আন্তর্জাতিক প্রবীণ অপব্যবহার বিষয়ক সচেতনতা
১৫ জুন, ২০১৫ ইং
আন্তর্জাতিক প্রবীণ অপব্যবহার বিষয়ক সচেতনতা
দিবস

ড. মো. রবিউল ইসলাম

দারিদ্র্য ও নির্ভরশীলতার অন্যতম প্রধান শিকার হচ্ছে প্রবীণ জনগোষ্ঠী। আর নির্ভরশীল জনগোষ্ঠী সহজেই অবহেলা ও অপব্যবহারের শিকার হয়। অনেকেই তার নিজস্ব সম্পত্তি মৃত্যুর পূর্বেই ছেলে-মেয়েদের মধ্যে ভাগ করে দিয়ে সম্পূর্ণ নিঃস্ব এবং পরমুখাপেক্ষী হয়ে যান। দরিদ্র পরিবারভুক্ত প্রবীণরা নিরুপায় হয়ে ভরণ-পোষণের তাগিদে কঠিন ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজ এমন কি ভিক্ষাবৃত্তির  মত মানবেতর কাজেও জড়িয়ে পড়েন, যা অমানবিক। গ্রামাঞ্চলে অনেক পরিবারেই সন্তানরা পিতামাতাকে বিষয়-সম্পত্তির মতো নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে ভরণ-পোষণের দায়িত্ব নিয়ে থাকে। এ অবস্থায় প্রবীণরা পারিবারিক ও সামাজিকভাবে উপেক্ষিত, অবহেলা, বঞ্চনা, নিরাপত্তাহীনতা ইত্যাদির শিকার হয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত অবস্থায় সমাজের বাড়তি বোঝা হিসেবে বিবেচিত হয়ে চরম হতাশা ও হীনমন্যতায় ভোগে। প্রবীণ জনগোষ্ঠী কর্মক্ষেত্রে বয়স বৈষম্যের শিকার হয়। এক গবেষণার ফলাফলে দেখা যায়, অনেক প্রবীণ বার্ধক্যে উপনীত হওয়ার পরও তাঁরা কাজ করতে চান কিন্তু নিয়োগকর্তা তাঁদেরকে কাজে নিতে আগ্রহী নন। কেননা তাঁকে দিয়ে বেশি কাজ নাও হতে পারে। আর কর্মক্ষেত্রে প্রবীণা বয়স বৈষম্যের সাথে সাথে সমাজ ও সাংস্কৃতিক উপাদান দ্বারা নানাভাবে বৈষম্যের শিকার হন। বিপত্নীকের তুলনায় বিধবাদের অবস্থা আরো নাজুক। অনেকক্ষেত্রে প্রবীণরা শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনেরও শিকার হন। সম্প্রতি বাংলাদেশে একটি উপজেলার উপর পরিচালিত এক গবেষণার ফলাফলে দেখা যায়, এ উপজেলার অর্ধেক প্রবীণ উত্তরদাতা স্বীকার করেছেন তাঁরা পরিবার ও সমাজ কর্তৃক অবহেলিত হচ্ছেন। ১৮.৩৩ শতাংশ উত্তরদাতা শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। একটা বড় অংশ উত্তরদাতা শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন সম্পর্কিত প্রশ্নের উত্তর থেকে বিরত ছিলেন। এ থেকে বোঝা যায়, প্রকৃত উত্তরদাতার সংখ্যা বেশি। এদেশের অনুন্নত আর্থ-সামাজিক অবস্থার কারণে প্রবীণদের স্বাস্থ্যগত ও দৈহিক অবস্থা সার্বিকভাবে অত্যন্ত নাজুক। অধিকাংশ প্রবীণের স্বাস্থ্য দুর্বল ও অবনতিশীল। গ্রামীণ এলাকায় দরিদ্র পরিবারগুলোতে প্রবীণদের স্বাস্থ্যগত অবস্থা আরো নাজুক। শহুরে বসবাসরত প্রবীণ স্বাস্থ্য সেবার সুবিধা কিছুটা ভোগ করলেও গ্রামে তা একেবারেই অনুপস্থিত বলা যায়। স্ত্রী বা স্বামীর মৃত্যু, সন্তানের অকাল মৃত্যু, পরিবারের সদস্যদের অবজ্ঞা, সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয়, অপসংস্কৃতির প্রভাব, পরিবারে বিবাহযোগ্য সন্তান-সন্ততির উপস্থিতি ইত্যাদি কারণে অনেক প্রবীণ মানসিক সমস্যা অনুভব করেন।

