নতুন সূর্যোদয়ের আশায়
৩০ এপ্রিল, ২০১৫ ইং
ভূমিকম্প g সেখ সোহেল রানা

লেকভিউ হোটেলের বারান্দায় চেয়ারে হেলান দিয়ে ফেওয়া লেক দেখতাম। দু’পাশের পাহাড়গুলোতে মেঘগুলো লেগে থাকতো। রাত শেষ হওয়ার আগেই শরনকোট পৌঁছে যেতাম। প্রথম সূর্যের আলো অন্নপূর্ণার গায়ে লেগে অদ্ভুত এক রঙের খেলা খেলতো। সেই পোখরা- আমার অতি আদরের শহর পোখরা আজ মৃত্যু উপত্যকা। মনে পড়ছে শেখর মালাঙের কথা। ও’ বলতো, ‘আমরা হিমালয় সন্তান। হিমালয় আমাদের বাঁচিয়ে রেখেছে’। শেখর মালাঙের মতো প্রত্যেক নেপালি তাই-ই বিশ্বাস করে। ওরা মনে করে, হিমালয়ের একেকটি শৃঙ্গে একেকটি দেবতার বাস। প্রত্যেক দেবতা আলাদা ধরনের আশীর্বাদ দিয়ে নেপালিদের বাঁচিয়ে রেখেছে। আকাশ থেকে যখন হিমালয়ের শৃঙ্গগুলো দেখছিলাম, তখন বরফাচ্ছাদিত একটি শৃঙ্গের দিকে আঙ্গুল দিয়ে শেখর জানালো, এই গৌরীশংকর পিকটি আজও অজেয়। কারণ ধ্যানরত দেবতা সেটা পছন্দ করেননি। শেখর মালাঙের সাথে আমি পাহাড় থেকে পাহাড়ে ছুটে বেড়িয়েছি। প্রায় প্রতিটি পাহাড়কে ওরা দেবতার মতো পূজা অর্চনা করে। হিমালয়, সৃষ্টিকর্তা আর দেবতা - এই তিনটি আত্মা নেপালিদের কাছে মিশে একাকার হয়ে গেছে। বিদায় নেয়ার আগে শেখরকে বলেছিলাম, আমাদের সাথে তোমাদের শিরার সংযোগ। কারণ আমরাও হিমালয় সন্তান। আর তাইতো  যেদিন কাঠমান্ডু কেঁপেছে, পোখরা কেঁপেছে সেদিন ঢাকাও কেঁপেছে। এটাই বোধ হয় আত্মার সংযোগ। প্রকৃতি কেন প্রতিশোধ নিয়েছে, কেউ গৌরী শংকরের ধ্যান ভঙ্গ করেছে কিনা সেটা হয়তো অজানাই রয়ে যাবে। কিন্তু হেয়ালি প্রকৃতির কাছে মানুষ কত অসহায় সেটা আরও একবার জানলো মানুষ। 

