হাজংদের বিয়ে ব্যবস্থা
২৮ অক্টোবর, ২০১৫ ইং
হাজংদের বিয়ে ব্যবস্থা
উপজাতি g আবু সাইদ কামাল

হাজংদের মধ্যে পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা বিদ্যমান। হাজং পুরুষরা নারীর ওপর কর্তৃত্ব করে থাকে। আর বিয়ের পর নারীগণ স্বামীর গোত্রভুক্ত হয় এবং সমাজে স্বামীর পরিচয়েই পরিচিত হয়ে থাকে। হাজংদের মাঝে প্রাক-বৈবাহিক লিঙ্গ-সম্পর্ক কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। হাজংরা সাধারণত বৈবাহিক বিশুদ্ধতা তথা সতীত্ব প্রথা বা নিয়ম মেনে চলে। একজন স্বামী সাধারণত একজন স্ত্রী গ্রহণ করে থাকে। বিবাহ বিচ্ছেদ এবং বিধবা বিবাহ বিরল। হাজং ছেলে-মেয়েদের উপযুক্ত বয়সে বিয়ে-শাদী দেয়া হয়। বিয়ের বয়স হলেই মন্ত্র নিয়ে তাদের শুদ্ধ হতে হয়। আর মন্ত্র-শুদ্ধ না হওয়া পর্যন্ত ছেলে-মেয়েদের বিয়ের আলাপ-আলোচনা হয় না বা হতে পারে না। হাজং বিয়েতে নিকনি ও গোত্রবিচার করা হয়। হাজংদের নিকনি ও গোত্রের মাঝে পার্থক্য রয়েছে। হাজং নারী বাহিত নিকনি এবং পুরুষ গোত্র তাদের সন্তানদের ওপর বর্তায়।

হাজংদের বিয়েতে সাধারণত বর বা কনে পক্ষ সরাসরি কোনো আলাপ-আলোচনা করতে পারে না। এমনকি সরাসরি কোনো পক্ষ অন্য পক্ষের কাছে বিয়ের আলাপও তুলতে পারে না। এক্ষেত্রে উভয় পক্ষের পাড়া-প্রতিবেশী বা আত্মীয়-স্বজন ঘটকের ভূমিকা পালন করে থাকে। আর এভাবে যে বা যারা ঘটকের কাজ করে তাকে বা তাদেরকে ‘যাহু’ বলা হয়। এ যাহু উভয় পক্ষের অভিভাবকের সঙ্গে কথা বলে তাদের দাবি-দাওয়া প্রভৃতি আলাপ-আলোচনা করে বিয়ে ঠিক করে। হাজং বিয়েতে পণপ্রথা ও যৌতুক প্রথা রয়েছে। বরপক্ষ কনের মাকে কন্যা লালন-পালনের জন্য ঋণ পরিশোধ করতে ১ টাকা ২৫ পয়সা বা পাঁচ টাকা দেয়। গ্রামবাসীর কোনো দাবি থাকলে সাধ্যানুযায়ী বর পক্ষ তা পূরণ করে।

হাজং বিয়েতে আইড়ো এবং ধর্ম মা-বাবা একান্ত প্রয়োজন। এদের ছাড়া বিয়ে সম্পন্ন হয় না। হাজং বিয়ে সম্পন্ন করার জন্য ৫ জন সধবা মহিলা ( ৫ জন পাওয়া না গেলে ৩ জন হলেও চলে) মনোনীত করা হয়। এদেরকে আইড়ো বলা হয়। বাঙালি মুসলিম সমাজে যেমন উকিল শ্বশুর-শাশুড়ি থাকে সেরূপ হাজংদের ক্ষেত্রে বলা হয় ধর্ম মা-বাবা। মূল বিয়ের আগের দিন বা অধিবাসের দিন কনের বাড়িতে বা বিয়ে বাড়িতে ধর্ম মা-বাবা, অধিকারী, আইড়ো, গীতালু, পাঁচকসহ গ্রামের মানুষদের পান-সুপারি দিয়ে বিয়ের কাজে স্ব-স্ব দায়িত্ব পালনের জন্য অনুরোধ করা হয়। তারা সবাই মিলে বিয়ের পূর্বপ্রস্তুতি গ্রহণ করে। মূল বিয়ে পর্বে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে ধর্ম মা-বাবা ও আইড়োগণ। বর-কনেসহ ধর্ম মা-বাবাকেও সেদিন উপোস করতে হয়। আইড়োগণ বরের দু’হাত দুপাশে মেলে পাটকাঠি দ্বারা মাপ নেয়। এবং সে মাপেই চারকোণা বিয়েকুঞ্জ তৈরি করা হয়। চারকোণায় কলাগাছ পুঁতে সুতা দিয়ে সাতবার পেঁচানো হয়। অতঃপর কুঞ্জের ভিতর আল্পনা আঁকা হয়। স্থাপন করা হয় ১৬টি ঘট ও মুছি। ঘট ও মুছিগুলোর রয়েছে ভিন্ন ভিন্ন নাম। আছে সেগুলো স্থাপনের ক্রমধারাও।

