (রহ) সংস্কার আন্দোলনের চেতনায় উদ্বুদ্ধ ছিলেন এবং বিল্পবী মনন দ্বারা উদীপ্ত ছিলেন। এই কারণেই সড়ক নির্মাণ করতে সমর্থ হয়েছিলেন। তিনি যে তরীকায়ে মুহাম্মদিয়া বিন্যস্ত করেছিলেন তাতে কতকগুলো সবক রয়েছে, যা কলবকে সজীব করে তোলে। যেমন- হকীকতে সায়ফুল্লাহর ফয়েয, মাকামাতে শোহাদার ফয়েয, নিসবতে জামি আর ফয়েয, কুওয়তের ফয়েয ইত্যাদি। এই ধরনের ফয়েয বা প্রাচুর্য প্রবাহ ফয়েয অনুশীলনকারীর ভেতরে এক অনন্য শক্তি সঞ্চারিত করে। কুওয়তের ফয়েযের মুরাকাবা হালতে মনে মনে গভীর অনুধ্যানের সঙ্গে পড়তে হয়- ইন্নাল কুওয়াতা লিল্লাহি জামী‘আ; নিশ্চয়ই সমস্ত শক্তি আল্লাহ্র। এছাড়া হকীকতে সায়ফুল্লাহ্র ফয়েযে কলবের দিকে গভীর মনোনিবেশ করে কমপক্ষে ১০১ বার এই দরূদ শরীফ পড়তে হয়: আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা সাইয়িদিনা মুহাম্মাদিন সায়ফিল্লাহিল কাতিই ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লিম।

তরীকায়ে মুহাম্মদীয়াতের তা‘লিম তিনি তাঁর মুরীদানের মধ্যে বিস্তৃতি করেন ফলে বিপ্লবী চেতনায় সবাই উদ্বুদ্ধ হন। তিনি যে জিহাদের ডাক দেন তাতে সাড়া দিয়ে উপ-মহাদেশের শত শত লোক সাড়া দেন, তিনি চেয়েছিলেন স্বদেশ বিজাতীয় প্রভাব ও শাসন থেকে মুক্ত হোক, মুক্তি ও স্বাধীনতার আস্বাদন লাভ করুক দেশ। তাঁর সান্নিধ্যে এসে লক্ষ লক্ষ মুসলিম হিদায়াত প্রাপ্ত হন, অনেক অমুসলিমও ইসলামে দাখিল হন। সৈয়দ নিসার আলী তিতুমীরও তাঁর মুরীদ হন।

১৮৩১ খৃষ্টাব্দের ৬ মে শুক্রবার চাশতের সালাতের ওয়াক্তে উত্তর পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশের জেলার উত্তর-পূর্ব কোণে হাযারা জেলার উত্তর-পূর্ব কোণে অবস্থিত মিথাকোটের নিকটবর্তী বালাকোট নামক স্থানে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে হযরত সায়্যিদ আহমদ বেরলভী (রহ) বীর বিক্রমে যুদ্ধ করতে করতে শহীদ হন। এই যুদ্ধ প্রায় দু‘ঘণ্টা ধরে চলে। তাঁর বাহিনীর প্রায় তিনশত সৈন্য শাহাদত লাভ করেন। শত্রুদের সৈন্যসংখ্যা কয়েক গুণ বেশি ছিলো। শত্রু বাহিনীর বহু সৈন্য নিহত হয়। বালাকোট যুদ্ধে অংশ গ্রহণকারী বহু গাযী হযরত সায়্যিদ আহমদ শহীদ (রহ) মুহাম্মদিয়া তরীকার ধারণা বহন করে যার যার এলাকায় ফিরে আসেন। বাংলাদেশে ফিরে আসেন গাযীয়ে বালাকোট হযরত নূর মুহাম্মদ নিযামপুরী (রহ) ও হযরত মাওলানা ইমামুদ্দীন (রহ)।

lলেখক : পীর সাহেব দ্বারিয়াপুর শরীফ, উপদেষ্টা, ইনস্টিটিউট অব হযরত মুহম্মদ (স) সাবেক পরিচালক, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
১৩ মে, ২০২১ ইং
ফজর৩:৫৪
যোহর১১:৫৫
আসর৪:৩৩
মাগরিব৬:৩৫
এশা৭:৫৪
সূর্যোদয় - ৫:১৭সূর্যাস্ত - ০৬:৩০
পড়ুন