আসন্ন পৌর নির্বাচন ও রাজনৈতিক ভাবনা
০২ ডিসেম্বর, ২০১৫ ইং
আসন্ন পৌর নির্বাচন ও রাজনৈতিক ভাবনা
নির্বাচন g ড. এ কে এম শাহনাওয়াজ

এদেশের রাজনীতিতে গণতন্ত্রচর্চা এখন শুধু নির্বাচনের মধ্যে কিছুটা টিকে আছে। এতে অবশ্য সামান্য হলেও হতাশা কমানো যায়। বাতি একেবারে নির্বাপিত হলে তাকে আবার নতুন করে জ্বালানো কঠিন। এর বদলে এই নিভু নিভু শিখা প্রজ্বলিত হওয়ার একটি সম্ভাবনা রেখে দিচ্ছে। দেশপ্রেম আর জনগণের প্রতি দায়বোধ থাকলে আমাদের ক্ষমতাপ্রিয় রাজনীতিকরা দলীয় লাভালাভের জন্য জনগণের জীবন বিপন্ন করতেন না। বিগত জাতীয় নির্বাচন-পূর্ব সময়ের কথা ভাবতে পারি। যদি নির্মোহভাবে গণতন্ত্র আমাদের রাজনীতিকে ঘিরে থাকতো তবে আওয়ামী লীগ অনড় থাকতো না তাদের নির্বাচনী পরিকল্পনা বজায় রাখতে। আর বিএনপি উন্মত্ত হতো না তাদের নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রশ্নে অনড় থাকতে। নৈরাজ্য বাঁধিয়ে নিজেদের লোভী ইচ্ছে পূরণের জন্য হরতালের পর হরতাল চাপিয়ে দিতো না মানুষের ঘাড়ে। মসনদ লোভী নেতারা বিপন্ন করে তুলতেন না দেশের জনজীবন আর অর্থনীতি। আবার গণবিরোধী এতোসব কাণ্ড করেও নিলর্জ্জের মত বাকোয়াজ করে যেতে পারতেন না নিরলসভাবে। প্রকৃতপক্ষে রাজনীতিতে গণতন্ত্রায়নের সংকট ক্রমে অন্ধকারাচ্ছন্ন করে তুলছে আমাদের ভবিষ্যত্। আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কৌশলে সে সময় ধরাশায়ী হয়েছিল বিএনপি। নির্বাচনে অংশ না নেয়ার খেসারত তাকে পদে পদে দিতে হয়েছে। নির্বাচন ঠেকানোর সহিংস পথটিও বিএনপিকে অনেকটা গণবিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। আর আওয়ামী লীগকে এনে দিয়েছে অনাবিল সুযোগ। এখনো মামলা-গ্রেফতারে সে সময়ের অনাচারগুলোকে সহজেই ব্যবহার করা যাচ্ছে।

জামায়াত বিএনপির প্রযোজনায় যতটা সহিংসতা হয়েছিল সম্ভবত তা অতীতের সকল রেকর্ড ভেঙেছে। ককটেলের খই ফোটানো, গাড়ি ভাঙচুর, রেল লাইন উপড়ে ফেলা, আগুন দেয়া, পেট্রোল বোমায় নিরীহ মানুষ পুড়িয়ে মারা, এসব করা হয়েছে বড় বেশি হিংস্রতায়। সহিংস রাজনীতি করতে গিয়ে নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন ভুলতে বসেছিল বিএনপি ও ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা। অপরদিকে আওয়ামী লীগের মধ্যে নির্বাচনী আমেজ ছিল শতভাগ। তাই এই দলের নেতাকর্মীরাও অনেক বেশি সংগঠিত ছিল। এ কারণেই বলবো বিএনপির রাজনৈতিক ব্যর্থতাই আওয়ামী লীগের অবস্থানকে শক্ত করে দিয়েছে।

তবু ভালো শেষ বেলায় এসে বিএনপি কিছুটা আত্মচৈতন্যে ফিরেছে বলে মনে হচ্ছে। নির্বাচনে না যাওয়ার ভ্রান্তি থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছে। পৌরসভা নির্বাচনে দলটির ইতিবাচক মনোভাব আমাদের আশাবাদী করে তুলেছে। অযথা শর্ত আরোপের বাড়াবাড়ি নেই এবার বিএনপি নীতি নির্ধারকদের মধ্যে। সময় বাড়ানোর আবেদন নাকচ হওয়ার পর খুব শক্ত অবস্থানে থাকবে বলে মনে হয় না।

