একটি দরকারি তথ্যভাণ্ডার
২৭ আগষ্ট, ২০১৫ ইং
আলোকপাত

ড. মিল্টন বিশ্বাস

‘সাফল্য বার্তা দেই ছড়িয়ে হাস্য গৌরবে’ এই শ্লোগান নিয়ে ‘সফল বাংলাদেশ’ (www.bdsuccess.org) একটি কাজের অনলাইন তথ্যভাণ্ডার হিসেবে দেশের মানুষের কাছে প্রশংসা অর্জন করেছে। রাজনীতির ঘোরপ্যাঁচ এবং দ্বন্দ্ব-সংঘাত থেকে দূরে থেকে দেশের উন্নয়নের নানান চিত্রে এই ওয়েবসাইটি সমৃদ্ধ এবং প্রতিনিয়ত নতুন নতুন তথ্যে আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। উন্নয়নের ফিরিস্তি আছে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে। অর্থনীতি, উন্নয়ন, পররাষ্ট্র, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, বিশেষ অর্জন, সুশাসন প্রভৃতি স্তরে দেশকে এগিয়ে নেবার তথ্য ও বাস্তব ঘটনার অণুপুঙ্খ বিবরণ রয়েছে এই সাইটে। এমনকি বাংলা-ইংরেজি মিলে প্রায় পঞ্চাশটি পত্রিকার লিংক কার্যকরভাবে সক্রিয়। ‘রাজনীতি’ আলাদাভাবে উপস্থাপন করা না হলেও উন্নয়নের বিভিন্ন সাফল্যজনক অধ্যায়ে সরকারপ্রধান শেখ হাসিনার অবদান স্বীকৃত হয়েছে। তবে এই ওয়েবসাইটি সরকারের উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডের প্রচার-প্রচারণার জন্য ব্যবহার করা হয় না বরং দেশের অগ্রগতির ভাল খবরগুলো পাঠকের সামনে হাজির করা হয়।     

একথা সত্য, নানাবিধ উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। উন্নত দেশগুলো কথা দিয়ে কথা না রাখলেও অনেকগুলো লক্ষ্য অর্জনে সফলতা এসেছে এদেশে। এগুলো হচ্ছে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা, দারিদ্র্য ও চরম দারিদ্র্যের গভীরতা কমানো, সার্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা অর্জন, জেন্ডার সমতা এবং নারীর ক্ষমতায়ন, মাতৃস্বাস্থ্যের উন্নয়ন, শিশু মৃত্যু কমানো, মাতৃস্বাস্থ্যের উন্নয়ন, এইচআইভি/এইডস এবং অন্যান্য রোগব্যাধি দমন এবং পরিবেশগত স্থিতিশীলতা বজায় রাখা। উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রাসমূহ অর্জনে বাংলাদেশ সব সময়ই আন্তরিকতা দেখিয়েছে। বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সূচকের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত সময়ের আগেই অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে দেশ। শেখ হাসিনা সরকারের আমলেই ক্ষুধা-দারিদ্র্য, অশিক্ষা-অসাম্য, রোগ-ব্যাধির বিরুদ্ধে সূচিত হয় যুদ্ধ। ক্ষুধা ও দারিদ্র্য নির্মূলে প্রশংসনীয় গতিতে এদেশ এগিয়েছে। গত সাড়ে ছয় বছর যাবত্ দেশ নিয়মিতভাবেই ৬ শতাংশের উপরে প্রবৃদ্ধি অর্জন করছে, যা দারিদ্র্য কমানোর ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে। এনজিওগুলো ঠিক একইভাবে কাজ করে চলেছে। সরকার এবং বেসরকারি সংস্থার উন্নয়নমূলক কাজের জন্যই ২০১৫ সালের মাথাগুনতি দারিদ্র্যের হার দাঁড়িয়েছে ২৪ দশমিক ৮ শতাংশে। বাংলাদেশ ২০১০ সালেই দারিদ্র্য ও চরম দারিদ্র্যের গভীরতা কমানোর লক্ষ্য অর্জন করে। যে হারে দারিদ্র্য কমছে এতে ২০১২ সালেই বাংলাদেশ দারিদ্র্যের হার অর্ধেকে নামিয়ে আনতে সক্ষম হয়। ক্ষুধা নিরসনেও বাংলাদেশ ভাল অগ্রগতি সাধন করেছে। দেশে মাথাপিছু ক্যালরি গ্রহণের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা কিনা ২০০৫ সালে ছিল দুই হাজার ২৩৮ কিলোক্যালরি এবং ২০১০ সালে হয়েছে দুই হাজার ৩১৮ কিলোক্যালরি। বাংলাদেশ জনমিতি ও স্বাস্থ্য সমীক্ষা ২০১৪ অনুযায়ী পাঁচ বছরের কম বয়সী দুর্বল শিশুর সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যহারে কমেছে, যা ২০০৪ সালে ছিল ৫১ শতাংশ, সেটি কমে ২০১০ সালে হয়েছে ৩৬ শতাংশ। অর্থাত্ বিশ্বের সর্বোচ্চ ঘনবসতিপূর্ণ দেশ হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশ ক্ষুধা ও দারিদ্র্য কমানোর ক্ষেত্রে অনেক সাফল্য দেখিয়েছে।

