গণতন্ত্রের অভিযাত্রা অব্যাহত থাক
৩০ এপ্রিল, ২০১৫ ইং
গণতন্ত্রের অভিযাত্রা অব্যাহত থাক
গণতন্ত্র g ড. শহীদ ইকবাল

ঢাকা ও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন হয়ে গেল। তিনজন প্রার্থী নির্বাচিত হলেন। গণতন্ত্রের বিজয়ের পথে এটি আরেকটি পদক্ষেপ। আমরা এ নির্বাচনকে গণতন্ত্রের জন্য ইতিবাচকরূপে দেখতে চাই। কারণ, সকল রাজনৈতিক দলই গণতন্ত্রের জন্য কাজ করে, গণতন্ত্রই তাদের লক্ষ্য এবং চিন্তার মুখ্য কেন্দ্র। সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে ভোটাররা প্রত্যক্ষভাবে ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন এবং নির্বিঘ্নে তা নির্ধারিত সময়সীমা পর্যন্ত কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া সম্পন্ন করেছেন। আমরা সকলেই অবগত আছি, এ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা একটি বৃহত্ বিরোধী দল, প্রায় আড়াই মাস ধরে অবরোধ ও হরতালের পর, সিটি নির্বাচনে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিয়ে, দেশে বাস্তবভিত্তিক রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত করেছে। বিষয়টি দেশের মানুষ ইতিবাচক অর্থে যেমন নিয়েছে তেমনি হরতাল-অবরোধ থেকে সরে এসে তারাও প্রকৃত রাজনীতি করতে সামর্থ্য হয়েছে, নিজেদের যুক্ত করেছে গণতন্ত্রের সঙ্গে, জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে। তবে, বিরোধী দলটি স্বতঃস্ফূর্ত নির্বাচনী প্রচারণা (নেত্রীসহ) চালানোসহ, নির্বাচনে সবরকম কর্মীকে যখন সম্পৃক্ত করেছে এবং ভোটের দিন পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে তাদের কার্যক্রমও যখন সক্রিয়, উত্সবমুখরতাও তখন উপভোগ্য হয়ে উঠছে; কিন্তু তখনই হঠাত্ তারা গত্বাধা কিছু অভিযোগ তুলে, ঘোষণা দিয়ে, নির্বাচন বয়কট করেছে। বিষয়টি অনেকের কাছে অনভিপ্রেত ঠেকলেও, এর যৌক্তিক কার্যকারিতা নিয়ে তেমন কেউ মাথা ঘামায়নি। কারণ, দীর্ঘ সময়ে যে নির্বাচনী প্রচারণার সঙ্গে তারা থেকেছে— সেটা জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন কিন্তু হঠাত্ করেই নির্বাচনের দিন, কয়েক ঘণ্টা নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার পর কিছু ঘটনার প্রতি অভিযোগ তুলে নির্বাচন বয়কট করেছে, যাকে কেউ তেমন ইতিবাচক অর্থে গ্রহণ করেনি। কেননা, গণমাধ্যম কর্মীদের সামনে তারা যে অনুযোগ তুলে ধরেছেন, তা ঠুনকো এবং নিম্নমানের। শত শত কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ হলে আর লাখ লাখ ভোটার এতে অংশ নিলে, সেখানে কিছু অনিয়ম বিশৃঙ্খলতা অনাবশ্যক বলার উপায় নেই। এটি কেউই বোধ করি রোধ করতে সক্ষম হবেন না। কারণ, নানাবয়সী মানুষের উপস্থিতি ভোটকেন্দ্রে কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটাতেই পারে, তা আমলে নিয়েই আসলে সকলেই ভোটে অংশ নেয়। তাহলে প্রশ্ন ওঠে, ভোটের দিন এই ভোট বয়কটের কারণ কী? নির্বাচনের ভেতর দিয়ে হরতাল অবরোধ থেকে যেভাবে তারা সরে এসেছেন, সে কার্যটি সম্পন্ন হওয়ার পর, এ নির্বাচনকে তারা কী পরাজয়ের গ্লানি হিসেবে মেনে নিতে চান না! নাকি সত্যিকার অর্থে, গণতন্ত্রের স্বার্থটাকেই তারা ঊর্ধ্বে তুলে ধরে প্রতিকার হিসেবে এরূপ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। বিষয়গুলোর বিশুদ্ধ বিশ্লেষণ দরকার আছে বৈকি।