স্থানীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ক্ষমতাকালীন সময়ে বিএনপির অবস্থান ভালো ছিল। এমনিতে নানা কারণে ক্ষমতাসীন দল কিছুটা জনপ্রিয়তা হারায়। আওয়ামী লীগের অতি দলীয়করণ এবং দলীয় স্থানীয় মাস্তানদের ওপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে না পারায় সাধারণ মানুষ কিছুটা বিক্ষুব্ধ থাকবেই। তবে এর সুবিধা বিএনপির ঘরে যাওয়ার সুযোগ এবারে অনেকটা কম। জামায়াতকে সাথে নিয়ে যে গণবিরোধী সংঘাত নিকট অতীতে করেছে সে যাতনা মানুষ খুব একটা ভুলতে পেরেছে বলে মনে হয় না। তা ছাড়া বিএনপি নেতাকর্মীরা অনেকেই জেলে অন্তরীণ। মামলা হামলার ভয়ে অনেকেই পলাতক। এসব কারণে অনেক সময় সহানুভূতির ভোট পাওয়া যায়। নিকট অতীতের কৃতকর্মের কারণে সে সুযোগ এবার অনেকটা সংকুচিত থাকবে। নিবন্ধন না থাকায় জামায়াত স্বনামে হয়তো নির্বাচন করতে পারবে না। জামায়াত সমর্থন বিএনপির প্রয়োজন আছে। তবে এবার তা বুমেরাং হয় কিনা তা ভেবে দেখতে হবে। বরঞ্চ মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার প্রক্রিয়ায় জামায়াতের কোণঠাসা অবস্থায় বিএনপি সরে এসে নিজেকে পরিচ্ছন্ন করতে পারতো। কিন্তু দলীয় দুঃসময়ে আদালতের আর জনচেতনার বিরুদ্ধে গিয়ে মানবতাবিরোধীদের পক্ষে কথা বলা বিএনপি নেতাদের জন্য কেন যে জরুরি ছিল বোঝা গেল না।

এদেশে অনেক মানুষ আছেন যাদের কোনো কোনো ভাবনা বা মন্তব্য কারো কাছে একদেশদর্শী মনে হতে পারে। কিন্তু তারা তাদের বিবেচনাবোধের মধ্যে দাঁড়িয়ে বাস্তবতা ও যৌক্তিকতা থেকে সরে আসতে পারছেন না। আমি মনে করি রাজনৈতিক দলান্ধ মানুষ ছাড়া চিন্তাশীল সচেতন মানুষের বিবেচনা থেকে তারা খুব দূরে নেই। গণতান্ত্রিকবোধ বা বিশ্বাসহীন অথবা অপূর্ণ গণতান্ত্রিক বোধের মানুষরা দীর্ঘদিন আমাদের রাজনীতির মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন বলে অমিত সম্ভাবনা থাকার পরও এদেশ এগিয়ে যেতে পারছে না। আমার মতো অনেকেই বিশ্বাস করেন এদেশের রাজনীতি যদি স্বার্থপরতা ও লোভ থেকে বেরিয়ে এসে প্রকৃত গণতান্ত্রিক চেতনায় প্রতিষ্ঠিত হতে পারতো তবে ভাগ্য পরিবর্তনের পথ তৈরি হতো। রাজনৈতিক বুলি ছাড়া প্রায়োগিক ক্ষেত্রে গণতন্ত্র জায়গা করে নিতে পারেনি কখনও। তাই আমাদের রাজনীতির নিয়ন্ত্রকগণ প্রতিপক্ষ দলের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো, অন্যের ভালো কাজকে প্রশংসা করা বা স্বীকৃতি দেয়ার শোভন আচরণ করতে পারেন না। দলের কর্মী-সমর্থকদের আত্মসমালোচক আর মুক্তচিন্তার আধুনিক মানুষ না বানিয়ে অন্ধ দলপ্রেমিক বানিয়ে স্বস্তি খুঁজছেন। এভাবে দেশকে ক্রমে অন্ধকারে ছুঁড়ে দিচ্ছেন তারা। এমন অবস্থা নির্বাচনের মাঠকে সুস্থির করতে পারে না।

আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাজ্ঞ নেতারা কেন বুঝতে চাইছেন না যে দলের ভেতর গণতন্ত্র চর্চা না করলে দলকে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো সম্ভব নয়। বিএনপি নেতৃত্ব যদি দূরদর্শী হতে পারত তাহলে অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে অস্তিত্বের প্রয়োজনেই চেষ্টা করতো গণতন্ত্রের পথে হাঁটতে। উচিত ছিল সাধারণ মানুষের সামনে কুখ্যাত হয়ে যাওয়া চারপাশের নষ্ট মানুষদের হটিয়ে দিয়ে দলকে ভালোবাসে এমন নির্লোভ নেতানেত্রীদের নেতৃত্বে টেনে আনা। যে কাজ আওয়ামী লীগের জন্য অনিবার্য ছিল না তবুও শেখ হাসিনা ২০০৮-এর নির্বাচনের আগে তেমন ‘বৈপ্লবিক’ সিদ্ধান্ত নিয়ে দল পুনর্গঠন করেছেন। অথচ বর্তমান বাস্তবতায় এমন কাজটিই করা উচিত ছিল বিএনপির আপসহীন নেত্রীর। অবশ্য সততা মানুষের মধ্যে আত্মিক দৃঢ়তার সৃষ্টি করে। বিএনপি নেত্রীর পক্ষে কতটা দৃঢ় হওয়ার সুযোগ আছে তা সময়ই বলে দেবে। কিন্তু নানা কলঙ্ক এবং ঝড়-ঝাপটার পরও বিএনপির অংশ নেয়া বিগত নির্বাচনে ৩১ শতাংশ ভোট পাওয়া বিএনপি নিঃশেষ হয়ে গেছে এমন ভাবার কারণ ছিল না। সুতরাং সুস্থ মানুষদের নিয়ে গণতন্ত্রের পথে হাঁটার চেষ্টা তো বিএনপি নেত্রী করতেই পারতেন। কিন্তু অমন আশা  করা বাতুলতা। যেখানে অনেক বেশি শক্তি ও সম্ভাবনা থাকার পরও আওয়ামী লীগ জনমতের ওপর ভরসা করার মতো সাহস দেখাতে পারে না, সেখানে বিএনপি এ অবস্থায় দুঃসাহস দেখাতো কেমন করে!

