আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন
২৭ আগষ্ট, ২০১৫ ইং
আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন
আন্তর্জাতিক

হাসনাত আবদুল হাই

আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন বিশ্বব্যাপী আগ্রহ ও কৌতূহলের বিষয়। এর কারণ শুধু নির্বাচনী প্রচারণায় প্রাণবন্ত চরিত্র নয়। একাধিক প্রার্থীর প্রতিদ্বন্দ্বিতাও কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা যাবে না। আমেরিকার গণতন্ত্রের চর্চা যে সংস্কৃতির জন্ম দিয়েছে তার জন্যই সেখানকার নির্বাচন, বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচনের প্রতি সবার দৃষ্টি থাকে। এ ছাড়াও বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী পরাশক্তি হিসেবে আমেরিকার যে ভূমিকা তার জন্যও প্রেসিডেন্ট পদের নির্বাচন গুরুত্ব লাভ করেছে। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট  পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি। পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে বড় বড় যুদ্ধ এবং যুদ্ধের পর শান্তি স্থাপনে আমেরিকার প্রেসিডেন্টের ভূমিকা যে অতি গুরুত্বপূর্ণ তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

আমেরিকায় ছোট আকারের কিছু রাজনৈতিক দল থাকলেও, যেমন টি পার্টি, প্রেসিডেন্ট পদের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা ডেমোক্র্যাট এবং রিপাবলিকান, এই দুটি দলের মধ্যেই হয়ে থাকে। কংগ্রেসেও এই দুটি দলের নির্বাচিত প্রতিনিধিরাই প্রধানত নির্বাচিত হয়ে থাকেন। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট পদ এত গুরুত্বপূর্ণ এবং আকর্ষণীয় যে এর প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য আগ্রহী রাজনীতিবিদরা বহু আগে থেকেই প্রস্তুতি নিতে থাকেন। এই ‘প্রস্তুতির ক্ষেত্র’ সিনেট এবং হাউজ অফ রিপ্রেজেন্টেটিভ। এই পর্যন্ত সিনেটের অথবা কংগ্রেসম্যান ছাড়া কেউ প্রেসিডেন্ট পদের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেননি এবং নির্বাচিতও হননি।

ডেমোক্রেটিক দল থেকে হিলারি ক্লিনটন যে প্রেসিডেন্ট পদের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে তা বেশ অনেক আগেই বোঝা গিয়েছিল। প্রকৃতপক্ষে তিনি একজন পুরাতন প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী। এর আগে তিনি বারাক ওবামার সঙ্গে প্রার্থীতা লাভের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। তার প্রচারণা বেশ বিশ্বাসযোগ্য ছিল। কিন্তু বারাক ওবামার নির্বাচনী প্রচারণা কৌশল এবং বাগ্মীমার কাছে হেরে যান। বারাক ওবামা প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর তার প্রশাসনে তিনি পররাষ্ট্র সচিব হতে তিনি ইতস্তত করেননি। এই পদে থেকে তিনি নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করেছেন এবং অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। দেশে-বিদেশে তিনি বেশ সম্মানীত এবং প্রশংসিত। নির্বাচিত হলে তিনিই হবেন আমেরিকার প্রথম নির্বাচিত মহিলা প্রেসিডেন্ট। প্রেসিডেন্ট পদে তিনি যে যোগ্যতার পরিচয় দেবেন সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। হিলারি ক্লিন্টনের প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থিতা এতটাই স্বাভাবিক মনে হয়েছে যে তার বিপক্ষে পদপ্রার্থী হওয়ার জন্য অন্যান্য প্রার্থীর নাম তেমন গুরুত্বের সঙ্গে শোনা যাচ্ছে না। ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের নাম মাঝে মাঝে উল্লেখিত হলেও তিনি নিজে তার প্রার্থীতা এখনো ঘোষণা করেননি। জো বাইডেন খুবই ভদ্র এবং নম্র স্বভাবের মানুষ। তিনি নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতার উত্তেজনাময় পরিবেশে সম্পৃক্ত হতে নাও চাইতে পারেন। সুতরাং এখন পর্যন্ত হিলারি ক্লিন্টনকেই বলা যায় প্রায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী। তিনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে বাংলাদেশ খুশি হবে কেননা এদেশের জন্য তার দুর্বলতা সবারই জানা। এদেশের সাধারণ মানুষের জন্য তার যথেষ্ট শুভেচ্ছা রয়েছে। তার প্রশাসনে বাংলাদেশ বেশ সাহায্য ও সহযোগিতা পাবে বলে আশা করা যায়। হিলারি ক্লিন্টনের বিরুদ্ধে মুসলিম বিশ্বের একটাই আপত্তি। তিনি ইসরাইলের ব্যাপারে নিরপেক্ষতা প্রদর্শন করতে পারেননি। ক্ষমতায় এলে হয়তো তার এই দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হতে পারে।

