মানবতার এ কোন লাঞ্ছনা
৩১ মে, ২০১৫ ইং
 

মানব পাচার g

আ.জ.ম. সাইফুর রহমান

আমাদের নিকট প্রতিবেশী পূর্ব এশিয়ার মালয়েশিয়া এবং থাইল্যান্ডের গভীর জঙ্গলে পাওয়া যাচ্ছে শত শত গণকবর। অথচ এই অঞ্চলে সাম্প্রতিককালে কোন যুদ্ধ-বিগ্রহ সংঘটিত হয়নি। আর এই সকল গণকবরে সমাহিত করা হয়েছে মায়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলমান এবং বাংলাদেশি নর-নারীর লাশ। কী অন্যায় করেছিল ওরা। নিরন্ন-বিবস্ত্র-চিকিত্সাবঞ্চিত এই মানুষগুলো জীবিকার সন্ধানে বেরিয়েছিল দুনিয়ার কোনো প্রান্তে কোনো কাজ পাওয়া যায় কিনা। তারা চেয়েছিল পরিবারের মায়া-মমতা বিসর্জন দিয়ে হলেও দূরদেশে উদয়াস্ত পরিশ্রম করে শরীরের ঘাম ঝরিয়ে দুবেলা দুমুঠো অন্ন সংস্থান করতে। তারা চেয়েছিল চুরি নয়, ডাকাতি নয়, সম্পূর্ণ বৈধ উপায়ে পরিবার-পরিজনের জন্য উপার্জনের মাধ্যমে নিজ দেশে কিছু অর্থ পাঠাতে।

কিন্তু কী দেখলাম আমরা ইন্টারনেটে, টিভির পর্দায় এবং পত্রিকার পাতায়। ঠাসাঠাসি ভর্তি নৌকাগুলো মাঝ দরিয়ায় থেমে আছে। সূর্য উঠছে, সূর্য ডুবছে। সম্পূর্ণ অনাহারে কাটছে নৌকার যাত্রীদের দিনরাত। ক্ষুধার যন্ত্রণা সইতে না পেরে নিজের পেশাব পান করে বেঁচে থাকার শেষ চেষ্টা করছে তারা। তাদের আশা ভিনদেশী মানুষ এগিয়ে এসে তাদের উদ্ধার করবে। ওদিকে নরপিশাচরা গভীর অরণ্যে নির্মাণ করেছে প্রমোদ ভবন। সেখানে কর্মসংস্থানের প্রত্যাশায় আগত নারী শ্রমিকদের ওপর চালাচ্ছে অমানবিক যৌন নির্যাতন। যারা অমানবিক নির্যাতনে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছে, তাদের দেয়া হচ্ছে গণকবর। অনেক সময় পিশাচের দল অর্ধমৃত কিংবা জীবিত নর-নারীকেও গণকবরে সমাহিত করছে।

ভাবতে অবাক লাগে, মানুষ কতটা নিষ্ঠুর হলে মানুষের প্রতি এতটা মর্মান্তিক আচরণ করতে পারে। সমুদ্র বক্ষে থেমে থাকা নৌকাগুলোতে ক্ষুধার্ত-তৃষ্ণার্ত অসংখ্য নর-নারী। তার কণ্ঠনালীর শেষ শক্তিটুকু দিয়ে চিত্কার করে ডাকছে-বহু কষ্টে নির্জীব, নিষ্প্রাণ, নিষ্পন্দ হাত দুটো তুলে মানবিক সাহায্য চাইছে। অথচ প্রতিবেশী দেশগুলো সাহায্যের পরিবর্তে শরণার্থী অনুপ্রবেশের বিরুদ্ধে জারি করেছে রেড এলার্ট!

