সুরের ভুবনে অনন্য মান্না দে
৩০ এপ্রিল, ২০১৫ ইং
সুরের ভুবনে অনন্য মান্না দে
স্মরণ g অজয় দাশগুপ্ত

আমি গান পাগল মানুষ। গাইতে না জানলেও শুনতে ভালোবাসি। ভালোবাসি বলাটা কম বলা হয়ে যাবে, আসলে সঙ্গীত আমার অক্সিজেন। ছেলেবেলায় সুর শুনে চোখের জল গড়াতো, এক বর্ণ এক শব্দের অর্থ না বোঝার পরও কত হাজার গানে মন বিষণ্ন, আকুল বা নেচে উঠেছে, সুরের মায়াজাল এমনই। পৃথিবীতে এখনো শুদ্ধতম শিল্প হিসেবে সুর হচ্ছে শীর্ষে। একখানা ছবি দেখার সময় এমনকি ভিঞ্চির মাস্টার পীস দেখার কালেও একাধিক ইন্দ্রিয় কাজ করে। চোখে দেখা হয়, ত্বকে স্পর্শ পাওয়া যায়, নাকে এসে লাগে রং আর পেইন্টিং এর ঘ্রাণ। নাচ, কবিতা বা সিনেমার মত মিডিয়ামেও একাধিক ইন্দ্রিয় থাকে সক্রিয় সতেজ, শুধু সুরে যদি তা খালি গলায় হয়, শ্রবণ ছাড়া আর কিছু কাজ করে না। সে সুর আকাশ লতার মত, মেঘের মত, রংধনুর মত, ঢেউয়ের মত, ফুলের মত ছড়িয়ে পড়ে মগজে, মেধা ও মননে। দেশে সুফিবাদের দুর্গ মাজার বা দরগাহগুলোয় নিয়মিত যাতায়াত ছিল আমার। চাটগাঁ শহরে এমন কোন সুফি দরগাহ নেই আমি যাইনি। সন্ধ্যার সময় সমবেত যে প্রার্থনা, ইয়ানবী (স.) বলে দু’হাত তুলে যে মোনাজাত তাতে শরীক হবার একটি বিশেষ কারণ আরবী ভাষায় সুরা ও সুরের মূর্ছনা। সংগীতের এই শক্তি আবেগ ও ভালোবাসা বাঙালির বড় প্রিয়। আমাদের উপমহাদেশে বাংলা গানের আকাশে উদিত উদীয়মান ও সম্ভাবনাময় তারকাদের মেলা দেখলেই বোঝা যায় বাঙালি কতটা গান পাগল।