তবে স্বাধীনতা অর্জনের ৪৬ বছরে পদার্পণ অর্থাত্ বয়সের মাপে আমাদের দেশ ধনী কিংবা গরিব হওয়ার বিষয়ে অথবা কতদূর এগিয়ে গেল সে সম্পর্কে মূল্যায়নে খুব বেশি কঠোর হওয়ার দরকার নেই। কারণ ভারত অথবা মিসরের দুই হাজার বছরের রাষ্ট্রীয় ইতিহাস এবং স্বাধীনতার অনেকদিন অতিবাহিত হলেও তারাও খুব বেশি এগিয়েছে বলে মনে করার কোনো কারণ নেই। অন্যদিকে কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড মাত্র দেড়শ’ বছরে উন্নয়নের যে পর্যায়ে পৌঁছেছে তা তাদের ধনী রাষ্ট্রের তকমা এনে দিয়েছে। আবার অনেক সময় রাষ্ট্রের এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে অনেকেই সেই দেশের প্রাকৃতিক সম্পদের অঢেল প্রাপ্তিকে নির্দেশ করে থাকেন; অথচ যা একেবারে ভ্রান্ত ধারণা হিসেবে পরিগণিত। কারণ ক্ষুদ্র সীমানা আর আশি শতাংশ পার্বত্য ও ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা নিয়ে জাপান বিশ্বের দ্বিতীয় অর্থনৈতিক শক্তি কীভাবে হয়েছে? সেখানে আবাদি জমি নেই বললেই চলে, পশুপালনের জন্য চারণভূমি কম, তবু শিল্প-কারখানায় কাঁচামাল আমদানি করে বিশ্বব্যাপী তাদের পণ্যসামগ্রী ছড়িয়ে দিয়েছে জাপানিরা। কেবল নিজেদের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা কী যথেষ্ট ছিল না? সুইজারল্যান্ডে নারকেল গাছের প্রাচুর্য নেই অথচ তারাই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ চকলেট উত্পাদনকারী রাষ্ট্র। ক্ষুদ্র দেশটিতে বছরের মাত্র চারমাস শস্য উত্পাদনের জন্য উপযোগী আবহাওয়া থাকে। অথচ তারাই দুগ্ধ উত্পাদনে বিশ্বের নন্দিত ও আদর্শ হিসেবে স্বীকৃত রাষ্ট্র। দেশটি শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য বসবাসের সর্বোত্তম জায়গা হিসেবে শীর্ষ স্থান দখল করে আছে এখনো। আশ্চর্যজনক হলেও সত্য ধনী ও উন্নত দেশের তকমা লাগানো রাষ্ট্রের বুদ্ধিজীবী-জ্ঞানী ব্যক্তিদের চেয়ে দরিদ্র ও উন্নয়নশীল দেশের জ্ঞানী ব্যক্তিরা একেবারে পিছিয়ে নেই। বরং পেশাজীবীদের মধ্যে জ্ঞান-গরিমায় পার্থক্য কম। বিভিন্ন সেমিনার-সিম্পোজিয়ামে অংশগ্রহণের মাধ্যমে পরস্পর পরস্পরের আন্তঃসম্পর্কের ভেতর দিয়ে সেই দিকটিও আজ স্পষ্ট। উপরন্তু দেশের অগ্রগতিতে ধর্ম-বর্ণ-গোষ্ঠী দ্বন্দ্বের সমস্যাও মুখ্য নয়। বরং ইউরোপ-আমেরিকার অনেক দেশ অন্য দেশ থেকে যাওয়া অভিবাসীদের বলপ্রয়োগে শ্রম আদায় করে যেভাবে ধনী রাষ্ট্রের শীর্ষে পৌঁছেছে সেই ধরনের ঘটনারও সম্মুখীন হতে হয়নি আমাদের গত ৪৫ বছরে। তাহলে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে আমাদের মূল সমস্যা কী? আসলে বর্তমান বিশ্বের উন্নত রাষ্ট্রের সঙ্গে আমাদের মৌল পার্থক্য চেতনা ও আচরণের। আমাদের শিক্ষা ও সংস্কৃতি সেভাবে গড়ে তোলা হয়নি। ফলে নিজের দেশের সম্পদ বিনষ্টতে আমরা আনন্দ লাভ করি। মনে করি দেশের সম্পদ আওয়ামী লীগ অথবা বিএনপি নামক দলের। আসলে এই মানসিকতার পরিবর্তন না হলে দেশ আরো বেশি এগিয়ে যেতে ব্যর্থ হবে। আজ দরকার শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর আত্মসচেতনতা আর যুবসমাজের ইতিহাসচেতনা। দেশকে আরো এগিয়ে নিতে যুবসমাজকে যথার্থ পথ-নির্দেশনা দিতে হবে।

n লেখক : অধ্যাপক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়


 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
২৭ আগষ্ট, ২০১৯ ইং
ফজর৪:২০
যোহর১২:০১
আসর৪:৩৩
মাগরিব৬:২৫
এশা৭:৪০
সূর্যোদয় - ৫:৩৮সূর্যাস্ত - ০৬:২০
পড়ুন