আইড়োগণ নাপিত দিয়ে বর-কনে ও ধর্ম মা-বাবার ক্ষৌর কর্ম সম্পন্ন করে নেয়। পরে আইড়োগণ উলুধ্বনি দেয়, বাদকগণ বাজায় বাজনা আর গীতালুগণ শুরু করে গীত। হাজং বিয়েতে গীতালুদের গীত পরিবেশন করা অপরিহার্য। কারো কারো বিয়েতে গীত মানতও থাকে। মানতকৃত গীতের দুটি ধারা। একটি হলো ‘ভরামারা’ আর একটি ‘ঝরামারা’।

বিয়ের আসরে বরের চাদরের সঙ্গে কনের শাড়ির আঁঁচল বেঁধে দেয়া হয়। এ রকম গিঁটকে হাজং ভাষায় ‘মানিক গিঁট’ বলে। এ সময়ে পুরোহিত গোত্রের ব্রাহ্মণ দিয়ে মন্ত্র উচ্চারণ করায়। চন্দ্র, সূর্য, রাধাকৃষ্ণ, ষোড়শ গোপিনী ও হোমাগ্নিকে সাক্ষী রেখে বিয়ে সম্পন্ন করা হয়।

অ-পুরোহিত গোত্রে কনের সহোদর ভাই, না থাকলে পিসতুতো ভাই, বাবা, কাকাতো ভাই-কন্যা সম্পাদন করে থাকে। ধর্ম মা-বাবা তখন আশীর্বাদ করে বিয়ের কাজ সম্পন্ন করে। ধর্ম মা-বাবা এরূপ দাম্পত্য জীবনের ধারক-বাহক ও প্রধান সাক্ষী হিসেবে থাকে।

বিয়ের পরদিন সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে বর-কনেকে স্নান করিয়ে বাসি বিয়ে করানো হয়। সাতদিন পর দ্বিরাগমন শেষে ওদের বাসরঘরে দেয়া হয়।

হাজং বিয়ে প্রথায় পুরোহিত-অপুরোহিত দুই সম্প্রদায়ের মাঝে কিছুটা পার্থক্য বিদ্যমান। পুরোহিত দলের মাঝে হাজংরা ব্রাহ্মণের মাধ্যমে বিয়ে সম্পন্ন করে। আবার অ-পুরোহিত হাজংরা নিজ সমাজের অধিকারী দ্বারাই বিয়ে সম্পন্ন করে থাকে।

এ ছাড়াও হাজংদের মাঝে আরও কয়েক প্রকার বিয়ে প্রচলিত রয়েছে। যেমন-ধর্মীয় এবং সামাজিক রীতি-নীতি ভেঙে যদি কোনো যুবক-যুবতী প্রেমে পড়ে নিজেদের ইচ্ছায় পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হয়, এরূপ বিয়েকে ‘দায়পড়া’ বিয়ে বলে। এরা সাধারণত সমাজচ্যুত হয় এবং সমাজে স্থান করে নিতে পারে না। এক্ষেত্রে দম্পতি যদি ভিন্ন নিকনির হয় তবে দণ্ড দিয়ে সমাজের স্বীকৃতি পেতে পারে। কিন্তু একই নিকনিভুক্ত হলে ওরা কোনোভাবেই সমাজের স্বীকৃতি পায় না।

যদি হাজং যুবক-যুবতী বা নর-নারীর মাঝে প্রণয়ের সম্পর্ক গড়ে ওঠে, সে ক্ষেত্রে নারী যদি বুঝতে পারে ছেলেপক্ষের বিরোধিতার কারণে বিয়ে হচ্ছে না বা প্রেমিক যদি প্রতারণার আশ্রয় নেয়, প্রেমিকা তখন বাধ্য হয়ে ছেলের বাড়িতে আশ্রয় গ্রহণ করে। ছেলেও তখন বিয়ে করতে বাধ্য হয়। এ ধরনের বিয়েকে ‘ডাঙো হান্দা’ বলে।

হাজংদের মাঝে বিধবা বিয়ের প্রচলন রয়েছে। তবে সেক্ষেত্রে দেবর বা ভাসুরকে বিয়ে করতে পারে না। বিধবা মহিলা দ্বিতীয় বিয়ে করলে এরূপ বিয়েকে ‘হাঙা’ বলে। হাঙা পদ্ধতির স্ত্রী সিঁথিতে সিঁদুর এবং হাতে শাঁখা পরতে পারে না। এমনকি মাঙ্গলিক আচার-অনুষ্ঠানেও যেতে পারে না। তবে এ জাতীয় ব্যবস্থা সন্তানদের ওপর বর্তায় না। হাজংদের মাঝে একাধিক বিয়েও প্রচলিত রয়েছে।

n লেখক : গবেষক

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
২৮ অক্টোবর, ২০২১ ইং
ফজর৪:৪৬
যোহর১১:৪৩
আসর৩:৪৫
মাগরিব৫:২৬
এশা৬:৩৯
সূর্যোদয় - ৬:০২সূর্যাস্ত - ০৫:২১
পড়ুন