বিশ্ব নেতৃবৃন্দ আকুল আহ্বান জানালেন—জাতিসংঘ মহাসচিব বিপন্ন মানুষগুলোকে উদ্ধার করতে এগিয়ে যেতে বল্লেন—কিন্তু এরই মধ্যে সামুদ্রিক জলযানে শত শত মানুষ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লো।

মানুষের প্রতি মানুষের একী নির্দয় আচরণ। মধ্যযুগীয় বর্বরতাকেও হার মানিয়েছে আজকের সভ্য দুনিয়ার এই আচরণ। মানব সভ্যতার ইতিহাসে এই হূদয়বিদারক ঘটনা একটা কালো অধ্যায়ের জন্ম দিয়েছে নিঃসন্দেহে। এই মর্মান্তিক হূদয়বিদীর্ণ করা অমানবিক ঘটনার নিন্দা জানাবার ভাষা আমাদের জানা নেই।

কী অন্যায় করেছিল ওরা। ওরাতো পাসপোর্ট-ভিসার জটিল পদ্ধতি বুঝে না, ওরা সীমান্তের কাঁটাতার চিনে না, ওরা শুধু জানে ওরা এই পৃথিবীর সন্তান। এই পৃথিবীর গাছপালা-নদনদী-অরণ্যপর্বত সবকিছু ওদের নিজস্ব। ওরা জানে এই পৃথিবীর আলো বাতাসের অধিকার সকলের। বুক ভরে শ্বাস নিতে কোন ট্যাক্স দিতে হয় না। আর তাই, তারা নিরুদ্দেশ যাত্রার পথিক হয়েছিল, সমুদ্র বিহারে মেতে উঠেছিল স্বপ্নের সোনার দেশের প্রত্যাশায়। বিশ্ববাসীর কাছে তাই কয়েকটি প্রস্তাব রাখতে চাই, প্রস্তাবগুলো হলো—

 ১। মালয়েশিয়া এবং থাইল্যান্ডের শত শত গণকবরে যে সকল লাশ পাওয়া গেছে সেগুলো শনাক্ত করার সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হোক। ২। যেসব দরিদ্র পেটের দায়ে জীবিকার অন্বেষণে বেরিয়েছিল, তাদের পরিবারবর্গকে ভরণপোষণের জন্য বিশ্বসম্প্রদায় এগিয়ে আসুক। ৩। যে সকল দালাল, কোস্টগার্ড, সীমান্তরক্ষী এই হূদয়বিদারক ঘটনার নেপথ্য নায়ক তাদের আন্তর্জাতিক তদন্তের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা হোক। ৪। ভবিষ্যতে আর যেন এধরনের মানবসৃষ্ট মানবিক বিপর্যয় না ঘটে তা নিশ্চিত করা হোক। ৫। সকল মানবিক বিপর্যয়ে রাষ্ট্রসংঘ এবং বিশ্ব সম্প্রদায়কে আরো বেশি তত্পর হওয়া এবং আরো ত্বরিত পদক্ষেপ নেয়ার ব্যাপারে আমরা জোর দাবি জানাচ্ছি।

একটি কথা আমাদের অবশ্যই স্মরণ রাখতে হবে, বিশ শতকের প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপে দাঁড়িয়ে বিশ্বসম্প্রদায় বিশেষ পাঁচ পরাশক্তির নেতৃত্বে (যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, রাশিয়া, চীন ও জার্মানি) তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ ঠেকানো এবং বিশ্বশান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য রাষ্ট্র সংঘ গঠন করেন। কিন্তু জাতিসংঘ যদি নিষ্ক্রিয় এবং পক্ষপাত দোষে দুষ্ট হয়—তাহলে ক্রমান্বয়ে বিশ্ববাসীর অন্তরে মারাত্মক বিষক্রিয়ার সঞ্চার হতে পারে।

n  লেখক :কবি ও গবেষক

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
৩১ মে, ২০২১ ইং
ফজর৩:৪৪
যোহর১১:৫৬
আসর৪:৩৬
মাগরিব৬:৪৪
এশা৮:০৭
সূর্যোদয় - ৫:১১সূর্যাস্ত - ০৬:৩৯
পড়ুন