এই সত্য মানতে হবে তারেক রহমান ও বিএনপির অনেক নেতার অতীত দুর্নীতি এবং নিজের কোনো কোনো ক্ষেত্রে অসততার রটনা থাকলেও বিএনপির সাধারণ কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে এখনও বেগম খালেদা জিয়ার প্রতি আনুগত্য আছে। কিন্তু নানা ঝড়-ঝাপটা ও বয়সের কারণে তিনি সম্ভবত এখন আর তেমন বলিষ্ঠতা দেখাতে পারছেন না। আর এ সুযোগ নিচ্ছেন চিহ্নিত লোভী মানসিকতার নেতারা যাদের প্রতি সাধারণ বিএনপি কর্মীদের আস্থা অনেকটা কমে গেছে। আর সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিএনপির ওপর জামায়াত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হওয়ায়। এখন কিছুটা অবদমিত অবস্থা থাকলেও নিকট অতীতের আন্দোলনেও জামায়াত সুনিপুণভাবে তাদের প্রতি নির্ভরশীল করে তুলতে চেয়েছিল বেগম জিয়াকে। বিএনপি নেত্রীকে এইসব ঘেরাটোপ থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। এই সময়ে তাঁর সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন গণতন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া। সাধারণের আস্থায় ফিরতে হলে দলে সত্ নেতৃত্বের অবস্থান দৃঢ় করতে হবে। বিএনপির প্রতি ভালোবাসা আছে এমন সাধারণ নেতা-কর্মী সমর্থকদের ক্ষমতায়নকে নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য গণতান্ত্রিক পরিবেশ সৃষ্টির বিকল্প নেই।

আমরা মনে করি যদিও সময় ক্রমে সংকীর্ণ হয়ে আসছে তবুও নতুনভাবে চিন্তা করার সময় ফুরিয়ে যায়নি। জামায়াত আশ্রিত উগ্র রাজনীতির আচরণ জনগণের ওপর চাপিয়ে দেয়ায় পৌর নির্বাচনী প্রস্তুতির এই পূর্বক্ষণে কিছুটা ব্যাকফুটে চলে গেছে বিএনপি। চালকের আসনে পৌঁছতে না পারলেও অনেকটা কাছাকাছি চলে এসেছে আওয়ামী লীগ। তাই কোনো পক্ষেরই উচিত হবে না হঠকারী রাজনীতির দিকে পা ফেলা। আওয়ামী লীগ বহুদলীয় নামে বিএনপিহীন নির্বাচনকালীন সরকার যেমন গঠন করেছে তা কতটা সুচিন্তিত ছিল সময় তা বলে দেবে।  আমরা আশা করবো বিএনপি এর অর্বাচীন আপসহীনতার গ্যাড়াকলে আর ফাঁসবে না। পৌর নির্বাচনের মত স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নিয়ে দায়িত্বশীল আচরণ করলে বিএনপির ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ এখনো আছে। দেশকে অশান্ত করে—দেশের মানুষকে জিম্মি করে ফায়দা হাসিল করার সুযোগ অতীতে ছিল না এখনো নেই। সুতরাং সংকীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থের কথা না ভেবে জনজীবনকে স্বস্তি দিতে এবং দেশকে অন্ধকার থেকে আলোতে আনতে আমাদের সকল পক্ষের রাজনীতিকদের সুমতি আসবে আমরা এমনটাই প্রত্যাশা করবো।

n লেখক :অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়


 

 

এই পাতার আরো খবর -
facebook-recent-activity
২ নভেম্বর, ২০২১ ইং
ফজর৫:০৪
যোহর১১:৪৮
আসর৩:৩৫
মাগরিব৫:১৪
এশা৬:৩১
সূর্যোদয় - ৬:২৪সূর্যাস্ত - ০৫:০৯
পড়ুন