বর্তমান ক্ষমতাসীন দল নির্বাচনের মাঠে সুবিধা-অসুবিধা দুটোই পেতে পারেন। কারণ, যেহেতু সরকারি কর্মকর্তারা ভোট গ্রহণ করেন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের নিয়ন্ত্রণে— ফলে এরকম সুবিধা তারা পাবেন। একইভাবে অসুবিধা যে তারা গত বছর ছয়েককাল ক্ষমতায় থেকে অনেকের আশাভঙ্গের কারণ হয়ে চলেছেন। সে সুযোগটি বিরোধীপক্ষ অবশ্যই পাবেন। অন্যদিকে, বিরোধীরা দীর্ঘসময় নানারকম প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে পার করার ফলে জনগণের সহানুভূতি পেয়ে গেছেন। কিন্তু নির্বাচন কয়েকঘণ্টা চলার পর তা থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নেয়ার কারণটি কী! যদি অনিয়ম-বিশৃঙ্খলাই হয়, তবে তারা কোথায় ছিলেন! নির্বাচন কমিশনে তারা যথোচিত লিখিত অভিযোগও তো দাখিল করেননি। প্রসঙ্গত, উদাহরণ আনতে চাই পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের। এতো বড় দেশ ভারতে ভোটের সময় অসহিষ্ণুতা অহরহ ঘটনা। সেখানে নির্বাচন কমিশনও যে অনেক পুরনো এবং দীর্ঘ অভিজ্ঞতাপূর্ণ। আমরা সকলেই লক্ষ্য করি যে, ভারতের রাজনীতি এবং রাজনীতিকগণ কীভাবে গণতন্ত্রমুখী এবং গণমুখী। সরকারি ও বিরোধীদল সমানভাবে শক্তিশালী। সেখানে হামলা প্রতি-হামলা হয় না তা বলা যায় না— কিন্তু নির্বাচন বয়কটের সিদ্ধান্ত নিয়ে স্বার্থপরের মতো সিদ্ধান্ত তারা নেয় না। কারণ, তাদের কাছে দেশ বড়। ব্যাপক অর্থে, নির্বাচনটি যখন নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে গ্রহণীয় পর্যায়ে যায় তখন সকলেই নির্বিচারে মেনে নেয়। এবং দীর্ঘ সময় ধরে ভারতে এভাবেই নির্বাচন চলে আসছে। আমরা বলি, বৃহত্ ভারত বিশাল গণতন্ত্রের দেশ। সেখানে পার্টি ও গণতন্ত্র শক্তিশালী। এরকম কথা আমরা বলি কেন! কারচুপি-ব্যালট ছিনতাই-জোরপূর্বক অনেককিছু ঘটে গেলেও আমরা আস্থাটুকু কেন যেন হারাই না। এ অভ্যাসটুকু কীভাবে হলো। কারণ, তারা একটি পর্যায়ে তাদের স্থাপন করতে সক্ষম হয়েছে। আমাদের শিশু গণতন্ত্র তা কী পারবে না? নাকি আমরা নিজেরাই বলে দেব, কারচুপি অনেক, বিশৃঙ্খলা অনেক তাই পদত্যাগ— এবং গণতন্ত্র নেই, বিপর্যস্ত, আর ভারতের ব্যাপারটি আলাদা ইত্যাদি কথাবার্তা। এখানেই গণতন্ত্র অভিযাত্রাকে এগিয়ে নেয়ার কথা বলতে চাই। আর এজন্য শক্তিশালী বিরোধী দল আবশ্যক। শক্তিশালী বিরোধী দলের অর্থ, এই নয়, বিশৃঙ্খলা বা হট্টোগোল প্রশ্রয় দেয়া, নানারকম ত্রাস সৃষ্টি করে ভোট বন্ধ করে বা বয়কট করে, কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে গিয়ে সংবাদ সম্মেলন করা। এমনটা চলতেই থাকলে, ভারতে উদাহরণ আমরা দেব কিন্তু কর্মপ্রয়াসে নিজের স্বার্থের সুযোগ নেব। এবং বলে দেব নির্বাচন হয়নি। একসময় আটের দশকে স্বৈরশাসকের সময় ‘ধানের জমি দিয়ে ব্যালট বাক্স নিয়ে ভোঁ দৌড় দিতে দেখা গেছে কর্মীদের’। কিন্তু সে সময় তো পাল্টেছে। আমাদের অভিজ্ঞতা বেড়েছে, ট্রান্সপারেন্সীর ধাপ কিছুটা হলেও উপরের দিকে উঠেছে। অনেক মিডিয়া ও গতিশীল সংবাদকর্মীদের প্রভাবে এ বিষয়ক সতর্কতা বেড়েছে। কিন্তু আমাদের মানসিকতা পাল্টায়নি। ফলে যেটি বলতে চাই, বিরোধী দল শক্তিশালী করতে গেলে, গণতন্ত্রের পথেই এগুতে হবে, জ্বালাও-পোড়াও করে নয়। প্রসঙ্গত বলতেই হবে, নির্বাচনের পর বিরোধীরা কোনো নাশকতা সৃষ্টি করেনি। তারা জনগণের রায় এবং কর্মপ্রয়াসের ভেতরেই ছিল। সেজন্য তাদের দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। এবং গণতন্ত্রের স্বার্থেই তা অবশ্য পালনীয়।

সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনকে ঘিরে চতুর্দিকে চরম অনিরাপত্তা এবং অনিশ্চয়তা সবার মধ্যে দানা বেঁধেছিল। সেটি কেটে গেছে। সরকার জরুরি এবং দূরদর্শী পদক্ষেপ নিয়েছে। নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি করেছে। নারী ভোটারগণ নির্বিঘ্নে ভোট দিয়েছেন। চট্টগ্রাম সিটির মনোনয়ন পাওয়া বিএনপির মেয়র, নির্বাচনের পরাজয় মানাই শুধু নয়, রাজনীতি থেকেও সরে এসেছেন। কিন্তু এ বিষয়গুলো কতোটা স্বাভাবিক! নির্বাচনে হেরে যাওয়া অসম্মানের কিছু নয়, হারজিত থাকবেই, কিন্তু হাসিমুখে তা গ্রহণ করার সংস্কৃতিটুকু তো চালু থাকতে হবে। আর তা এখনও হচ্ছে না বলেই আমাদের গণতন্ত্র শিশুকাল পেরুচ্ছে না। মানুষের নিরাপত্তা থেকে যাচ্ছে দূরপরাহত। মানুষ ফিরতে পারছে না স্বাভাবিক জীবনে। আতঙ্ক-নিরাপত্তহীনতা অমোঘ হয়ে উঠেছে। কিন্তু এ থেকে তো অবশ্যই বেরুতে হবে। নির্বাচন পদ্ধতি ও প্রয়োগে আপটুডেট থাকতে হবে। সকলকে সম সুযোগ দেয়া এবং গণতন্ত্রকে এগিয়ে নেয়ার জন্য সহানুভূতিশীলতাই শুধু নয় পরস্পরের বিরুদ্ধে বিষোদ্গারও বন্ধ করতে হবে।