আজ যারা প্রবীণ তারাই পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র ও জাতি গঠনে অনস্বীকার্য অবদান রেখেছেন। প্রবীণ জনগোষ্ঠী সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এ প্রবীণ জনগোষ্ঠীর কল্যাণ এবং তাদের প্রতি অবহেলা ও অপব্যবহার রোধে নীতি ও পরিকল্পনা গ্রহণ করা আজ সময়ের দাবি। বর্তমান সরকার বার্ধক্য ইস্যুটিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করছে। বয়স্ক ভাতা প্রবীণদের সামাজিক নিরাপত্তা প্রদানে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ। প্রবীণদের কল্যাণে যে সমস্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করা যেতে পারে, তা হলো বিদ্যমান বয়স্ক ভাতার পরিমাণ ও সংখ্যা বৃদ্ধি করা । জাতীয় প্রবীণ নীতিমালা ২০১৩ অনুমোদিত হয়েছে যা প্রবীণ জনগোষ্ঠীর অধিকার সংরক্ষণ এবং বৈষম্য ও নিপীড়নমুক্ত জীবনযাপনের নিশ্চয়তা বিধানের দলিল হিসেবে বিবেচিত। এ নীতিমালা বাস্তবায়নের কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। অতিসম্প্রতি মহামান্য রাষ্ট্রপতি প্রবীণ জনগোষ্ঠীকে রাষ্ট্রীয়ভাবে জ্যেষ্ঠ নাগরিক (Senior Citizen) ঘোষণা করেছেন যা প্রবীণদের জন্যে এক বিরাট স্বীকৃতি। পিতা-মাতা ভরণ-পোষণ আইন ২০১৩’র কার্যকর বাস্তবায়ন দরকার। কর্মক্ষম প্রবীণের উপযুক্ত কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা ও দেশে চলমান ক্ষুদ্র ঋণ কার্যক্রমে তাঁদের সম্পৃক্ত করা। গণমাধ্যমসমূহ যথা ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ায় বার্ধক্য ইস্যুটি গুরুত্বসহকারে প্রচার করা। প্রবীণ ইস্যুটি শিক্ষা পাঠ্যক্রমের সকল পর্যায়ে অন্তর্ভুক্ত করা।  এখানে আশার আলো যে, দেশের শ্রেষ্ঠ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটে বার্ধক্য বিষয়ে পঠন-পাঠনের জন্যে ২০১৩ সাল থেকে Gerontology and Geriatric Welfare শিরোনামে একবছরের মাস্টার্স প্রোগ্রাম চালু হয়েছে। হাসপাতালসমূহে প্রবীণদের স্বাস্থ্য ও সেবাদানের জন্য স্বতন্ত্র ব্যবস্থা রাখা প্রয়োজন। দরিদ্র প্রবীণদের স্বল্পমূল্যে/বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করা। দুস্থ ও অসহায় প্রবীণদের জন্যে বৃদ্ধ নিবাস স্থাপন করা। বিভিন্ন জেলায় সরকারি শিশু পরিবার রয়েছে। এ সমস্ত শিশু পরিবারসমূহে শিশুদের পাশাপাশি বয়স্কদেরও থাকার ব্যবস্থা পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা যেতে পারে। এতে করে নবীন ও প্রবীণের মধ্যে যোগসূত্র স্থাপিত হবে এবং শিশুরা পারিবারিক পরিবেশ পাবে। আন্তঃপ্রজন্ম যোগাযোগ রক্ষা করা যাতে করে আমাদের সন্তান-সন্ততি তাদের দাদা-দাদী, নানা-নানী তথা প্রবীণের প্রতি দায়িত্বশীল হয়। প্রবীণদের কল্যাণে আলাদা প্রবীণ কল্যাণ মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে। প্রবীণ ব্যক্তিদের অবসরকালীন সময় কাটানো ও বিনোদনের উদ্দেশ্যে উপযোগী বিনোদন সরঞ্জামের ব্যবস্থা করা। সকল বেসরকারি প্রতিষ্ঠান/এনজিওতে প্রবীণ কল্যাণ কর্মসূচি গ্রহণের উদ্যোগ গ্রহণ করা। সর্বোপরি, বার্ধক্য আমার, কাজেই আমাকে বার্ধক্যের প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে।

 লেখক:সহযোগী অধ্যাপক, সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও মহাসচিব, বাংলাদেশ জেরোন্টোলজিক্যাল এসোসিয়েশন। 


এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
১৫ জুন, ২০২১ ইং
ফজর৩:৪৩
যোহর১১:৫৯
আসর৪:৩৯
মাগরিব৬:৪৯
এশা৮:১৪
সূর্যোদয় - ৫:১১সূর্যাস্ত - ০৬:৪৪
পড়ুন