চর্যাপদ, বাউল, ভাটি বাংলার গান, লালন শাহ, রবীন্দ্রনাথ, নজরুলের পর যে গানগুলোর নাম আধুনিক সেগুলোর রূপ বর্ণ পাল্টে চিরন্তন বা চির কালের গানও করে দিয়ে গেছেন কেউ কেউ। আজকের কর্পোরেট বাণিজ্যের যুগে, চ্যানেলের কল্যাণে এখন পাড়ায়-পাড়ায় মহল্লায়-মহল্লায় গানের প্রতিযোগিতা, বলা উচিত গায়ক-গায়িকা হবার কম্পিটিশান। যে যুগে কলের গান আর ছোট একটি রেডিও সে যুগেই আমরা পেয়েছি তারকাখ্যাতির যত গায়ক-গায়িকা। সাধনা ও জীবনযুদ্ধে সঙ্গীতের অসামান্য ভূমিকার পাশাপাশি বাংলা গানকে প্রেমময়, বিরহ কাতর আর রোমাঞ্চমুখরও করেছিলেন কেউ কেউ। বাংলা গানের সেই সব কিংবদন্তি পঞ্চাশ ও ষাট দশকের দিকপাল, আশির দশক এমনকি নব্বই দশক অবধিও পদচারণায় আমাদের ধন্য করেছেন কেউ, আজ এমন একজনের কথা লিখতে বসেছি, যাকে আমরা মেলোডি গানের সম্রাট ফের বাংলা আধুনিক গানে এক ব্যতিক্রমী ধারার জনকও বলতে পারি। বয়সের তারতম্যে সলিল চৌধুরী, বিজন ভট্টাচার্য, হেমন্ত, শ্যামল মিত্র, সতীনাথ, মানবেন্দ্র বা এঁদের সমসাময়িক কাউকেই চাক্ষুষ দেখার সৌভাগ্য হয়নি। প্রবাসে এসে জীবন্ত কিংবদন্তি আরেক শিল্পীর সান্নিধ্য পাবো কল্পনায়ও তা ছিল না। ইনি নিজে ঐ সময়ের যেমন আজীবনের এক উজ্জ্বলতম নক্ষত্র। ভারত বাংলাদেশ উপমহাদেশ ছাড়িয়ে পৃথিবীর ঘরে-ঘরে সমাদৃত বাংলা গানের এক তারকা, জীবনের প্রায় সায়াহ্নে দাঁড়ানো এই শিল্পী আসবেন শুনে হঠাত্ই যেন জেগে উঠেছিল সিডনি প্রবাসী বাংলাদেশি ও বাংলা গানের স্রোতারা, শুধু বাংলা নয় হিন্দীতেও একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। উভয় ভাষায় অসাধারণ দক্ষতা অভিজ্ঞতা আর ব্যাপ্তির ফোয়ারা ছুটিয়ে আশি বছরে আমাদের মাত করে দিয়েছিলেন তিনি। ভাবা যায়নি এত বয়সেও এমন কণ্ঠ মাধুর্য আর পরিবেশনা ছিল সম্ভবপর। গান বাজনা ভালোবাসি বলে স্বনামধন্য এমনকি সবে ডানা মেলছে এমন কেউ এলেই ছুটে যাই। কিন্তু সে যাত্রায় আমার ভাগ্য ছিল সুপ্রসন্ন। কিংবদন্তীতুল্য ঐ শিল্পীর বাংলা গানের অনুষ্ঠানটি উপস্থাপনার দায়িত্ব বর্তেছিল আমার ওপর। গানের প্রতি ভালোবাসা বা শ্রদ্ধার কারণেই হয়তো এই প্রাপ্তি। সে সুবাদে তার সাথে একাধিক বার দেখার, কথা বলার সুযোগ হয়েছিল আমার। প্রচণ্ড ব্যক্তিত্ব আর প্রখর অভিজ্ঞতা সম্পন্ন মেধাবী গায়ক বলেছিলেন তার উত্থান পর্বের গল্প। সুরকার সংগীত স্রষ্টারা ভারতীয় ছায়াছবিতে কঠিন বলে পরিচিত গানটি তাঁর জন্যে তুলে রাখতো, ফলে তার ছিল দ্বিবিধ সমস্যা, একে কঠিন বা সুর ও বাণীতে জটিল গান গাওয়া, পরে ঐ গানটিকে জনপ্রিয় করার দায়িত্ব বুঝে নেয়া। হোক না কঠিন, হোক আকাশচুম্বি উচ্চতার বা অন্য কিছু তিনিই সেগুলোকে নামিয়ে এনেছিলেন আমাদের মনের বন্দরে। ‘এই কূলে আমি আর ঐ কূলে তুমি’, ‘রঙ্গিনী কত মন মন দিতে চায়’, ‘হাজার টাকার ঝাড় বাতি তার’, ‘তুমি অনেক যতন করে আমায় দুঃখ দিতে চেয়েছ’র মত কালজয়ী গানের গায়ক কিছুটা ভারী ও ভারিক্কী হবেন এটাই তো স্বাভাবিক, শুরুতেই সম্বোধন করেছিলেন ‘ছোকরা’ বলে। প্রায় দু’ ঘণ্টার সেই অনুষ্ঠানে সিঙ্গারা গরম চা আর পানীয় পানে জেগে ওঠা এক নতুন মান্না দে কে দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল। যার জীবন গান ও বাংলা সংগীত জগত্ মিলে মিশে একাকার, যিনি উপমহাদেশ ছাড়িয়ে পৃথিবীর ঘরে ঘরে জনপ্রিয় তাকে উপস্থাপনের কিছুই থাকে না। যে গল্প অভিজ্ঞতা ও মহারথীদের (বাঙালির) কথা তিনি বলছিলেন সেগুলো শুনলেই জীবন ধন্য হয়ে যেতে পারে, গিয়েছেও। ঐ যে আশীর্বাদ বলে একটা কথা বা শব্দ হয়তো তার কারণেই খুব কাছ থেকে মান্না দে কে দেখা ও জানার কিঞ্চিত্ সুযোগ ঘটেছিল। প্রয়াত কিংবদন্তির জন্মদিনে তাঁকে জানাই ভালোবাসা।  কোনো চাঁদ কোনো জ্যোত্স্নাই তাঁকে আমাদের কাছ থেকে সামলে রাখতে পারবে না।

চিরঞ্জীব ও অমর শিল্পী তিনি, আমাদের গানের চিরনায়ক।

সিডনি

 

 

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
৩০ এপ্রিল, ২০২০ ইং
ফজর৪:০৪
যোহর১১:৫৬
আসর৪:৩২
মাগরিব৬:২৯
এশা৭:৪৭
সূর্যোদয় - ৫:২৫সূর্যাস্ত - ০৬:২৪
পড়ুন