মতিঝিলের একুশ তলা ভবন থেকে যখন নিচে নেমে এলাম; দেখলাম, হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছে। কেউ অর্ধ স্বাক্ষরিত কলম হাতে, কেউ নগ্ন পায়ে, কেউবা নগ্ন গায়ে- যে যেভাবে অফিসে অবস্থান করছিলো ঠিক সেভাবেই ছুটে পালিয়েছে। নিরাপদ হওয়ার আগ পর্যন্ত আমরা প্রিয়জনের খোঁজটুকু নিতে ভুলে গেছি। ঘুমন্ত হিমালয় প্লেট একটু আড়মোড়া ভেঙ্গে জানিয়ে দিলো, সাধু সাবধান। রাতে পনের তলার বারান্দা থেকে ঢাকাকে দেখছিলাম। চারিদিকে আলোর ঝলকানি। দৃষ্টি যতদূর যায়, শুধু আলো আর আলো। আজ থেকে বহু বছর আগে ইস্তাম্বুল থেকে দেখা গিয়েছিলো কিভাবে আর্মেনিয়ার রাতের আলোগুলো হঠাত্ করে নিভে গেলো। প্রচণ্ড ভূকম্পনে সেদিন পাঁচ লাখের বেশি মানুষ মারা গিয়েছিলো। ভাবছিলাম, হঠাত্ যদি কখনও ঢাকার আলোগুলো এমনিভাবে নিভে যায়? সে এক অকল্পনীয় ব্যাপার; সভ্যতার এক মহাবিপর্যয়। বিজ্ঞান কি এই বিপর্যয় ঠেকাতে পারবে? আমি বিজ্ঞানের ছাত্র হিসাবে জানি, বিজ্ঞান এখানে অসহায়। জাপানীজরা, আমেরিকানরা বহু বছর গবেষণা করে যেটুকু সফলতা অর্জন করেছে তার ফলাফল এক প্রকার শূন্যের কাছাকাছি। জানি না কত শত বছর পরে বিজ্ঞান আমাদের সুখবর দিতে পারবে। কিন্তু আমরা যেটা করতে পারতাম সেটা হলো, পরিকল্পিত নগরী আর বিজ্ঞানসম্মত ভবন গড়ে তুলে ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনতে পারতাম। সেটাও আমরা করিনি। তার চেয়ে বড় কথা, আমরা সবকিছু দ্রুত ভুলে যাই। পঁচিশে এপ্রিলের সেই দিনে দেশের হাই প্রোফাইল অফিসিয়ালদের অনেকেই মৃত্যুকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন। একথা আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি। ঐ দিনটি অনেক মহারথীর জীবনের শেষ দিন হতে পারতো। কিন্তু হয়নি। ঈশ্বর সহায় হয়েছেন। একথা যেন আমরা ভুলে না যাই। তাই যাদের কলমের জোরে দেশের চেহারা পাল্টে যেতে পারে তারা যেন ভাবেন কেমন দেশ তারা আগামী প্রজন্মের জন্য রেখে যাবেন। হিরোশিমা, নাগাসাকি, কোবে নগরী ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পরেও জাপানিজরা সেই ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে আবার জেগে উঠেছে বারবার। আমরাও যেন সেই সক্ষমতা অর্জন করতে পারি। সেই সঙ্গে রাষ্ট্রের স্পর্শকাতর তথ্য, দলিলসমূহ, স্বর্ণের মজুদ এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের উল্লেখযোগ্য অংশ আমরা যেন ভূ-অভ্যন্তরে এবং মহাশূন্যে সংরক্ষিত রাখি যেন একটি মহাবিপর্যয়ের পরেও নতুন প্রজন্ম রাষ্ট্র পরিচালনায় বাধাপ্রাপ্ত না হয়। একটি সুন্দর, পরিকল্পিত এবং বিজ্ঞানসম্মত সভ্যতা ভবিষ্যত্ প্রজন্মকে উপহার দেবো। এটাই হোক আমাদের আজকের অঙ্গীকার।

হে আল্লাহ, তুমি আমাদের রক্ষা করো। বাংলার সভ্যতা দীর্ঘজীবী হোক। নেপালিরা জেগে উঠুক। হিমালয়ের সুর বেজে উঠুক আকাশে, বাতাসে, নতুন প্রাণের সঞ্চারে।    

n লেখক :প্রাক্তন প্রভাষক, কম্পিউটার বিজ্ঞান বিভাগ

 ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ইনফরমেশন সায়েন্স, লন্ডন ইউনিভার্সিটি।

ই-মেইলঃ [email protected]

 

 

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
৩০ এপ্রিল, ২০২০ ইং
ফজর৪:০৪
যোহর১১:৫৬
আসর৪:৩২
মাগরিব৬:২৯
এশা৭:৪৭
সূর্যোদয় - ৫:২৫সূর্যাস্ত - ০৬:২৪
পড়ুন