ডেমোক্রেটিক পার্টির তুলনায় রিপাবলিকান পার্টিতে প্রেসিডেন্ট পদের প্রার্থিতা নিয়ে তুলকালাম কাণ্ড চলছে। একের পর এক প্রার্থী পদের জন্য নিজেকে ঘোষণা করেছেন। ১৫ জন প্রার্থীর মধ্যে রয়েছে জেব বুশ, স্কট ওসাকার, মার্কো রুবিও, স্টেড ফ্রুজ, জন কসিড এবং ডোনাল্ড ট্রাম্প। এইসব প্রার্থীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন জেব বুশ এবং ডোনাল্ড ট্রাম্প। জেব বুশ ফ্লোরিডার সাবেক গভর্নর এবং জর্জ বুশ জুনিয়রের ছোট ভাই। তার রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা রয়েছে এবং রাজনৈতিক পরিবারের সদস্য হিসেবে তাকে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।  এ বছরের মে মাস পর্যন্ত তাকেই অপ্রতিদ্বন্দ্বী মনে হচ্ছিল। তিনি বেশ সুকৌশলে নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়ে গিয়েছেন। তার ভাই সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশের বিরুদ্ধে যে সমালোচনা রয়েছে তা মনে রেখেই তিনি দু’জনের মধ্যে দূরত্ব বজায় রেখেছেন। এক পর্যায়ে তিনি এমন কথাও বলেছেন যে, প্রেসিডেন্ট বুশের ইরাক আক্রমণ ছিল ভুল সিদ্ধান্ত। তিনি মিডিয়াকে স্পষ্ট করে জানান যে তিনি হলে ইরাকে যুদ্ধ শুরু করতেন না। এই ঘোষণায় তার জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পেয়েছে এবং তিনি যে, তার বড় ভাইয়ের তুলনায় বেশি অভিজ্ঞতাসম্পন্ন সে সম্বন্ধে ধারণা দৃঢ় হয়েছে। বলিষ্ঠ মন্তব্য এবং স্পষ্টতার জন্য জেব বুশের প্রার্থিতা যখন প্রায় নিশ্চিত মনে হয়েছে সেই সময় ডোনাল্ড ট্রাম্প তার বেপরোয়া উক্তি ও ঘোষণা দিয়ে রাজনীতির পট প্রায় বদলে দিয়েছে। তিনবার বিবাহিত এই ধনকুবের কোনো রাখঢাক না রেখে তার যেসব নীতি ঘোষণা করেছেন তার অনেকগুলো স্পর্শকাতর। তিনি বলেছেন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে আমেরিকায় এখন যেসব বে-আইনি অভিবাসী রয়েছে তাদেরকে তিনি দেশে ফেরত পাঠাবেন। এদের অধিকাংশই ল্যাটিন আমেরিকা থেকে এসেছে। তিনি বলেছেন বে-আইনি অনুপ্রবেশ বন্ধ করার জন্য মেক্সিকোর সীমান্তে দেয়াল তুলে দেবেন এবং এর খরচ মেক্সিকো সরকারকে বহন করতে বলা হবে। তার অন্যান্য ঘোষণার মধ্যে রয়েছে জন্মের ভিত্তিতে নাগরিকত্ব প্রদানের বিধান যার মাধ্যমে অনেক বে-আইনী অভিবাসীদের সন্তান আমেকিরার নাগরিকত্ব লাভ করেছে। মধ্যপ্রাচ্যে বোমা মেরে তিনি ইসলামি স্টেটকে উড়িয়ে দেবার ঘোষণাও দিয়েছেন। এইসব উক্তির ও ঘোষণার ফলে তিনি অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পেরেছেন। তাদের কাছে তার পদপ্রার্থিতা অযৌক্তিক বা অবান্তর বলে মনে হচ্ছে না। এর ফলে রিপাবলিকান দলের যে ১৫ জন প্রার্থী প্রচারণায় অংশ নিচ্ছিলেন তাদের মধ্যে চাঞ্চল্য ও দ্বিধা-দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়েছে। তারাও ডোনাল্ড ট্রাম্পের মত বেপরোয়া কথা বলতে শুরু করেছেন। জেব বুশ ইরাক যুদ্ধের বিষয়ে তার মত কিছুটা পরিবর্তন করে ফেলেছেন। সিনেটর টেন ক্রুজ, জন্মের ভিত্তিতে নাগরিকত্ব প্রদানের বিষয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে একমত হয়েছেন। অন্যান্য রিপাবলিকান প্রার্থীরাও  ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে তাদের দূরত্ব কমিয়ে এনেছেন। কিন্তু এই আগস্টের বক্তৃতার পর ডোনাল্ড ট্রাম্পে অন্য প্রার্থীদের অতিক্রম করে এগিয়ে গিয়েছেন এবং পুরোভাগে রয়েছেন। এক হিসাবে তিনি রিপাবলিকান দলে শতকরা ২৪ ভাগ সমর্থন পাচ্ছেন যেখানে জেব বুশের সমর্থন হলো শতকরা ১৩ ভাগ।

রিপাবলিকান দল সব সময়ই সংরক্ষণশীল। ডোনাল্ড ট্রাম্পের সংরক্ষণশীলতা তাদের সমর্থন যে কমবে তাতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই। মনে হচ্ছে রিপাবলিকান দলের পদপ্রার্থী তিনিই হবেন। এটা হবে রিপাবলিকান দলের জন্য পশ্চাত্পর এক পদক্ষেপ। এর জন্য তাদের পক্ষে হোয়াইট হাউস দখল করা কঠিন হয়ে পড়বে। ডোনাল্ড ট্রাম্প যতই উত্তেজনা ও নাটকীয়তা সৃষ্টি করুন না কেন প্রতিক্রিয়াশীলতার জন্য তার পক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটারের সমর্থন লাভ সম্ভব হবে না।

লখক: কথাশিল্পী ও সাবেক সচিব

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
২৭ আগষ্ট, ২০১৯ ইং
ফজর৪:২০
যোহর১২:০১
আসর৪:৩৩
মাগরিব৬:২৫
এশা৭:৪০
সূর্যোদয় - ৫:৩৮সূর্যাস্ত - ০৬:২০
পড়ুন