আগেই বলেছি, সাম্প্রতিক সময়ে বিরোধী দলের হরতাল-অবরোধ পূর্ণ ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে, এবং নির্বাচনমুখী হয়েছিল। মেয়রের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে নির্বাচনের সময়ও সব মানুষের সমাজ-আগ্রহ ছিল না। নষ্ট, প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতি তারা বোঝে। এ থেকে তারা ক্রমশ সরে আসছে। রাজনীতি নিয়ে জনগণের আগ্রহ নেই। কারণ, তাতে অবিশ্বাস ও অনাস্থা। তাই চলমান গণতন্ত্রকে এগিয়ে নিতে হবে। এজন্য উভয় পক্ষকেই এগিয়ে আসতে হবে। সেটা কীভাবে সম্ভব? অবশ্যই বাস্তবভিত্তিক রাজনৈতিক কর্মসূচি দিতে হবে। তাই জনবান্ধব প্রতিশ্রুতি দরকার। নইলে কোনো ডাকই কেউ শুনবে না। যার প্রমাণ ইতিমধ্যেই পাওয়া গেছে। সেক্ষেত্রে সিটি নির্বাচনে যে সকলের অংশগ্রহণ, নির্বিঘ্নে তা শেষ হওয়া এবং সকলেই মেনে নেয়া জরুরি। এখন নির্বাচন হয়ে গেছে, ফল প্রকাশ হয়েছে, তিনজন নির্বাচিত হয়েছেন— বিজয় মিছিলের মধ্যে না গিয়ে সকলেই এগিয়ে আসুন। যে গণতন্ত্র স্বাভাবিক পরিবেশ চায়, তাই সকলের অধিকার হোক। সকলে মিলেমিশে কাজ করে, দেশটিকে এগিয়ে নিই। এবং একইসঙ্গে এটুকু স্মরণে রাখি, জনগণই সকল ক্ষমতার উত্স ও উত্তরাধিকার। এখন আর অপ-রাজনীতি নয়, বিনাশী কর্মকাণ্ড নয়, সুস্থ ও সুন্দর জীবনের পরিবেশ তৈরি করি, নিরাপত্তার পরিবেশ রচনা করি, দেশকে এগিয়ে নেয়ার কাজগুলো করি। তাহলে রাজনীতি এগুবে, গণতন্ত্র বাঁচবে। আর একথা বলতে দ্বিধা নেই, ভারত-ইংল্যাণ্ডের মতো আমরাও তখন হতে পারব গণতন্ত্রের জন্য কোনো রোলমডেলের উদাহরণ। জনগণ কিন্তু এগিয়ে এসেছে, তারা শ্রম দিচ্ছে এবং কাজ করছে— এখন পরিবেশটুকু শুধু চাই। এ পরিবেশ অবশ্যই সরকার ও বিরোধীদেরই রচনা করতে হবে।  সরকার ও বিরোধী দল উভয়ে এ নিয়ে কাজ করবে। ক্ষমা আরোহণের পথ নয়, জনগণকে ক্ষমতায়নের পথ খুঁজতে হবে। তাহলে দেশ বাঁচবে, মানুষ বাঁচবে। বিরোধী দলকেও তাই শক্তিশালী হতে হবে। মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের স্বেচ্ছাচারিতা নয়, নির্বাচনকে মেনে নিন, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে যান এবং মানুষের আয় ও সংগ্রামের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করুন। তবেই রাজনীতি টিকবে, নইলে নয়। তাই বলি, অব্যাহত থাক গণতন্ত্রের এই চলমান অভিযাত্রা। 

n লেখক :অধ্যাপক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়


 

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
৩০ এপ্রিল, ২০২০ ইং
ফজর৪:০৪
যোহর১১:৫৬
আসর৪:৩২
মাগরিব৬:২৯
এশা৭:৪৭
সূর্যোদয় - ৫:২৫সূর্যাস্ত - ০৬:২৪
পড়ুন